আওয়ামী প্রভাবে শূন্য থেকে শতকোটির দুর্নীতি : তবুও বহাল তবিয়তে খাদ্য কর্মকর্তা জিকরুল!

নিজস্ব প্রতিবেদক:

মাদারীপুর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক শেখ জিকরুল আলমের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে চাকরি লাভ, নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমে অনিয়ম, দুর্নীতি, ঘুষ গ্রহণ, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিস্তর অভিযোগ উঠেছে। দৈনিক আমাদের মাতৃভূমির অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে তার দুর্নীতির সামগ্রিক চিত্র ফুটে উঠেছে।

 

গোপালগঞ্জ পরিচয়ের অপব্যবহার এবং ক্ষমতার অপতৎপরতা

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের অন্যতম ছিল গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার বাসিন্দারা। শুধুমাত্র এই আঞ্চলিক পরিচয়ের সুবাদে অনেকেই বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে অবৈধভাবে নিয়োগ পান। তদবির, অনিয়ম, দুর্নীতি এবং বদলি বাণিজ্যের মাধ্যমে শূন্য থেকে অনেকেই শত শত কোটি টাকার মালিক বনে যান। ওই সময়ের সরকারি দপ্তরগুলোতে এই অঞ্চলের বাসিন্দাদের বিরুদ্ধে অনিয়মের পাহাড়সম অভিযোগ থাকলেও রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রভাবে তা বরাবরই অদৃশ্য থাকত।

গত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অনেক দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারী শাস্তির মুখে পড়লেও, রাজনৈতিক ভোল পাল্টিয়ে শাস্তির বদলে উল্টো পদোন্নতি পেয়ে বহাল তবিয়তে আছেন অনেকেই। তাদের মধ্যে অন্যতম মাদারীপুর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক শেখ জিকরুল আলম। তিনি গোপালগঞ্জ টুঙ্গিপাড়া উপজেলার শ্রীরামকান্দি গ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা শেখ আবুল হোসেন ও কুলসুম বেগমের ছেলে।

 

বিতর্কিত নিয়োগ ও কর্মজীবনের শুরুতেই দুর্নীতি

২০১৩ সালে খাদ্য অধিদপ্তরের বিতর্কিত এক নিয়োগ পরীক্ষায় গোপালগঞ্জ টুঙ্গিপাড়ার রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে খাদ্য পরিদর্শক হিসেবে যোগদান করেন শেখ জিকরুল আলম। বিগত সরকারের আমলের ওই নিয়োগ পরীক্ষা নিয়ে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। পরবর্তীতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এই নিয়োগ জালিয়াতির অভিযোগে প্রায় ৫০ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে।

অভিযোগে প্রকাশ, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে শেখ জিকরুল আলমের প্রথম পোস্টিং হয় নিজের জেলা গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলায়। কর্মজীবনের শুরুতেই তিনি নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির সাথে জড়িয়ে পড়েন। কোটালীপাড়া উপজেলায় তার বিরুদ্ধে নানা বিতর্ক ও সমালোচনা শুরু হলে কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে তাকে ফরিদপুর সদরে বদলি করে। মূলত এখান থেকেই তার দুর্নীতির পথচলা আরও পাকাপোক্ত হয়। রাজনৈতিক আশ্রয়ে কর্মস্থলের প্রতিটি জায়গায় তিনি ঘুষ ও অনিয়মের একচ্ছত্র রাজ্য গড়ে তোলেন।

 

কর্মস্থলজুড়ে ঘুষ ও অনিয়মের রাজত্ব

খাদ্য পরিদর্শক হিসেবে শেখ জিকরুল আলমের কর্মস্থলের মধ্যে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া, ফরিদপুর সদর, বাগেরহাটের মোল্লাহাট এবং ঢাকা উল্লেখযোগ্য। এর মধ্যে তিনি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসেন ঢাকায় এরিয়া রেশনিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে।

তার বিরুদ্ধে অন্যতম প্রধান অভিযোগের মধ্যে রয়েছে—সরকারি খাদ্য গুদামে ধান, চাল ও গম সংগ্রহের সময় ওজনে গরমিল করা এবং ভালো মানের চালের পরিবর্তে ঘুষ গ্রহণ করে নিম্নমানের খাদ্যশস্য গ্রহণ করা। মিল মালিকদের সাথে যোগসাজশ করে সরকারি গম ও চালের বরাদ্দ অবৈধভাবে ছাড় করা এবং ব্যক্তিগত হিসাবে বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেন করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এ ছাড়া মিল মালিকদের নানাভাবে হয়রানি করা এবং অবৈধ অর্থ না দিলে বিভিন্ন আইনি ফাঁদে ফেলে অনেক ব্যবসায়ীকে সর্বস্বান্ত করার মতো গুরুতর অভিযোগও তার বিরুদ্ধে রয়েছে।

 

ক্ষমতার পালাবদলে শাস্তি এড়িয়ে পদোন্নতি

ফ্যাসিবাদ আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের ঠিক আগমুহূর্তে, অর্থাৎ ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক হিসেবে পদোন্নতি নিয়ে মাদারীপুরে যোগদান করেন শেখ জিকরুল আলম। যেখানে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ছিল, সেখানে তিনি উল্টো পদোন্নতি লাভ করেন।

উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক শেখ জিকরুল আলমের বিরুদ্ধে আনীত ঘুষ, দুর্নীতি, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে রয়েছে। ইতিমধ্যে তার স্ত্রী তানিয়া ইসলাম, শ্বশুর আবুল হাসেম, শাশুড়ি রেশমা বেগম, তিন সন্তান মুমতাহিনা নূর তাজ, তানজিল জুবাইর ও মো. আওয়ান জুনায়েদসহ বিভিন্ন আত্মীয়স্বজনের নামে-বেনামে থাকা অবৈধ সম্পদের তথ্য চেয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চিঠি প্রেরণ করেছে দুদক।

অঢেল অবৈধ সম্পদ ও বেনামি সাম্রাজ্য

অভিযোগপত্রে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, ঘুষ ও দুর্নীতির অবৈধ অর্থে তিনি রাজধানী ঢাকা এবং নিজ জেলা গোপালগঞ্জ সদর পৌরসভাসহ বিভিন্ন স্থানে বিপুল পরিমাণ সম্পদ অর্জন করেছেন। এসবের মধ্যে রয়েছে একাধিক প্লট, ফ্ল্যাট এবং বিপুল পরিমাণ জমিজমা। আইনের চোখ ফাঁকি দিতে অধিকাংশ সম্পদই পরিবারের সদস্য ও বিভিন্ন আত্মীয়স্বজনের নামে বেনামিতে ক্রয় করা হয়েছে।

গোপালগঞ্জ পৌরসভার মিয়াপাড়া এজি মিশন রোডের ১০০ নম্বর ডুপ্লেক্স বাড়িটি তিনি নিজের বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে নির্মাণ করেছেন। খাদ্য নিয়ন্ত্রক শেখ জিকরুল আলমের অবৈধ সম্পদ বিবরণীর চাঞ্চল্যকর তথ্য নিয়ে খুব শীঘ্রই একটি দ্বিতীয় পর্বের প্রতিবেদন প্রকাশিত হবে।

 

অধিদপ্তরে প্রভাব বিস্তার ও বর্তমান পরিস্থিতি

এত অভিযোগ থাকার পরও ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তিনি কীভাবে পদে বহাল আছেন এবং কেনই বা পদোন্নতি পেলেন—এই প্রশ্ন নিয়ে খাদ্য অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, শেখ জিকরুল আলম বিগত সরকারের আমলে নিজেকে শেখ পরিবারের সদস্য হিসেবে পরিচয় দিতেন। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তিনি বদলি বাণিজ্য করে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন। তার অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে অধিদপ্তরে একাধিক অভিযোগ দায়ের হলেও তার ক্ষমতার কাছে সবকিছু অদৃশ্য হয়ে যেত। অধিদপ্তর থেকে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হলে তার বিভিন্ন অপকর্মের আরও অনেক তথ্য বেরিয়ে আসবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে বর্তমান মাদারীপুর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক শেখ জিকরুল আলমের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। এমনকি হোয়াটসঅ্যাপে খুদে বার্তা পাঠিয়ে তার বক্তব্য জানতে চাওয়া হলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি। ফলে এ বিষয়ে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি

সংবাদটি শেয়ার করে অন্য জানার সুযোগ দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *