ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির পাহাড় ডিঙিয়ে আড়ালে থাকা কর্মকর্তা শাব্বির আহমেদ

নিজস্ব প্রতিবেদক:

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে দীর্ঘ মেয়াদে দায়িত্ব পালনকালে ক্ষমতার অপব্যবহার, ত্রাণের অর্থ আত্মসাৎ, বদলি ও জনবল নিয়োগ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা অর্জনের অভিযোগ উঠেছে সরকারের উপসচিব মো. শাব্বির আহমেদের বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) নিয়োগ, বদলি, টেন্ডার বাণিজ্য, কমিশন এবং প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিস্তর অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। শত শত গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি কীভাবে পর্দার আড়ালে বহাল তবিয়তে আছেন, তা নিয়ে এখন বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

 

কে এই শাব্বির আহমেদ?

পাবনা জেলার ফরিদপুর উপজেলার বনওয়ারী ইউনিয়নের বনওয়ারী গ্রামের স্কুলশিক্ষক আফজাল হোসেন ও মোছাম্মৎ সুফিয়া খানমের ছেলে শাব্বির আহমেদ ১৯৭৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। স্কুলশিক্ষক হিসেবে তাঁর বাবার এলাকায় ব্যাপক সুনাম রয়েছে এবং এলাকাবাসীর মতে ব্যক্তি হিসেবে তাঁর বাবা অত্যন্ত সৎ ও ভালো মানুষ ছিলেন। তবে তাঁদের পারিবারিক আর্থিক অবস্থা একসময় বেশ করুণ ছিল। ছাত্রজীবনে অভাব-অনটন ও তীব্র দারিদ্র্যের সঙ্গে সংগ্রাম করেই তাঁকে পড়ালেখা শেষ করতে হয়। অত্যন্ত মেধাবী হওয়ায় তিনি ২৪তম বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ২০০৫ সালে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে যোগদান করেন।

২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাজনৈতিক নেতা ও প্রভাবশালী মন্ত্রী-এমপিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সখ্য গড়ে তুলে অবৈধ অর্থের লোভে তিনি নানা অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন বলে অভিযোগ রয়েছে।

 

শাহ কামালের একান্ত সচিব হিসেবে ত্রাণের শত শত কোটি টাকা লোপাট

অনুসন্ধানে জানা যায়, অত্যন্ত চালাক ও ধূর্ত প্রকৃতির শাব্বির আহমেদ তাঁর অধিকাংশ অপকর্ম রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ও পর্দার আড়ালে থেকে ধামাচাপা দিয়েছেন। ২০০৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ১৬ আগস্ট দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সিনিয়র সচিব শাহ কামালের মোহাম্মদপুর বাবর রোডের বাসা থেকে নগদ ৩ কোটির বেশি টাকা এবং ১০ লাখ টাকা মূল্যের বিদেশি মুদ্রা উদ্ধার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যৌথ দল। ওই সময় এলাকার বাসিন্দারা গণমাধ্যমকে জানান, সেখান থেকে কয়েক বস্তা টাকা আগেই সরিয়ে ফেলা হয়েছিল, যা সারা দেশে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি করে। এই বিতর্কিত ও দুর্নীতিবাজ সিনিয়র সচিব শাহ কামালেরই একান্ত সচিব (পিএস) ছিলেন শাব্বির আহমেদ।

পূর্বপরিচিতির সূত্রে শাহ কামাল সিনিয়র সচিব হিসেবে যোগদানের মাত্র পাঁচ দিনের মাথায়—২০১৯ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি শাব্বির আহমেদকে নিজের একান্ত সচিব হিসেবে নিয়োগ দেন। ২০২০ সালের ২৯ জুন পর্যন্ত শাহ কামাল এই মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালন করেন। এই কর্মকালীন সময়ে মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন প্রকল্পের নামে শত শত কোটি টাকা লোপাট করা হয়। অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি (৪০ দিনের কর্মসূচি), গ্রামীণ সড়কে ছোট-বড় সেতু-কালভার্ট নির্মাণ, এইচবিবি রাস্তা, বহুমুখী ঘূর্ণিঝড় ও বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প থেকে হরিলুট করা হয় বিপুল অর্থ। এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন তৎকালীন একান্ত সচিব শাব্বির আহমেদ।

করোনাকালে ত্রাণ অনিয়ম এবং রোহিঙ্গা সেলেও দুর্নীতির ছায়া

২০২০ সালে বিশ্বজুড়ে মহামারি করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবকালে যখন দেশের হতদরিদ্র ও অসহায় মানুষ চরম মানবেতর জীবনযাপন করছিল, তখন সরকার নিম্ন আয়ের মানুষের সহায়তার জন্য বেশ কিছু প্রকল্প গ্রহণ করে। কিন্তু তৎকালীন সময়ের সেই ত্রাণের চাল ও অর্থ হরিলুটের অভিযোগ ওঠে। করোনাকালে সৃষ্ট দুর্যোগে ছয় মাস পর্যন্ত ত্রাণ গ্রহণকারী উপকারভোগীর সংখ্যা সংরক্ষণের জন্য মন্ত্রণালয় থেকে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ওই কমিটির সদস্য হিসেবেও শাব্বির আহমেদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।

সিনিয়র সচিব শাহ কামালের দুর্নীতির খবর গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচার হলেও পিএস শাব্বির আহমেদ রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সবসময় ধরাছোঁয়ার বাইরে ও পর্দার আড়ালে থেকে যান। শাহ কামাল অবসরে যাওয়ার পর শাব্বির আহমেদকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে শরণার্থী সেলে (Refugee Cell) বদলি করা হয়। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ত্রাণ বিতরণ, সুযোগ-সুবিধা এবং প্রত্যাবাসন পরিকল্পনা ব্যবস্থাপনার মূল দায়িত্বে থাকা শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (RRRC) কার্যালয়ের এই কার্যক্রমেও তিনি বিপুল পরিমাণ অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

ডিএসসিসির সাবেক মেয়র তাপসের পিএস হিসেবে বিতর্কিত ভূমিকা

ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকার সুবাদে প্রভাবশালী কয়েকজন মন্ত্রী-এমপির সুপারিশে শাব্বির আহমেদ ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) সাবেক বিতর্কিত মেয়র ফজলে নূর তাপসের ব্যক্তিগত সচিব হিসেবেও নিয়োগ পান। তৎকালীন সময়ে মেয়রের কার্যালয়কে কেন্দ্র করে সিটি কর্পোরেশনের নিয়োগ, বদলি, টেন্ডার এবং কমিশন বাণিজ্যের মূল হোতাদের একজন ছিলেন এই শাব্বির আহমেদ।

সাবেক মেয়র ফজলে নূর তাপসের বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির আমলনামা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলেও তাঁর সেই অপকর্মের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগী এবং পরামর্শদাতা হিসেবে শাব্বির আহমেদ রয়ে যান পর্দার আড়ালে। গত ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর ডিএসসিসির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তালিকা প্রকাশ পেলেও সেখানে আশ্চর্যজনকভাবে শাব্বির আহমেদের নাম আসেনি। অভিযোগ রয়েছে, সরকার পতনের পরপরই রাজনৈতিক ভোল পাল্টে তিনি সমস্ত অপকর্ম সুকৌশলে ধামাচাপা দিয়ে ফেলেন। পরবর্তী সময়ে তাঁকে বাংলাদেশ লোক প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে (BPATC) পরিচালক (এসটি অ্যান্ড আরসি) হিসেবে বদলি করা হয়, যেখানে তিনি ১৫৫০৩ পরিচিতি নম্বর নিয়ে বর্তমানে কর্মরত আছেন।

 

রাজধানীর অভিজাত এলাকায় ফ্ল্যাট, গাড়ি ও বেনামি সম্পদ

অনুসন্ধানে শাব্বির আহমেদের বিরুদ্ধে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। রাজধানীর আফতাবনগরের সেকশন-২, ব্লক-ই, লেক ভিউ রোডের ৪০ নম্বর বাসার ৪/সি ফ্ল্যাটে তিনি সপরিবারে বসবাস করছেন। আনুমানিক দুই কোটি টাকা বাজারমূল্যের এই ফ্ল্যাটের নিরাপত্তা প্রহরীর কাছেও শাব্বির আহমেদ এই ফ্ল্যাটের মালিক হিসেবে পরিচিত। এছাড়া তাঁর পরিবারের ব্যবহারের জন্য ‘ঢাকা মেট্রো গ ৪২২৪-৫২’ নম্বরের একটি ব্যক্তিগত গাড়ি রয়েছে, যা তাঁর নিজের নামেই নিবন্ধিত।

পাবনার গ্রামের বাড়িতে ভাঙা টিনের ঘর ভেঙে সুরম্য ডুপ্লেক্স বাড়ি নির্মাণ এবং নিজ জেলায় বিপুল পরিমাণ জমি ক্রয়ের অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। আইনের চোখ ফাঁকি দিতে অধিকাংশ সম্পদ স্ত্রী সাবিনা ইয়াসমিন, শাশুড়ি ছিবারুন নেসাসহ বিভিন্ন আত্মীয়স্বজনের নামে-বেনামে ক্রয় করেছেন তিনি।

এদিকে অনুসন্ধানের সময় এক সাংবাদিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন, শাব্বির আহমেদ অত্যন্ত সৎ কর্মকর্তা এবং অর্থের অভাবে তিনি নিজের বাবার চিকিৎসাও করাতে পারেননি। ওই সাংবাদিকের দাবি অনুযায়ী, শাব্বির আহমেদ বাবার চিকিৎসার জন্য উল্টো ঋণগ্রস্ত, ফলে তাঁর গাড়ি-বাড়ি থাকার কথা নয়। তবে এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন করা হলে তিনি এড়িয়ে যান।

 

দুদকের অনুসন্ধান ও তদবির বাণিজ্য

একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সূত্রে জানা গেছে, ঘুষ, দুর্নীতি, প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ, নিয়োগ-বদলি বাণিজ্য এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে শাব্বির আহমেদের বিরুদ্ধে দুদক বর্তমানে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান শুরু করেছে। ইতিমধ্যে তাঁর সম্পদের হিসাব এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা থাকা নগদ অর্থের তথ্য চেয়ে বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি পাঠানো হয়েছে। দুদক যাতে কোনো আইনি ব্যবস্থা নিতে না পারে এবং সংবাদমাধ্যমে যাতে তাঁর দুর্নীতির খবর প্রকাশিত না হয়, সে জন্য তিনি ইতিমধ্যে বিভিন্ন মহলে জোর তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে শাব্বির আহমেদের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। এমনকি তাঁর হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে খুদেবার্তা পাঠানো হলেও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।

সংবাদটি শেয়ার করে অন্য জানার সুযোগ দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *