নিজস্ব প্রতিবেদক:
রাজশাহীর গোদাগাড়ীর সুলতাগঞ্জে পদ্মা-মহানন্দা নদীর মোহনায় অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ কর্তৃপক্ষ বিআইডব্লিউটিএর একটি আন্তর্জাতিক নদীবন্দর বা নৌপ্রটোকল রয়েছে। এ বন্দরের সঙ্গে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ময়া নৌবন্দরের নৌযোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে কয়েক বছর আগে।
সুলতানগঞ্জ-ময়া পথে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য চালু হয় ২০২৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি। নৌবন্দরটির কার্যক্রম সচল আছে। আশপাশের উজান-ভাটির ২০ কিলোমিটার নদী এলাকা সুলতানগঞ্জ নৌবন্দরটির সীমানা হিসেবে গেজেটভুক্ত। এই সীমানার সংরক্ষক বিআইডব্লিউটিএ।
এদিকে বিআইডব্লিউটিএ সুলতানগঞ্জ নৌবন্দর সন্নিহিত পদ্মা নদীর এলাকা নৌবন্দর সীমানাভুক্ত নদী থেকে বালু উত্তোলনকে ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় নৌপরিবহণ ও ভূমি মন্ত্রণালয়সহ রাজশাহীর জেলা প্রশাসনকে বালুমহালের ইজারা কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেয়। ফলে চলতি বছরে গোদাগাড়ী এলাকায় অবস্থিত পদ্মার ছয় মৌজা বালুমহালের ইজারা কার্যক্রম বন্ধসহ বালুমহালটি স্থায়ীভাবে বন্ধ করে রাজশাহী জেলা মাটি ও বালু ব্যবস্থাপনা কমিটি তথা জেলা প্রশাসন।
রোববার সকালে সরেজমিন দেখা গেছে, বন্ধ বালুমহালটির সাবেক ইজারাদার মাম এন্টারপ্রাইজের মালিক আব্দুল মান্নাফ বালু উত্তোলন বন্ধ করেননি। বরং বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর থেকেই নদীতীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকায় ভেকু দিয়ে উর্বর পলিমাটি কেটে সাবাড় করছেন। পাশাপাশি পদ্মার উজানে সুলতানগঞ্জ থেকে ভাটিতে ফুলতলা পর্যন্ত ১০ কিলোমিটার নদী এলাকায় ড্রেজার নামিয়ে লাখ লাখ ঘনফুট বালু উত্তোলন করছেন। এক্ষেত্রে বিআইডব্লিউটিএ নীরব ভূমিকা পালন করছে।
অন্যদিকে স্থানীয়রা অভিযোগ জানিয়ে বলেছেন, গোদাগাড়ীর ফুলতলা থেকে উজানে রেলবাজার পর্যন্ত বিস্তীর্ণ নদীতট এলাকায় এবার উর্বর পলিমাটি পড়ে জমিগুলো উঁচু হয়েছে। এসব জমি নদীপাড়ের মানুষের। তারা কয়েক বছর ধরে বালুমহালটি বন্ধের দাবিতে আন্দোলন করছেন। নতুন পলিবাহিত উর্বর মাটিতে ফসল আবাদের পরিকল্পনা করেছিলেন তারা; কিন্তু গত দুই মাস ধরে আগের ইজারাদার বালুমহালের দখল নিয়ে পলি কেটে উজাড় করছেন। ফুলতলাসহ চার-পাঁচটি পয়েন্ট দিয়ে প্রতিদিন কয়েক লাখ ঘনফুট বালু ও শতাধিক ট্রাক মাটি লোপাট হচ্ছে।
এলাকাবাসীর আরও অভিযোগ, জেলা প্রশাসন বালুমহালটি বন্ধ ঘোষণাসহ এবার ইজারা দেয়নি; কিন্তু সাবেক ইজারাদার কিভাবে ভেকু, এক্সকেভেটর ও ড্রেজার নামিয়ে রাতদিন ২৪ ঘণ্টা বালু-মাটি লুট করছেন, তা এলাকার মানুষ জানেন না। তারা অবিলম্বে সাবেক ইজারাদারের এ কার্যক্রম বন্ধের দাবি জানিয়েছেন।
এলাকাবাসী আরও জানান, গত বছরও সাবেক এই ইজারাদার ইজারার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তিন মাস পর্যন্ত অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও মাটি লুট করেছিলেন। এবারও ইজারার শর্তাবলির তথ্য গোপন করে কোনো আদালত থেকে হয়তো আদেশ এনেছেন।
অন্যদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পদ্মার এই বন্ধ ঘোষিত বালুমহালটির সাবেক ইজারাদার মাম এন্টারপ্রাইজের মালিক আব্দুল মান্নাফ গত জুলাই মাসে নিজেকে ক্ষতিগ্রস্ত দাবি করে হাইকোর্টে একটি রিট করেন। গত ৬ আগস্ট হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ সাবেক ইজারাদারকে পরবর্তী তিন মাসের জন্য বালুমহালের কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি দেন। এই আদেশের সময়সীমা আগামী ৬ নভেম্বর শেষ হওয়ার কথা। তবে সাবেক ইজারাদার কৌশলে আগের আদেশ বাড়িয়ে নেন।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, সাবেক ইজারাদারকে বালু উত্তোলনের আদেশের কপি পেয়ে রাজশাহী জেলা মাটি ও বালু ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম গত ৭ সেপ্টেম্বর নৌপরিবহণ ও ভূমি মন্ত্রণালয়, চেয়ারম্যান বিআইডব্লিউটিএ, আইন, বিচার ও সংসদ মন্ত্রণালয়ের সলিসিটরসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে জরুরি চিঠি পাঠান।
ওই চিঠিতে জেলা প্রশাসক স্পষ্ট করে লেখেন, সাবেক ইজারাদারের সঙ্গে ইজারা চুক্তি অনুযায়ী তিনি ২০২৫ সালের ১৪ এপ্রিল বা ১৪৩৩ বাংলা সনের ৩০ চৈত্র বালুমহালটি ভোগদখল করেছেন। চুক্তির বিভিন্ন শর্তানুযায়ী মেয়াদ শেষে এই বালুমহালের ওপর সাবেক ইজারাদারের কোনো অধিকার বহাল থাকে না। হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে দ্রুত সময়ে আপিল দাখিলের জন্য জেলা প্রশাসক নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ সংশ্লিষ্টদের প্রতি অনুরোধ করেন।
খোঁজ নিয়ে আরও জানা গেছে, জেলা প্রশাসনের চিঠি পাওয়ার পর অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ কর্তৃপক্ষ হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে দ্রুত সময়ে আপিল দাখিলের সিদ্ধান্ত নিলেও সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর থেকে পিছিয়ে যায় রাজশাহীর একজন নেতার হস্তক্ষেপে। ওই নেতা গত মাসের শেষে খোদ বিআইডব্লিউটিএ সদর দপ্তরে হাজির হয়ে কর্মকর্তাদের আপিল দাখিল না করার জন্য চাপ প্রয়োগ করেন। শেষপর্যন্ত বিআইডব্লিউটিএর পক্ষে আপিল দাখিলে গড়িমসির কারণে সাবেক ইজারাদার একতরফা শুনানি করে বালু উত্তোলন অব্যাহত রাখার দ্বিতীয় আদেশ হস্তগত করেন।
পদ্মার ছয় মৌজা বালুমহাল এলাকার বাসিন্দা শরিফুল ইসলাম অভিযোগে বলেন, সাবেক এই ইজারাদার গত বছর ইজারার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আরও তিন মাস অবৈধভাবে বালু ও মাটি লোপাট করেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. বেলায়েত হোসেন জানান, হাইকোর্টের প্রথম আদেশটি পাওয়ার পরপরই জেলা প্রশাসন থেকে আইন মন্ত্রণালয়ের সলিসিটরসহ বিআইডব্লিউটিএর কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ করা হয়। কিন্তু কর্তৃপক্ষ আপিল দাখিলে কেন বিলম্ব করছে, সেটা আমরা জানি না। জেলা মাটি ও বালু ব্যবস্থাপনা কমিটির সিদ্ধান্তে বালুমহালটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। এটির ওপর জেলা প্রশাসনের এখন কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এটির কাস্টোডিয়ান এখন বিআইডব্লিউটিএ।