বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ে রায়না চক্রের নিয়োগ-পদোন্নতিতে অনিয়ম

নিজস্ব প্রতিবেদক:

বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন অনু বিভাগে সম্প্রতি বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলি প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়ম ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। দপ্তরটির একাধিক সূত্র ও ভুক্তভোগী অভিযোগ করে বলেছেন, পদোন্নতির প্রক্রিয়ায় কোনো নিয়মনীতি অনুসরণ করা হয় না। অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় গোপনে অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে তাঁর পছন্দের লোকদের নানারকম সুবিধা দেন অতিরিক্ত সচিব রায়না আহমদ।

প্রশাসনের অতিরিক্ত সচিব রায়না আহমদ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতাসীনদের ম্যানেজ করে তাঁদের বিশেষ সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে নানারকম বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়। অনিয়মের ধরন সম্পর্কে অনুসন্ধানে জানা যায়, রায়না আহমদ পরীক্ষা ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে যোগ্য প্রার্থী থাকা সত্ত্বেও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে অযোগ্যদের পদোন্নতি দিয়েছেন।

সিস্টেম এনালিস্ট এটিএন আলিমুজ্জামান, প্রোগ্রামার মো. আমিনুল ইসলাম, প্রশাসনিক কর্মকর্তা-২ মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম, নুর-এ জান্নাত (সহকারী লাইব্রেরিয়ান), মো. সাকিল কেয়ারটেকার ও একান্ত সহযোগী, ব্যক্তিগত কর্মকর্তা মাহাবুব আলম রায়না আহমদের সহযোগী হিসেবে পরিচিত। পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে যেকোনো অনিয়মকে নিয়ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে এই কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

মো. উজ্জল বর্তমান প্রশাসনিক কর্মকর্তা, মো. হাসান আলী (বর্তমান ব্যক্তিগত কর্মকর্তা), মোছা. আমেনা বেগম (বর্তমানে আইন-১ শাখায় অফিস সহকারী হিসেবে কর্মরত), মো. সেলিম, বর্তমানে প্রশাসন-২ শাখায় অফিস সহকারী হিসেবে কর্মরত, বেগম নাসরিন আক্তার (হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা)—এই পাঁচজনকে নিয়ম উপেক্ষা করে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। সূত্র বলছে, হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা বেগম নাসরিন আক্তার ভুয়া সনদে চাকরি করছেন।

হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা বেগম নাসরিন আক্তারের সনদ জাল কি না জানতে শনিবার বিকেল সাড়ে পাঁচটায় দৈনিক আমাদের মাতৃভূমি থেকে হোয়াটসঅ্যাপে ফোন করলে সেখানে তাঁর সঙ্গে ১৫ মিনিটে যে কথোপকথন হয়েছে, তার শব্দচয়ন ও উচ্চারণ অপরিবর্তিত রেখে হুবহু লিখে দেওয়া হলো:

—যে আপনাকে এই তথ্য দিয়েছে, দেখেন, তার নিজের অপরাধের অভাব নাই। প্রত্যেকের ঘরে-বাইরে শত্রু আছে। আমারও আছে। আমি এসএসসির পরে একদিনও সময় নষ্ট করিনি, ১৯৮৮ সালে আমার চাকরি হয়েছে। তখন চাকরি নিয়েছি অফিস সহকারী ও মুদ্রাক্ষরিক পদে। এর পরে আমার তিনটি পদোন্নতি হয়েছে। আরও দুই বছর চাকরি আছে। সার্টিফিকেট জাল থাকলে তো পদোন্নতি হতো না। এ বিষয়ে ২০০৬ সাল থেকে কিছু শয়তান সাংবাদিক আমার তথ্য খোঁজাখুঁজি শুরু করছে। ২০০৯ সালে এক শয়তান সাংবাদিক আমার তথ্য চাওয়ার পরে কাকরাইল মসজিদের সামনে গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা গেছে। আপনাকে যে তথ্য দিয়েছে, ওই শয়তান সাংবাদিক তার আপন বোনজামাই। আমার মন্ত্রণালয়ের ওই শয়তানের সঙ্গে আপনি জিজ্ঞেস করে জানতে পারবেন, তার আপন বোনজামাই। এমন শয়তান আমার জা মানুষের হয়! সেটা ভাবতেই ঘৃণা হয়। আপনি ওই শয়তানকে জিজ্ঞেস করেন, তোর কী কী ত্রুটি আছে। আমি তো অন্যের ত্রুটির তথ্য দেব না। জাল সার্টিফিকেট তথ্য প্রথম ২০০৬ সালে যখন সাংবাদিকরা জানতে চায়, তখনই বুঝছি ওই শয়তান তথ্য দিয়েছে। আমার স্বামী তখন আমাকে বলেছিল, যাও, ওরে গিয়ে দুগালে দুটো থাপ্পড় লাগিয়ে দাও। আমি তো নিজের ‘জা’-কে থাপ্পড় মারতে পারি না। এসব ঘটনার কারণেই আমার স্বামী তখন হার্ট অ্যাটাক করে। সেই সময় (২০ বছর আগে) সচিব নিজ উদ্যোগে আমার স্বামীর চিকিৎসা করেছিল। এসব ঘটনার কারণেই আমার সন্তানটাও আজ দূরে। আর আমার অপরাধ হলো, আমি আমার হাসব্যান্ডের স্ত্রী। আপনি যদি আমার সঙ্গে কথা বলতে চান, তাহলে সচিব স্যারের পারমিশন নিয়ে আসেন, আমি সব কথা বলব। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর বা সচিবের দপ্তরের বাইরে এ বিষয়ে কেউ তদন্ত করতে পারবে না। ওই শয়তান দুদকের চিঠি নিয়ে এসেছিল একবার। কী হবে তাতে। আমাদের সচিব গিয়ে দুদকের সচিব হয়েছিল। কোথাকার একটি সীলমোহর দিয়ে দুদকের চিঠি নিয়ে এসেছিল। এতে আমার কিছু হবে না। আপনি বলেন, আমার তিনটি প্রমোশন হলো কি এমনই! আমার মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং পিএসসি মিলে এমন প্রমোশন হয়েছে। আমার মন্ত্রণালয় না হয় আমি ম্যানেজ করলাম, পিএসসি ও অন্য মন্ত্রণালয় কি ম্যানেজ করা সম্ভব? আপনি বলেন। আমি এখন প্রশাসনিক কর্মকর্তা। আমার আপন জা এত বড় অসভ্য, তা আর কী বলব। যাই হোক, আপনাকে অনেক কথাই বলে ফেললাম, সরি।হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা বেগম নাসরিন আক্তারের একাডেমিক তথ্য জানতে মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা-১ হাসান ইমামের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি

জানিয়েছেন, তথ্য অধিকার আইনে আমাদের কাছে চিঠি দিয়ে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্টদের অনুমতি সাপেক্ষে আমি জানাতে পারি। সরাসরি এভাবে বলা কিছুটা কঠিন বলে উল্লেখ করেন এই অফিসার।

উল্লেখ্য, পদের জন্য একই মন্ত্রণালয়ে যোগ্য ব্যক্তি থাকা সত্ত্বেও অনৈতিক সুবিধার মাধ্যমে অযোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ, পদোন্নতি ও বিশেষ সুবিধা প্রদান করা হয়েছে। তাছাড়াও মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তর ও সংস্থার অযোগ্য ব্যক্তিদের আর্থিক অবৈধ লেনদেনের সঙ্গে নেপথ্যে যুক্ত থাকারও অভিযোগ পাওয়া যায়। পদোন্নতি, বদলি কিংবা যেকোনো কাজে তিনিই সিদ্ধান্ত দেন বলে প্রভাব বিস্তার করে অধস্তন কর্মচারীদের নিকট নিজেকে অঘোষিত ‘সচিব’ হিসেবে উপস্থাপন করে।

রায়না আহমদ বস্ত্র-পাট মন্ত্রণালয়কে নিজের বসতবাড়ি মনে করে যা ইচ্ছা তাই করে। মন্ত্রণালয়ের সফল ধরনের প্রকল্প ও টেন্ডার তাঁর আত্মীয়-স্বজনের মাধ্যমে টাকা খেয়ে টেন্ডার বাণিজ্য করে থাকেন। তাঁর একান্ত সহযোগী বলেন, রায়না ম্যাম পাট মন্ত্রণালয়ের প্রধানমন্ত্রী। তাঁর সিদ্ধান্ত এখানে শেষ কথা। ইচ্ছামতো কর্মচারীদের সঙ্গে যা করবে (অন্যায়-অবিচার), সকলকে মেনে নিতে হবে। এই রায়নাকে অনেকবার বদলি করা হলেও অদৃশ্য ক্ষমতাবলে তিনি বদলি বাতিল করেন। এসব অভিযোগ রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে জানানো হলেও রায়না আহমদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি কেউ। এ বিষয়ে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মন্তব্য জানতে চাইলে কর্তৃপক্ষ জানান, যে কোনো অনিয়মের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি বজায় রাখা হবে। কিন্তু ফলস্বরূপ কোনো কিছুই ঘটেনি। অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযুক্ত অতিরিক্ত সচিব রায়না আহমদের মন্তব্য চেয়ে একাধিকবার ফোন করা হলে তাঁকে পাওয়া যায়নি। সর্বশেষ রবিবার ৬ সেপ্টেম্বর বিকেল চারটায় তাঁর হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করা হয়েছিল।

মন্ত্রণালয়ের বেওবি অধিশাখার যুগ্মসচিব ড. মো. মনজুরুল ইসলাম বলেছেন, রায়না আহমদের এমন বদলির খবর জানা নেই। তবে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের ১৭ মার্চ রায়না আহমদকে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব পদে বদলি করা হলেও অদৃশ্য কোনো উপায়ে এই সরকারের এই কর্মচারী একই মন্ত্রণালয়ে (বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়) রয়ে গেছেন। এর আগেও তাঁকে অন্যত্র বদলি করার খবর দিয়ে একটি সূত্র বলছে, সেখানেও তিনি যাননি।

প্রশাসন-১ (২১ ব্যাচের) উপসচিব জিল্লুর রহমান এবং বেওবি শাখার প্রশাসনিক কর্মকর্তা জুয়েল মোল্যা অতিরিক্ত সচিব রায়না আহমদের নেতৃত্বে যেকোনো অন্যায় কাজ সফলভাবে করতে পটু। গুটিকয়েক কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলে সংঘবদ্ধ এক জোটে থেকে এরা যখন যে দলের সরকার হোক, এরা তখন পরিচয় দেয় কলেজ জীবনে সেই সরকারের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। এভাবে পরিকল্পিত প্রচার চালিয়ে প্রভাব বিস্তার করে। তাঁদের অধীনস্থ কর্মচারীদের সর্বদা হয়রানির মধ্যে রাখে এবং সুবিধা নিয়ে নিজেদের ইচ্ছেমতো প্রমোশন বা সুবিধা দেয়। মন্ত্রণালয়ের নিয়মকানুন তোয়াক্কা না করা জিল্লুর রহমান ও জুয়েল মোল্যার স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে অভিযোগ করে কোনো ভুক্তভোগী ফল পায়নি, উল্টো হয়রানির শিকার হয়েছে। এতে মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত করছে। এশিয়ান ইউনিভার্সিটির সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান ড. আনিসুর রহমান বলছেন—সমন্বিত অগ্রগতি পিছিয়ে থাকার মূল কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে—প্রাতিষ্ঠানিক অদক্ষতা, সমন্বয়ের অভাব, সুশাসনের ঘাটতি এবং অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত বৈষম্য। সামষ্টিক উন্নয়ন বা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জনের ক্ষেত্রে কোনো দেশ, সমাজ বা অঞ্চলের সামগ্রিক অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হওয়ার পেছনে সুনির্দিষ্ট কিছু বিষয় কাজ করে। স্টাফদের অভ্যন্তরীণ বৈষম্য নিরসনের মাধ্যমে সরকার তার উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করে অন্য জানার সুযোগ দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *