গণপূর্ত সম্পদ বিভাগে লুটপাটের মহোৎসব নির্বাহী প্রকৌশলী শফিউলের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক:

গণপূর্ত সম্পদ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ও আ’লীগের সুবিধাভোগী শফিউল ইসলামের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। তাঁর নেতৃত্বে গত দুই বছর যাবৎ ডিভিশনটিতে এক ধরনের নীরব হরিলুট হয়েছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রকৌশলী শফিউল ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে প্রায় কোটি টাকার আরএফকিউ করে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিয়ে ১০ শতাংশ হিসাবে প্রায় ১০ লাখ টাকা লোপাট করেছেন। এ কাজে তিনি রাইসা এন্ড সন্স, এ খান এন্ড সন্স, এজেড ইঞ্জিনিয়ারিং, জিএনএস ইঞ্জিনিয়ারিং ও নবরূপা বিল্ডার্সসহ আরও একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করেছেন। তাদের নামে এসব কাজ পাইয়ে দিয়ে বরাদ্দের প্রায় কোটি টাকা প্রকৌশলী শফিউলের নেতৃত্বে ভাগ-বাটোয়ারা হয়েছে বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শোষিত-বঞ্চিত এক ঠিকাদার জানিয়েছেন।

আরও জানা যায়, পাবনার লোক হিসেবে সাবেক প্রেসিডেন্ট চুপ্পুর প্রভাবে ২০২৪ সালের অক্টোবরে ডিভিশনটির দায়িত্বে এসে টাকার নেশায় এলটিএম টেন্ডার নিয়ে জালিয়াতি, বেনামে ঠিকাদারি ব্যবসা, ভুয়া বিল-ভাউচারসহ বিবিধ অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন তিনি। এভাবে ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেন এই পিসিখোর গণপূর্ত প্রকৌশলী। এমনকি ফ্যাসিবাদী লোকদের নামে কাজ পাইয়ে দিয়ে নিজেই পরোক্ষভাবে ব্যবসা করেছেন বলেও অভিযোগ আছে।

প্রকৌশলী শফিউলের আসকারায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের আস্থাভাজন এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত পতিত লীগ সরকারের আমলে ৭ নম্বর ওয়ার্ড তেজকুনিপাড়া ও তেজগাঁও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং ‘মা এন্টারপ্রাইজ’-এর মালিক জামাল হোসেন এখনও বহাল তবিয়তে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন গণপূর্ত সম্পদ বিভাগে। তাঁর প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার জন্য মরিয়া ছিলেন প্রকৌশলী শফিউল ইসলাম।

বর্তমানে এই প্রকৌশলী ভোল পাল্টে নিজেকে বিএনপিপন্থী দাবি করছেন। এমনকি পাবনা নিবাসী বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা শিমুল বিশ্বাসের নাম ভাঙিয়ে বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। লুটপাটকৃত অর্থের কিছু অংশ বিনিয়োগে রাজধানীর ধানমন্ডিতে কয়েক কোটি টাকা দিয়ে ফ্ল্যাট কিনে সেখানে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে বসবাস করেন তিনি। এ ছাড়া ঢাকা ও পাবনায় নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ সহায়-সম্পদের মালিক হয়েছেন প্রকৌশলী শফিউল ইসলাম।

জানা যায়, গণপূর্ত সম্পদ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে যোগদান করার পর তাঁর নেতৃত্বে এক সুবিশাল সিন্ডিকেট বাহিনী গড়ে উঠেছে। লীগের দোসর কথিত ঠিকাদারদের সঙ্গে গোপনে আঁতাত করে ত্রুটিপূর্ণ কাজ এবং কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে তিনি কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। তাঁর সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে পরিচিত ছিলেন সহকারী প্রকৌশলী ও স্টাফ অফিসার শরিফুল ইসলাম। আরও জড়িত ছিলেন একজন উপ-সহকারী প্রকৌশলী। এই তিন কর্মকর্তার কাছে সাধারণ ঠিকাদাররা জিম্মি হয়ে পড়েছেন বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে।

২০২৪-২৫-২৬ অর্থবছরে গণপূর্ত ট্রেনিং একাডেমির সুইমিং পুল মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে পাইয়ে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া এলেনবাড়ি এলাকার সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নির্মিত ১ নম্বর ও ২ নম্বর ভবনের মেরামতের নামে প্রায় ৬০ লাখ টাকার অনিয়মের অভিযোগও উঠেছে শফিউল ইসলামের বিরুদ্ধে। ১ নম্বর ভবনে বসবাসকারী প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা এই প্রতিবেদককে জানান, গত দুই বছরে বিল্ডিংয়ে কোনো সংস্কার কাজ হয়নি।

অন্যদিকে, ১২ মে ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত আউটসোর্সিং জনবল নিয়োগ-সংক্রান্ত টেন্ডার নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ করা হয়েছে, একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পূর্বনির্ধারিতভাবে জনবল নিয়োগের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। এ খাতে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি।

একাধিক সূত্রে আরও জানা যায়, বিএনপি সরকারপ্রধান জনাব তারেক রহমান তেজগাঁও নভোথিয়েটার পরিদর্শন ও আগমন উপলক্ষে, থিয়েটারের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য তাঁর মনোনীত ঠিকাদার লীজা এন্টারপ্রাইজকে ১৭ লাখ টাকা, তিনটি প্যাকেজে মোট ৫০ লাখ টাকা কার্যাদেশের বিপরীতে অগ্রিম ১০ শতাংশ হারে কমিশন নিয়ে নামমাত্র মূল্যে সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ সম্পন্ন করার পাঁয়তারা করছেন ঠিকাদার ও নির্বাহী প্রকৌশলী মিলে। এ ছাড়া তেজগাঁও বিমান জাদুঘর সাজানো, মেরামত-সংস্কার কাজের বিপরীতে একই কায়দায় তাঁর মনোনীত ঠিকাদার দিয়ে নামমাত্র সংস্কার-মেরামত কাজ করে সমুদয় টাকা আত্মসাৎ করছেন নির্বাহী প্রকৌশলী শফিউল ইসলাম। কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে খামারবাড়ি তুলা ভবনের মেরামত-সংস্কার কাজের প্রাক্কলন করে চড়া মূল্য, সেখানেও নয়-ছয় করে মেরামত-সংস্কার কাজ দেখিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা আত্মসাৎ করে হাতিয়ে নিয়েছেন বিপুল পরিমাণ অর্থ। আর আনুষঙ্গিক কাজের নামে কাগজে-কলমে সংস্কার-মেরামত কাজ করা হয়। বাস্তবে কাজের হদিস পাওয়া যাবে না। বরাদ্দের পুরো টাকা ভাগ-বাটোয়ারা করে গিলে খাচ্ছেন দুর্নীতির বরপুত্র নির্বাহী প্রকৌশলী শফিউল ইসলাম। সম্পদ বিভাগের অধীনে ট্রেনিং একাডেমির মেরামত-সংস্কার ও কেনাকাটা কাজের বিপরীতে একই কায়দায় অতিরিক্ত প্রাক্কলন করে বরাদ্দকৃত অর্থ তসরুপ করছেন মহা ঘুষখোর, দুর্নীতিপরায়ণ লীগের দোসর নির্বাহী প্রকৌশলী শফিউল ইসলাম।

উল্লেখিত অভিযোগগুলোর ব্যাপারে নির্বাহী প্রকৌশলী শফিউল ইসলামের মোবাইলে ফোন দিলে ফোন রিসিভ না করায় তাঁর কোনো মতামত পাওয়া যায়নি।

সংবাদটি শেয়ার করে অন্য জানার সুযোগ দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *