শিশু হাসপাতালের উপ-পরিচালক নেছার উদ্দীনের বিরুদ্ধে প্রভিডেন্ট ফান্ডে টাকা আত্মসাৎ ও ভাউচার কারসাজি করে অঢেল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজধানীর শীর্ষ চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট–এর ভেতরে আর্থিক অনিয়মের যে চিত্র সামনে আসছে, তা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে না—ঝুঁকির মুখে ফেলছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের সঞ্চিত প্রভিডেন্ট ফান্ড।

প্রভিডেন্ট (সিপিএ) ফান্ড ব্যবস্থাপনায় হিসাব গরমিল, ভাউচার কারসাজি এবং প্রশাসনিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগ ঘিরে তৈরি হয়েছে এক গভীর সংকটের চিত্র। তদন্ত কমিটির প্রাথমিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এমন কিছু তথ্য, যা ইঙ্গিত দেয়—অনিয়মগুলো বিচ্ছিন্ন নয়, বরং দীর্ঘদিনের চর্চিত একটি ধারা হতে পারে।

ভূয়া বিল ভাউচার দিয়ে অর্থ লুটপাট:

তদন্তে দেখা গেছে, একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তার হিসাবেই গরমিল পাওয়া গেছে উপ-পরিচালক (হিসাব ও অর্থ) এ এইচ এম নেছার উদ্দীনের হিসাবে প্রায় ৫৯ হাজার টাকার অসামঞ্জস্য, সাবেক উপ-পরিচালক শাহ আলম মিয়ার ক্ষেত্রে ৬৪ হাজার টাকার বেশি গরমিল, সাবেক ক্যাশিয়ার ইদ্রিস আলী ও সহকারী হিসাবরক্ষক মফিজুল ইসলামের হিসাবেও দশ হাজার থেকে লাখ টাকার অনিয়মের অভিযোগ।

সংখ্যাগুলো আলাদাভাবে সীমিত মনে হলেও, ধারাবাহিকভাবে একাধিক কর্মকর্তার ক্ষেত্রে একই ধরনের গরমিল একটি বড় ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়—যেখানে নজরদারি ও জবাবদিহি প্রশ্নবিদ্ধ।

ভাউচার কারসাজি: নিয়ম ভেঙে ব্যয়ের বিস্তার

তদন্তে আরও উঠে এসেছে ব্যয় সংক্রান্ত ভাউচার ব্যবস্থায় অস্বাভাবিকতা যাতায়াত খরচ নির্ধারিত সীমার (২০০–২৫০ টাকা) বাইরে গিয়ে ৩৫০–৭০০ টাকা পর্যন্ত দেখানো, আপ্যায়ন খাতে অনুমোদিত সীমার কয়েকগুণ বেশি ব্যয়, একই ধরনের খাতে পুনরাবৃত্ত বিল উত্তোলনের অভিযোগ।

এ ধরনের প্যাটার্ন আর্থিক ব্যবস্থাপনায় “expense inflation” বা ব্যয় ফুলিয়ে দেখানোর প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ—যা দীর্ঘমেয়াদে বড় অঙ্কের অর্থ সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করে।

সিন্ডিকেটের অভিযোগ: প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণের বলয়

অভিযোগ রয়েছে, অর্থ বিভাগকে কেন্দ্র করে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী বা “সিন্ডিকেট” গড়ে উঠেছে, যারা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করে।

বিভিন্ন সূত্রের দাবি অনুযায়ী বদলি ও পদোন্নতিতে অনানুষ্ঠানিক আর্থিক লেনদেন, অনুমোদন প্রক্রিয়ায় নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের প্রভাব,নক্রয়-বাণিজ্যে পছন্দের সরবরাহকারীকে সুবিধা প্রদান।

প্রভিডেন্ট ফান্ডে লুট: অবসরের অর্থ অনিশ্চিত?

কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি বড় অংশ তাদের ভবিষ্যৎ সঞ্চয় নিয়েই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

একজন কর্মচারীর ভাষ্য “নিজেদের টাকাই তুলতে গেলে অকারণ বিলম্ব হয়, পরিষ্কার হিসাব পাওয়া যায় না।”
যদি ফান্ড ব্যবস্থাপনায় এই ধরনের অস্বচ্ছতা চলতে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে অবসরপ্রাপ্তদের প্রাপ্য অর্থ পরিশোধে সংকট তৈরি হতে পারে।

সম্পদের বিস্তার: আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যের প্রশ্ন

অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা কর্মকর্তাকে ঘিরে আরেকটি গুরুতর প্রশ্ন উঠে এসেছে—সম্পদের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি: গাজীপুরে বহুতল ভবন, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নিজ ও পরিবারের নামে জমি-বাড়ি, একাধিক ব্যাংকে উল্লেখযোগ্য অঙ্কের সঞ্চয়

এসব সম্পদের উৎস ও অর্জনের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতার প্রভাব ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের সুযোগ কাজে লাগিয়ে এই সম্পদ গড়ে তোলা হয়ে থাকতে পারে। তবে বিষয়গুলো এখনো তদন্তাধীন এবং স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন।

পদোন্নতি ও বদলি বাণিজ্য: অভিযোগের নতুন মাত্রা

নতুন করে উঠে এসেছে আরও একটি গুরুতর অভিযোগ—ক্ষমতার অপব্যবহার করে পদোন্নতি ও বদলি প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার।

সূত্রগুলোর দাবি: আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে পদোন্নতি বা সুবিধাজনক পদায়ন, পছন্দের কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বসানো, প্রশাসনিক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করা।

প্রশাসনের অবস্থান ও তদন্তের অগ্রগতি

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অভিযোগের পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে,প্রতিবেদন হাতে পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এছাড়া বিষয়টি নজরদারিতে রয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়–এর একটি সূত্র।

সংবাদটি শেয়ার করে অন্য জানার সুযোগ দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *