শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে আওয়ামী সিন্ডিকেটের রাজত্ব: ক্ষুব্ধ বঞ্চিত প্রকৌশলীরা, মন্ত্রী মিলনের হস্তক্ষেপ কামনা

সাজিদ দেওয়ান, নিজস্ব প্রতিবেদকঃ

​শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে (ইইডি) দীর্ঘদিনের বঞ্চনা আর বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে স্বচ্ছতা ফেরার প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবে চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। বর্তমান বিএনপি সরকারের আমলেও অধিদপ্তরে জেঁকে বসেছে বিগত আওয়ামী লীগের দোসর ও প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। বিশেষ করে ঢাকা জেলা সার্কেলের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. গোলাম মোত্তাকিনের পদায়নকে কেন্দ্র করে অধিদপ্তরের ভেতরে চরম উত্তেজনা ও গুঞ্জন সৃষ্টি হয়েছে। বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের একজন সক্রিয় সদস্য হয়েও অদৃশ্য ক্ষমতার প্রভাবে ঢাকা জেলার মতো গুরুত্বপূর্ণ সার্কেলে তার বহাল থাকা এবং প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তরসহ শিক্ষা ভবনের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে আওয়ামীপন্থী প্রকৌশলীদের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পদায়ন করায় সাধারণ ও বিএনপি-পন্থী প্রকৌশলীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, একটি প্রভাবশালী মহল মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে আওয়ামী ঘরানার প্রকৌশলীদের সুরক্ষা দিচ্ছে, যা বর্তমান সরকারের সংস্কার ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার নীতির সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
​মো. গোলাম মোত্তাকিনের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় দীর্ঘ। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কুষ্টিয়ায় কর্মরত থাকাকালীন তিনি আওয়ামী লীগের তৎকালীন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফের গ্রুপের সিন্ডিকেট সদস্য হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সে সময় তিনি ওটিএম (Open Tendering Method) পদ্ধতির আড়ালে টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে নির্দিষ্ট সিন্ডিকেট সদস্যদের কোটি কোটি টাকার কাজ পাইয়ে দিতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনি প্রকাশ্যে গর্ব করে বেড়াতেন যে, মাহবুবুল আলম হানিফ তার নিকটাত্মীয়, যার প্রভাব খাটিয়ে তিনি ধরাকে সরা জ্ঞান করতেন। বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের পদধারী নেতা হয়েও বর্তমানে ঢাকার মতো লোভনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে তার অবস্থান অধিদপ্তরের সৎ ও বঞ্চিত প্রকৌশলীদের অবাক করেছে। শুধু মোত্তাকিন নন, শিক্ষা ভবন ও প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তরের একটি বিশাল সিন্ডিকেট বর্তমানে সক্রিয় হয়ে উঠেছে, যারা সুকৌশলে আওয়ামী ঘরানার প্রকৌশলীদের গুরুত্বপূর্ণ সার্কেল ও জোনে পদায়ন নিশ্চিত করছে, অথচ গত ১৫ বছর যারা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে পদোন্নতি ও ভালো পোস্টিং থেকে বঞ্চিত ছিলেন, তাদের অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি।
​বিগত সরকারের আমলে পদায়ন ও পদোন্নতি বঞ্চিত থাকা একাধিক বিএনপি-পন্থী প্রকৌশলীর সাথে কথা বলে জানা যায়, দেশের প্রতিটি সেক্টরে পদায়ন ও পদোন্নতির একটি নির্দিষ্ট নীতিমালা থাকলেও শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে তা পুরোপুরি উপেক্ষিত হচ্ছে। তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে যখন সৎ প্রকৌশলীদের পদোন্নতি দেওয়া হয়েছিল, তখনো সুকৌশলে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের নেতারা সেই তালিকায় ঢুকে পড়েছিল। অথচ বর্তমানে যারা সত্যিকার অর্থে বঞ্চিত এবং আওয়ামী আমলে ‘ডিমোশন’ বা কম গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় শাস্তিমূলক বদলি হয়ে পড়েছিলেন, তাদের এখনো মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। প্রকৌশলীদের মধ্যে জোরালো ধারণা জন্মেছে যে, এই অশুভ পদায়ন প্রক্রিয়ার পেছনে রয়েছে বিশাল অঙ্কের ঘুষ ও দুর্নীতির লেনদেন। এই অনিয়মের কারণে অধিদপ্তরের প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। ভুক্তভোগী প্রকৌশলীরা অবিলম্বে ঢাকা বিভাগসহ গুরুত্বপূর্ণ সকল সার্কেল থেকে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সদস্যদের প্রত্যাহার করে সেখানে গত দেড় দশকে অবহেলিত ও যোগ্য প্রকৌশলীদের পদায়নের দাবি জানিয়েছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অধিদপ্তরে শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং এই ‘আওয়ামী সিন্ডিকেট’ ভাঙতে বঞ্চিত প্রকৌশলীরা সরাসরি শিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তারা মনে করেন, মন্ত্রীর কঠোর তদারকি ছাড়া শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরকে এই অদৃশ্য শক্তির হাত থেকে মুক্ত করা সম্ভব নয়।

এ বিষয়ে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীকে কয়েকদফা ফোন করলেও ফোনটি রিসিভ না হওয়াতে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

 

সংবাদটি শেয়ার করে অন্য জানার সুযোগ দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *