এমন জানাজা আগে দেখেনি কেউ, ৭ দিন পর মা জানলেন চার ছেলে নেই

নিজস্ব প্রতিবেদক :

এক সপ্তাহ আগে বিদেশে থাকা চার ছেলের একসঙ্গে মৃত্যু হয়েছে। তবে সেই খবর জানতেন না মা খাদিজা বেগম। ছেলেদের কফিনবন্দি মরদেহ বাড়িতে আনার পর জানানো হয়। বুধবার (২০ মে) সকালে কক্ষ থেকে বেরিয়ে এসে ছেলেদের কফিন দেখে কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। আহাজারি করতে করতে বারবার জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ছিলেন। সকাল থেকে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন তিনি।

বুধবার সকালে এই দৃশ্য দেখা যায় চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার লালানগর বন্ধরাজপাড়ায়। গত ১৩ মে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ওমানে গাড়ির ভেতর থেকে উদ্ধার হয় এই পাড়ারই বাসিন্দা চার ভাইয়ের মরদেহ। আজ সকাল ৭টায় চার জনের মরদেহ বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। খবর পেয়ে উপজেলার নানা প্রান্ত থেকে হাজারো নারী, পুরুষ ও শিশু জড়ো হন বাড়ির সামনে। কেবল রাঙ্গুনিয়া নয় উত্তর চট্টগ্রামের রাউজান, ফটিকছড়ি, বোয়ালখালী, হাটহাজারী ও সীতাকুণ্ডসহ বিভিন্ন উপজেলা থেকে মানুষ আসে বাড়িটিতে। মানুষের কান্না আর স্বজনের বিলাপে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ।
স্থানীয় বাসিন্দা ও চিকিৎসক কাজী মনসুর আহমেদ উপস্থিত সাংবাদিকদের জানান, খাদিজা বেগমের কাছে গত এক সপ্তাহ ধরে যে সত্যটি আড়াল করে রাখা হয়েছিল, তা আজকে আর চাপা থাকেনি। এখন তিনি শয্যাশায়ী। সকালে খবর শোনার পর থেকে তিনি কাঁদছেন আর বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন।
সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রাঙ্গুনিয়ার লালানগর উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে চার ভাইয়ের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় জানাজার জন্য। সেই শেষ যাত্রায় শামিল হয় কয়েক হাজার মানুষ। জানাজায় অংশ নিতে আসা মানুষের ভিড়ে বিদ্যালয়ের মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। বেলা ১১টায় হওয়া জানাজা পড়ান খাদিজা বেগমের একমাত্র জীবিত সন্তান মোহাম্মদ এনাম। চার ভাইকে হারিয়ে বিপর্যস্ত এনাম জানাজা শেষে মোনাজাতে কান্নায় ভেঙে পড়েন।

রাঙ্গুনিয়ার মরিয়ম নগর থেকে জানাজায় অংশ নিতে আসা শফিকুল ইসলাম বলেন, ‌‘এরকম ঘটনা রাঙ্গুনিয়ার মানুষ আর দেখেনি। চার ভাইয়ের মৃত্যুতে পুরো রাঙ্গুনিয়ার মানুষ শোকাহত। যারা নিহত হয়েছেন তাদের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করছি। পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাতে ও জানাজায় অংশ নিতে হাজার হাজার মানুষ সমবেত হয়েছে।’

মঙ্গলবার (১৯ মে) রাত ৮টা ১৫ মিনিটে বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে মরদেহগুলো ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছায়। বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষে বিশেষ ফ্রিজারে করে মরদেহগুলো রাঙ্গুনিয়ার লালানগর ইউনিয়নের গ্রামের বাড়িতে বুধবার ভোরে নিয়ে আসা হয়।

মারা যাওয়া চার ভাই হলেন- শাহিদুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম, শহিদুল ইসলাম ও রাশেদুল ইসলাম। তাদের বাবার নাম মৃত জামাল উদ্দিন। রাশেদুল ও শাহিদুল বিবাহিত ছিলেন। সিরাজুল ও শহিদুল ছিলেন অবিবাহিত। তাদের দেখতে লালানগর গ্রামসহ আশপাশের এলাকার হাজারো মানুষ উপস্থিত হন। একসঙ্গে চার ভাইয়ের মৃত্যু কোনোভাবেই মানতে পারছেন না এলাকাবাসী ও স্বজনরা। আহাজারি করছেন স্বজনরা।

সকালে রাঙ্গুনিয়ার বাড়িটিতে গিয়ে চারপাশে কয়েক শ মানুষের ভিড় দেখা যায়। কেউ কান্না করছেন। কেউ আবার মারা যাওয়া চার জনের স্মৃতিচারণায় ব্যস্ত। ঘরের ভেতরে গিয়ে আহাজারি করতে দেখা যায় মারা যাওয়া চার জনের মা খাদিজা বেগমকে। সেখানে আহাজারি করছিলেন নিহত রাশেদুলের স্ত্রী কুলসুমা আক্তার ও শাহিদুলের স্ত্রী শান্তা আকতারও। তারা দুজনও আহাজারি করতে করতে বারবার জ্ঞান হারাচ্ছিলেন।

সাফিয়া বেগম নামের এলাকার এক নারী বলেন, ‘ঘরে কারও কথা বলার মতো অবস্থাই নেই। একসঙ্গে চার ভাইয়ের মৃত্যুর ঘটনা ঘটলো। তাদের মাকে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো ভাষাও কেউ খুঁজে পাচ্ছে না।’

স্থানীয় বাসিন্দা ইয়াকুব আলী বলেন, ‘একসঙ্গে চার ভাইয়ের মৃত্যু, আবার চারজনের একসঙ্গে জানাজার ঘটনা এই গ্রামের মানুষ আগে দেখেনি। এটি কতটা মর্মান্তিক তা আসলে ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।

সংবাদটি শেয়ার করে অন্য জানার সুযোগ দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *