নিজস্ব প্রতিবেদক:
খেলাপি ঋণে ধুঁকতে থাকা ব্যাংকগুলোর গ্রাহকরা সুদসহ পুরো টাকা ফেরত পাবেন বলে সংসদে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ব্যাংক দেউলিয়া হলে আমানতকারীরা সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা করে ফেরত পাবেন বলে ‘হেয়ার কাট’ নামে যে বিধান হয়েছে, তা কার্যকর হবে না জানিয়ে মন্ত্রী বলেছেন, সুদসহ পুরো টাকা ফেরত পাবেন আমানতকারীরা। তবে ধৈর্য ধরতে হবে।
আজ বুধবার জাতীয় সংসদের বৈঠকে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে সংরক্ষিত আসনের বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্য (এমপি) রেহেনা আক্তার রানুর নোটিশে এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। রানু প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘সারাজীবনের কষ্টার্জিত আয় বিশ্বাস করে ব্যাংকে রেখেছিল। ব্যাংক থেকে টাকা লুট হলে মানুষ কোথায় যাবে? একজন মানুষের টাকা ব্যাংকে আছে, টাকা তুলতে পারছে না বলে চিকিৎসা করতে পারছে না। টাকার অভাবে অনেকে মৃত্যুবরণ করছে। লুটেরা মালিকপক্ষ বিদেশে পালিয়ে আরামে জীবন যাপন করছে। লুটেরা এবং ব্যাংকখেকো মালিকদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করে তাদের সমস্ত সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করে গ্রাহকদের টাকা গ্রাহকদের হাতে ফিরিয়ে দিতে অর্থমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
আমির খসরু বলেন, একটি হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে বাংলাদেশে। আর্থিক খাতকে স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করে রেজ্যুলেশন আইনে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়েছে। আমানত সুরক্ষা আইন ২০২৬-এর মাধ্যমে সুরক্ষিত আমানতের পরিমাণ সর্বোচ্চ এক লাখ থেকে দুই লাখে উন্নীত করা হয়েছে। অবসায়নধীন ব্যাংকগুলোর আমানতকারীরা আমানতের অর্থ পর্যায়ক্রমে ফেরত পাচ্ছেন। আগে ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোর আমানতকারীদের আমানত সুরক্ষা আইনের আওতাভুক্ত ছিল না।
অর্থমন্ত্রী বলেন, পাঁচটি ব্যাংকের বিনিয়োগ অনিয়মে দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে বিশেষ ফরেনসিক অডিট চলমান রয়েছে। প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তীতে সম্পদ পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ব্যাংকের পাওনা আদায়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে দায়ী ব্যক্তির সম্পদ অথবা তহবিলের সব আয়, সম্পত্তি অধিকার এবং সম্পদের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এই আইনের প্রয়োগের মাধ্যমে দায়ী ব্যক্তিদের সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে বিক্রি ও নিলামের গ্রাহকের টাকা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে বলে আশা করি।
দেওয়ানি মামলাও করা হবে জানিয়ে অর্মথন্ত্রী বলেন, অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা খেলাপি ঋণের টাকা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ৩০টি ব্যাংক তাদের ঋণের টাকা উদ্ধারের জন্য ‘নন-ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট’ স্বাক্ষর করেছে। ৯টি আন্তর্জাতিক আইনি প্রতিষ্ঠানকে ‘নো উইন, নো ফি’ শর্তে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করেছে। অগ্রাধিকার প্রাপ্ত ১১ চুক্তির প্রথম পর্যায়ে ৬টি হল, সাইফুজ্জামান চৌধুরী, এস আলম, বেক্সিমকো, শিকদার, নাসা ও ওরিয়েন্ট গ্রুপ নিয়ে দেওয়ানি কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
ঋণ খেলাপিদের বিদেশ থেকে ধরে এনে থেরাপি দেওয়ার দাবি জানান রেহেনা আক্তার রানু। ঋণ খেলাপিদের সম্পদ নিলামে বিক্রি করে কীভাবে টাকা আদায় করা সম্ভব- প্রশ্ন তুলে তিনি প্রশ্নে বলেন, তারা তাদের সম্পদের ১০-১২ গুণ বেশি টাকা লুট করেছে। সম্পত্তি বিক্রি করে এই টাকা আদায় সম্ভব নয়। একদিকে মানুষ টাকা তোলার চিন্তায় আছে; আরেকদিকে এখানে যোগ হয়েছে হেয়ারকাট নামক এক ‘মরণ কাট’ সমস্যা। ব্যাংক ডাকাতদের ডাকাতির দায়ভার কেন আমানতকারীদের নিতে হবে? আমানতকারীদের কি অপরাধ? হেয়ারকাট নামক এই মরণকাটটি প্রত্যাহার করতে হবে। মরণকাট প্রত্যাহার করে ৭৫ লাখ গ্রাহককে স্বস্তি দেয়ার কোনো পরিকল্পনা আপনার মন্ত্রণালয়ের আছে কিনা?
জবাবে অর্থমন্ত্রী হেসে বলেন, ‘আমি ভীত-সন্ত্রস্ত বোধ করছি। আগেই বলেছি, এটা একটা হৃদয়বিদারক ঘটনা। আগেও বলেছি সংসদে—যারা আমানতকারী, তাদের আমানত সুদসহ ফেরত দেওয়া হবে, ইনশাআল্লাহ। তবে একটু ধৈর্য ধরতে হবে।’
অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যাংকগুলো সবগুলোই লোকসানের মধ্যে আছে এবং লোকসান কিন্তু প্রতিদিন বাড়ছে। লোকসানি একটা ব্যাংক যেখানে তার আমানতই ফিরিয়ে দিতে পারছে না এবং তাকে সুদ দেওয়া যে কত কঠিন, সেটা আপনারা বুঝতে হবে। আমানত এবং সুদ ফেরত দেওয়া হবে। কিন্তু এটার জন্য একটু সময়ের প্রয়োজন। এই ব্যাংকগুলো হেয়ারকাট থাকবে না। হেয়ারকাট তো বাদ যাবে।
আমির খসরু বলেন, জানি আমানতকারীদের অপেক্ষা করারও সময় নাই। মানুষ চিকিৎসার অভাবে মারা যাচ্ছে, মেয়ের বিয়ে দিতে পারছে না। প্রতিনিয়ত এই সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি। এটার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হবে। তবে নিশ্চিতভাবে এটা বলতে পারি, আমানতকারীরা তাদের টাকা ফেরত পাবে, সুদসহ ফেরত পাবে।