মাহফুজ আহমেদঃ
কখনও হারিয়ে যাওয়া নদীর গতিপথ অনুসরণ করছেন, কখনও শতবর্ষী মসজিদ-মন্দিরের ইতিহাস খুঁজছেন। আবার কখনও ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া জমিদার বাড়ির নীরব দেয়ালে লুকিয়ে থাকা অতীতের গল্প তুলে আনছেন মানুষের সামনে। ইতিহাস, ঐতিহ্য, সভ্যতা, সংস্কৃতি ও প্রকৃতির বিস্মৃত অধ্যায়গুলো ব্যতিক্রমী উপস্থাপনায় তুলে ধরে দেশজুড়ে পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছেন চুয়াডাঙ্গার সন্তান আরিফ হাসান।
চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার হিজলগাড়ী গ্রামের বাসিন্দা আরিফ হাসান পেশাগতভাবে একজন সংবাদকর্মী। তবে সংবাদ সংগ্রহের গণ্ডি পেরিয়ে তার আগ্রহ ছিল ইতিহাসের অজানা ও অলিখিত অধ্যায়গুলো অনুসন্ধান করা। স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকায় ইতিহাস-ঐতিহ্য বিষয়ক লেখালেখির মধ্য দিয়েই শুরু হয় তার এই পথচলা। পরবর্তীতে বৃহত্তর দর্শকের কাছে পৌঁছানোর মাধ্যম হিসেবে তিনি বেছে নেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে।
শখের বশে শুরু হওয়া সেই উদ্যোগ আজ রূপ নিয়েছে এক অনন্য অভিযাত্রায়। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা প্রাচীন স্থাপনা, হারিয়ে যাওয়া নদী, লোকজ সংস্কৃতি, পুরাকীর্তি ও ঐতিহাসিক স্মৃতিচিহ্ন খুঁজে বের করে সেগুলোর পেছনের গল্প তুলে ধরছেন তিনি। মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধান, তথ্যভিত্তিক গবেষণা এবং সাবলীল বর্ণনায় তার নির্মিত ভিডিও ও প্রতিবেদন দর্শকদের সামনে অতীতকে যেন জীবন্ত করে তোলে।
আরিফ হাসানের পরিচালিত ফেসবুকভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম ‘চুয়াডাঙ্গা পরিবার’-এ বর্তমানে প্রায় দেড় লাখ অনুসারী রয়েছে। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ তার ভিডিও, প্রতিবেদন ও অনুসন্ধানমূলক কনটেন্ট দেখছেন। শুধু বাংলাদেশ নয়, পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের ইতিহাসপ্রেমী, গবেষক ও সংস্কৃতিসচেতন মানুষের কাছেও পৌঁছে গেছে তার কাজ।
ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে কাজ করা অনেক গবেষক ও অনুরাগীর মতে, আরিফ হাসানের কনটেন্ট শুধুমাত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিনোদন নয়; বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল আর্কাইভ।
নিজের এই ব্যতিক্রমী যাত্রা সম্পর্কে আরিফ হাসান বলেন, “বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে অসংখ্য ইতিহাস, যেগুলোর অনেকটাই আজ বিস্মৃত। আমরা অনেক সময় বিদেশের ইতিহাস জানি, কিন্তু নিজের এলাকার ইতিহাস জানি না। আমি সেই হারিয়ে যাওয়া গল্পগুলো মানুষের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করছি।”
তিনি আরও বলেন, “একটি নদী শুধু নদী নয়, একটি সভ্যতার ইতিহাস। একটি পুরোনো মসজিদ বা মন্দির শুধু ধর্মীয় স্থাপনা নয়, এটি একটি জনপদের শত বছরের স্মৃতি বহন করে। আমি বিশ্বাস করি, ইতিহাসকে জানতে পারলেই মানুষ তার শেকড়কে চিনতে পারে। আর নিজের শেকড়কে জানা মানেই নিজের পরিচয়কে জানা।”
ইতিহাসের হারিয়ে যাওয়া পাতা উল্টে, বিস্মৃত জনপদের গল্প তুলে এনে এবং নতুন প্রজন্মকে শেকড়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার এই নিরলস প্রচেষ্টা আরিফ হাসানকে আজ শুধু একজন কনটেন্ট নির্মাতা নয়, বরং ইতিহাস-ঐতিহ্যের এক নিবেদিত অনুসন্ধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তার এই উদ্যোগ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের অজানা ইতিহাস সংরক্ষণের এক মূল্যবান দলিল।