চুয়াডাঙ্গার গোয়েন্দা পুলিশের সেই গৌরব কোথায় হারিয়ে গেল?

নিজস্ব প্রতিবেদকঃচুয়াডাঙ্গা জেলা বাসীর কাছে এই ছবিগুলো কেবল কিছু অভিযানের স্মারক নয়; এগুলো ছিল একসময়কার আস্থা, সাহস এবং সফলতার প্রতীক। খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, যখন জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ধারাবাহিক সফল অভিযানের খবর গণমাধ্যমের শিরোনাম হতো। অপহরণকারী চক্র গ্রেপ্তার, অস্ত্র ও মাদক উদ্ধার, চাঞ্চল্যকর মামলার রহস্য উদঘাটন কিংবা অপহৃত ব্যক্তিকে জীবিত ফিরিয়ে আনার মতো অসংখ্য ঘটনায় জেলাবাসী গর্ব অনুভব করত।

সেই সময় সাধারণ মানুষের বিশ্বাস ছিল—কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ মাঠে নামবে, তদন্ত করবে এবং সত্য উদঘাটন করবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি মানুষের আস্থা তৈরিতে এই সাফল্যগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। পুলিশের ভাবমূর্তি যেমন উজ্জ্বল হয়েছিল, তেমনি নাগরিকদের মধ্যেও আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস বেড়েছিল।
কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই দৃশ্যপট যেন বদলে গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সারাদিন ধরে যে আলোচনা ও সমালোচনা দেখা যাচ্ছে, তা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। প্রশ্ন উঠছে—সেই চৌকস, দক্ষ ও সক্রিয় গোয়েন্দা ইউনিট আজ কোথায়?
একজন ব্যক্তি ৯ দিন ধরে নিখোঁজ। অভিযোগ রয়েছে, অপহরণকারীরা পরিবারের কাছে একাধিকবার মুক্তিপণও দাবি করেছে। পরিবারের পক্ষ থেকে বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবহিত করা হয়েছে বলেও জানা গেছে। অথচ এত দীর্ঘ সময় পার হওয়ার পরও যদি ভুক্তভোগীকে জীবিত উদ্ধার করা না যায়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই জনমনে প্রশ্ন জাগে—তদন্তের অগ্রগতি কোথায় ছিল? গোয়েন্দা তৎপরতা কতটুকু ছিল? প্রযুক্তি, সোর্স নেটওয়ার্ক ও তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে কি যথাসময়ে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল?
এখানে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, একটি ঘটনার ব্যর্থতা শুধু একটি পরিবারের ট্র্যাজেডি নয়; এটি পুরো জেলার মানুষের নিরাপত্তাবোধের সঙ্গে সম্পর্কিত। যখন মানুষ দেখে একটি অপহরণের ঘটনায় দিনের পর দিন কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই, তখন তাদের মনে স্বাভাবিকভাবেই শঙ্কা তৈরি হয়। তারা ভাবতে শুরু করে—আজ যদি অন্য কারও সঙ্গে এমন ঘটনা ঘটে, তাহলে তার পরিণতিও কি একই হবে?
প্রশ্ন উঠতেই পারে, যে ডিবি ইউনিট একসময় অপহরণকারীদের দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করে প্রশংসা কুড়িয়েছিল, সেই ইউনিটের সদস্যরা এখন কোথায়? তারা কি বদলি হয়ে গেছেন? নাকি প্রশাসনিক বা অন্য কোনো কারণে তাদের কার্যক্রম আগের মতো কার্যকর নেই? যদি দক্ষ জনবল অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে সেই শূন্যতা পূরণে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে? আর যদি কাঠামোগত কোনো দুর্বলতা তৈরি হয়ে থাকে, তবে তা দূর করার উদ্যোগ কোথায়?
জনগণের আস্থা অর্জন করতে বছরের পর বছর সময় লাগে, কিন্তু সেই আস্থা হারাতে একটি ব্যর্থ ঘটনাই যথেষ্ট। তাই এই ঘটনার নিরপেক্ষ মূল্যায়ন জরুরি। কী কারণে একজন নিখোঁজ ব্যক্তিকে সময়মতো উদ্ধার করা গেল না, কোথায় ঘাটতি ছিল, কার দায়িত্বে অবহেলা হয়েছে—এসব প্রশ্নের স্বচ্ছ উত্তর জনগণ পাওয়ার অধিকার রাখে।
চুয়াডাঙ্গার মানুষ কোনো অলৌকিক কিছু চায় না। তারা শুধু সেই পুরোনো কর্মদক্ষতা, জবাবদিহিতা এবং আন্তরিকতা ফিরে দেখতে চায়, যা একসময় জেলা গোয়েন্দা পুলিশকে মানুষের আস্থার প্রতীকে পরিণত করেছিল।
কারণ অপরাধীদের ভয় নয়, আইনের প্রতি মানুষের বিশ্বাসই একটি জেলার সবচেয়ে বড় শক্তি। আর সেই বিশ্বাস রক্ষা করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেই নিতে হবে।

সংবাদটি শেয়ার করে অন্য জানার সুযোগ দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *