বরিশাল গণপূর্তের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মানিক লাল দাসের কোটি কোটি টাকার টেন্ডার বাণিজ্য

নিজস্ব প্রতিবেদক:

ঘুষ, দুর্নীতি, জালিয়াতি, টেন্ডার ও বদলি বাণিজ্যসহ শত শত সুনির্দিষ্ট অভিযোগের পাহাড় জমেছে বরিশাল গণপূর্ত সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মানিক লাল দাসের বিরুদ্ধে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে-পটপরিবর্তনের পরও তিনি কীভাবে বহাল তবিয়তে রাজত্ব করে যাচ্ছেন? কেনই বা তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের পাত্তাই দিচ্ছেন না? প্রকৌশলীদের মনে এখন একটাই প্রশ্ন-কে এই মানিক লাল দাস এবং কী তার ক্ষমতার রহস্য?

মানিক লাল দাসের আদি বাড়ি পটুয়াখালী জেলার বাউফল উপজেলার ২ নম্বর ওয়ার্ডের ঘুরচাকাঠি গ্রামে। তিনি ওই এলাকার মনোরঞ্জন দাসের ছেলে। বিসিএস (পাবলিক ওয়ার্কস) ১৮তম ব্যাচের কর্মকর্তা হিসেবে সহকারী প্রকৌশলী পদে গণপূর্ত অধিদপ্তরে যোগদান করেন তিনি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, তার বিগত সরকারের আমলের একচ্ছত্র ক্ষমতার মূল উৎস ছিল তার শ্বশুরবাড়ি। তিনি গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার ১২ নম্বর ওয়ার্ডের পাচুড়িয়া গ্রামে বিয়ে করেন। শ্বশুরবাড়ি গোপালগঞ্জ হওয়া এবং নিজে ছাত্রলীগের সাবেক নেতা হওয়ায় বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি হয়ে ওঠেন ‘ডন’ সাবেক প্রভাবশালী এমপি আবুল হাসনাত

আবদুল্লাহর নাম ভাঙিয়ে গোটা দক্ষিণাঞ্চল দাপিয়ে বেড়ান তিনি।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পরও তার ক্ষমতা বিন্দু পরিমাণ কমেনি, বরং কোনো এক অদৃশ্য শক্তিতে তা আরও বেড়েছে।

মানিক লাল দাস তার নিয়ন্ত্রণাধীন বিভাগগুলোতে একটি শক্তিশালী ঠিকাদারি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন, যা তার সব অপকর্ম ম্যানেজ করে নেয়। এই সিন্ডিকেটের মূল ৪টি প্রতিষ্ঠান হলো:

খান বিল্ডার্স (মালিক: নাসির খান, ঝালকাঠি)

রাতুল এন্টারপ্রাইজ (মালিক: হাসান মিয়া, সহ-সভাপতি, ভোলা সদর আওয়ামী লীগ)

খান ট্রেডার্স (মালিক: মিজান খান, কাশিপুর, বরিশাল)

ইনভেন্ট পয়েন্ট কম্পিউটার

বর্তমান পরিস্থিতিতেও এই সিন্ডিকেটের তৎপর থামেনি। মানিক লাল দাস তার অধীনস্থ মাঠ

পর্যায়ের নির্বাহী প্রকৌশলীদের (এক্সেন) ওপর কড়া নির্দেশনা জারি করেছেন, যেন আগামী ডিসেম্বরের আগেই এই ৪টি ফার্মের নামে ন্যূনতম ৮টি করে কাজ বরাদ্দ দেওয়া হয়। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে উপার্জিত অর্থের একটি বড় অংশ নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের মিছিলে লোক জোগানোর কাজে ব্যয় করা হচ্ছে এবং ফ্যাসিস্টদের এখনও কাজ দেওয়ার জন্য তিনি চাপ দিচ্ছেন বলে জানা গেছে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রধান প্রকৌশলীর স্পষ্ট প্রজ্ঞাপন ও নির্দেশনা অমান্য করে তিনি এলটিএম (LTM) বা সীমিত পদ্ধতির পরিবর্তে পিরোজপুর, পটুয়াখালী, বরিশাল ও ভোলা গণপূর্ত বিভাগের প্রায় ৮০ শতাংশ দরপত্র ওটিএম (OTM) বা উন্মুক্ত পদ্ধতিতে আহ্বান করার অনুমতি দেন।

এই অবৈধ আয়ের একটি বড় অংশ বিতর্কিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে হাসনাত আবদুল্লাহর নির্বাচনী তহবিলে এবং বিগত সিটি নির্বাচনে সাদিক আবদুল্লাহর মেয়র নির্বাচনের কাজে ব্যয় করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হলো-ভোলা, বরিশাল ও পটুয়াখালীতে স্বৈরাচার বিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমাতেও তিনি ফ্যাসিস্টদের পেছনে বিপুল অর্থ জোগান দিয়েছিলেন।

২০২২ সালে যশোর গণপূর্ত সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী থাকাকালীনও মানিক লাল দাসের বিরুদ্ধে অনিয়মের পাহাড় গড়ে তোলার প্রমাণ মেলে। সে সময় নিয়ম অনুযায়ী মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজ সীমিত পদ্ধতিতে আহ্বান করার কথা থাকলেও, পছন্দের ঠিকাদারদের সুবিধা দিতে তিনি কুষ্টিয়া গণপূর্ত বিভাগকে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বানের নির্দেশ দেন।

প্রধান প্রকৌশলীর পরিদর্শনের চোখ ফাঁকি দিতে এই দরপত্রগুলোর বিজ্ঞপ্তি গণপূর্ত অধিদপ্তরের মূল ওয়েবসাইটে প্রকাশ না করে গোপন রাখা হয়েছিল। এই সিন্ডিকেটের আওতাধীন উল্লেখযোগ্য আইডিসমূহ হলো:

কুষ্টিয়া জেলা কুমারখালী কৃষি আবহাওয়া অফিসের কাজ (আইডি: ৬৭৯২১১, স্মারক নং: ১৫৯৮)

কুষ্টিয়া গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয় ও পরিদর্শন বাংলোর কাজ (আইডি: ৬৭৯০১১, স্মারক নং: ১৫ Rot)

কুষ্টিয়া ম্যাটস্ (MATS)-এর বাউন্ডারি ওয়াল ও

গেট মেরামত (আইডি: ৬৭৬৪৫৩, স্মারক নং: ১৪৯৫)

কুষ্টিয়া ম্যাটস্-এর গ্রাউন্ড ফ্লোর সিভিল ও বৈদ্যুতিক কাজ (আইডি: ৬৭৫৯৭, স্মারক নং: ১৪৯৭)

কুষ্টিয়া ম্যাটস্-এর ছাত্রী হোস্টেল মেরামত কাজ (আইডি: ৬৭৬৩৬৬, স্মারক নং: ১৪৯৩)

কুষ্টিয়া ম্যাটস্-এর প্রশাসনিক ভবনের গ্যালারি মেরামত (আইডি: ৬৭৬৪১৫, স্মারক নং: ১৪৯৬)

এছাড়াও প্রকল্পের সময় বর্ধন ও ভ্যারিয়েশনের চূড়ান্ত অনুমোদন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী বা প্রধান প্রকৌশলীর দেওয়ার কথা থাকলেও, তিনি ঝিনাইদহ পাসপোর্ট অফিস, কুষ্টিয়া কাঙাল হরিনাথ স্মৃতি মিউজিয়াম, মাগুরা চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবন এবং শিলাইদহ রবীন্দ্র কুঠি বাড়ি সম্প্রসারিত উন্নয়ন প্রকল্পসহ যশোর সার্কেলের সকল ডিভিশনের বিভিন্ন কাজের সময় বর্ধন ও প্রাক্কলন নিজেই বেআইনিভাবে অনুমোদন করে দেন।

কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ নির্মাণ প্রকল্প চলাকালীন মানিক লাল দাসের বিরুদ্ধে দায়িত্ব চরম অবহেলার অভিযোগ উঠেছিল। দীর্ঘদিন এই প্রকল্পের কাজের সাথে যুক্ত থাকলেও তিনি সাইট পরিদর্শনে যেতেন না বললেই চলে। সারাদিন অফিসে বসে ঠিকাদারদের কমিশনের টাকার জন্য অপেক্ষা করাই ছিল তার মূল কাজ।

২০১৯ সালের ১৭ জানুয়ারি এই প্রকল্পের নির্মাণাধীন hospital ভবনের গাড়ি বারান্দার ছাদ ধসে পড়ে, যা দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। ঘটনার পর গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী, এসডি, এসওসহ চার কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার এবং দুজনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলেও রহস্যজনকভাবে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যান মানিক লাল দাস। এমনকি ছাদ ধসের পর প্রকল্পের কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও, বিতর্কিত ঠিকাদার জহুরুল ইসলামের কাজের মেয়াদ তিনি ২০২২ সাল পর্যন্ত বৃদ্ধি করে দিয়েছিলেন।

মানিক লাল দাসের এই বেপরোয়া আচরণের মূল সূত্রপাত আরও আগে। ২০১৪ সালের নির্বাচনকালীন সরকারে তোফায়েল আহমেদ মাত্র

৩ মাসের জন্য গণপূর্ত মন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পর, ভোলার তৎকালীন বিতর্কিত চেয়ারম্যান ও ‘চালচোর’ খ্যাত হাসান মিয়া এবং তার ভাই হোসেন মিয়ার রাজনৈতিক প্রভাবে মানিক লাল ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-১ এর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন পান। তবে সেখানে অদক্ষতার কারণে ডিভিশন চালাতে ব্যর্থ হলে তাকে দীর্ঘদিন ফরিদপুরে বদলি রাখা হয়। পরবর্তীতে পদোন্নতি পেয়ে তিনি যশোর গণপূর্ত সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হন এবং সেখানেও ঝিনাইদহ, মেহেরপুর, যশোর, কুষ্টিয়া, নড়াইল ও মাগুরার প্রায় ৮০% দরপত্র ওটিএম পদ্ধতিতে দিয়ে কোটি কোটি টাকা লোপাট করেন।

বিদেশে অর্থ পাচার ও বেনামী সম্পদ:

ঘুষ, দুর্নীতি ও টেন্ডার বাণিজ্যের মাধ্যমে মানিক লাল দাস গোপালগঞ্জ, পটুয়াখালী সদর, বাউফল এবং রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় বিপুল পরিমাণ স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ গড়ে তুলেছেন। আইনের চোখ ফাঁকি দিতে তিনি অধিকাংশ সম্পদ তার স্ত্রী শিপ্রা দাস, সন্তান এবং নিকটাত্মীয়দের নামে-বেনামে ক্রয় করেছেন। এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, সনাতন ধর্মের ব্যক্তি হওয়ার সুযোগ নিয়ে তিনি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে বিলাসবহুল বাড়ি ও গাড়ি

ও বিপুল পরিমাণ জমি ক্রয় করেছেন এবং দেশ থেকে প্রচুর নগদ অর্থ পাচার করেছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান:

“ গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদগুলো আমরা অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে পর্যবেক্ষণ করছি। গণমাধ্যমের এই সুনির্দিষ্ট তথ্যের সূত্র ধরে প্রকৌশলী মানিক লাল দাসের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো খুব শীঘ্রই খতিয়ে দেখা হবে।”

এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে জানতে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মানিক লাল দাসের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে, তিনি সাংবাদিক পরিচয় শুনেই তাৎক্ষণিকভাবে ফোন কেটে দেন। পরবর্তীতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি আর রিসিভ করেননি। এমনকি বিষদ তথ্য উল্লেখ করে খুদে বার্তা (SMS) পাঠানো হলেও তার কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।

প্রকৌশলী মানিক লাল দাস আগামী বছর অবসরে যাচ্ছেন। গণপূর্ত অধিদপ্তরের সৎ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মনে এখন একটাই প্রশ্ন-অবসরের আগেই কি তার এই দুর্নীতির সাম্রাজ্যের বিচার হবে, নাকি শত অপরাধের গল্প আড়ালেই থেকে যাবে?

তারা অবিলম্বে একটি নিরপেক্ষ উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের জোর দাবি জানিয়েছেন।

সংবাদটি শেয়ার করে অন্য জানার সুযোগ দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *