লুটপাটের নতুন কারিগর বান্দরবানে ডেপুটি রেঞ্জার রাশেদুজ্জামানকে ঘিরে সংরক্ষিত বন উজাড়ের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক :

পার্বত্য জেলা বান্দরবানের সবুজ পাহাড় ও সংরক্ষিত বনাঞ্চল আজ এক শ্রেণির চরম দুর্নীতিবাজ বন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত মুনাফা লাভের উর্বর ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে, যার সর্বশেষ ও জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন ডেপুটি রেঞ্জার মো. রাশেদুজ্জামান। বান্দরবান বন বিভাগের প্রাক্তন ডিএফও মোহাম্মদ আবদুর রহমানের দুর্নীতির বিশ্বস্ত সহযোগী হিসেবে পরিচিত এই কর্মকর্তা শুরুতে সদর রেঞ্জের লোভনীয় চেয়ার বাগিয়ে নিতে ডেপুটি রেঞ্জার কাজী মো. সাইফুল ইসলামের সাথে দফায় দফায় দেনদরবার চালান। কিন্তু সেই দেনদরবারে ব্যর্থ ও প্রত্যাশিত ‘প্রাইজ পোস্টিং’ না পেয়ে দিশেহারা হয়ে পড়া রাশেদুজ্জামান পরবর্তীতে রোয়াংছড়ি উপজেলার দুর্গম খেয়াচল্যং রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। লোকচক্ষুর আড়ালে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে এবং দায়িত্বে অবহেলার অজুহাত হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন যাবৎ শারীরিক অসুস্থতা ও মানসিকভাবে হতাশাগ্রস্ত থাকার সাফাই গাইলেও নেপথ্যে চালিয়ে যাচ্ছেন সংরক্ষিত বনাঞ্চল লুণ্ঠনের নিখুঁত নীলনকশা।

সরেজমিনে রোয়াংছড়ির খেয়াচল্যং রেঞ্জ কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায় এক ভুতুড়ে ও দায়িত্বহীন পরিবেশ; কার্যালয়ের প্রধান ফটকসহ প্রতিটি কক্ষ তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে রয়েছে এবং সেখানে রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. রাশেদুজ্জামান কিংবা অন্য কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিন্দুমাত্র উপস্থিতি নেই। আশপাশের স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এই কর্মকর্তা বা তাঁর অধীনস্থ কোনো স্টাফ কখনোই রেঞ্জ এলাকায় অবস্থান করেন না, এমনকি রেঞ্জের ভৌগোলিক সীমানার আশপাশে কোনো বাসা ভাড়াও নেননি।

সরকারি দায়িত্ব ও জবাবদিহিতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে রেঞ্জ কর্মকর্তা ও তাঁর পুরো স্টাফ বাহিনী সার্বক্ষণিক বান্দরবান জেলা শহরে বিলাসবহুল জীবনযাপন করছেন। যে কার্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা তাঁদের মূল কর্মস্থলেই উপস্থিত থাকেন না, সেই খেয়াচল্যং রেঞ্জ কার্যত বিলুপ্ত ঘোষণা করাই যুক্তিযুক্ত বলে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।

এদিকে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে রাশেদুজ্জামানের টেবিল জোত পারমিট বাণিজ্যের রোমহর্ষক ও চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। খেয়াচল্যং রেঞ্জের অধীনস্থ ৩১৭ নং ক্যাচলং মৌজা ও ৩৪৯ নং ঘেরাউ মৌজায় যেখানে ব্যক্তিমালিকানাধীন জোতের হোল্ডিং সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত এবং পূর্বেও একাধিকবার এসব মৌজায় জোত পারমিটের কাজ শেষ হয়েছে, সেখানে রাশেদুজ্জামান দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ৬ মাসের ব্যবধানে একাই ২০টি জোত পারমিট অনুমোদন করেছেন।

সরেজমিনে দুর্গম পাহাড়ি এলাকার খাড়া গাছ যাচাই ও পরিমাপ না করেই তিনি স্থানীয় এসিল্যান্ড অফিস ও জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের কিছু অসাধু ব্যক্তির সাথে যোগসাজশে মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে ভুয়া ‘এ-ফরম’ তৈরি করেন। এই প্রক্রিয়ায় একই মৌজা ও একই হোল্ডিং বারবার ব্যবহার করে সম্পূর্ণ কৃত্রিম হোল্ডিং সাজানো হয় এবং জেলা শহরে বসেই রাতের আঁধারে বনের মূল্যবান কাঠের জন্য অবৈধ খাড়া মার্কা ও পাশ মার্কা বসিয়ে লাখ লাখ টাকার অবৈধ মাসোহারা পকেটে পোরা হয়।

এই নির্বিচার ও বেপরোয়া বৃক্ষনিধনের সরাসরি বিরূপ প্রভাব পড়ছে পার্বত্য চট্টগ্রামের বন, বন্যপ্রাণী ও সার্বিক পরিবেশব্যবস্থার ওপর।

ভুয়া জোতের আড়ালে চম্পাফুল, গুটগুটিয়া, বৈলাম, গর্জন ও শিউরীর মতো শতবর্ষী মাদার ট্রি নিধন করার ফলে বনাঞ্চলের ক্যানোপি ধ্বংস হচ্ছে এবং এশীয় হাতি, মায়াহরিণ ও বিরল প্রজাতির উল্লুকের মতো বিপন্ন বন্যপ্রাণীর প্রাকৃতিক আবাসস্থল স্থায়ীভাবে বিলীন হয়ে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর মধ্যে চরম সংঘাত তৈরি হচ্ছে। এ ছাড়া নির্বিচারে পাহাড় ন্যাড়া করার কারণে বর্ষা মৌসুমে মারাত্মক পাহাড়ি ঢল, ভূমিধস এবং শুষ্ক মৌসুমে প্রাকৃতিক ঝিরি ও পাহাড়ি ছড়াগুলো শুকিয়ে গিয়ে পার্বত্য অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানির তীব্র সংকট দেখা দিচ্ছে।

রোয়াংছড়ির খেয়াচল্যং অঞ্চলের বিভিন্ন পরিবেশবাদী ও ছাত্র সংগঠনের জোরালো অভিযোগ, ডেপুটি রেঞ্জার মো. রাশেদুজ্জামান সরকারি বৈধ কাগজপত্রের আড়ালে এলাকার সহজ-সরল ও দরিদ্র আদিবাসীদের নাম ব্যবহার করে কৃত্রিম কাগজপত্র সাজিয়ে তাঁদের অধিকার হরণ করছেন এবং বাঙালি কাঠ ব্যবসায়ীদের সাথে সিন্ডিকেট গড়ে তুলে সংরক্ষিত বনাঞ্চল সাফ করে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের মালিক বনে গেছেন। বন, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষায় এই বিতর্কিত কর্মকর্তার ৬ মাসে ইস্যুকৃত সকল জোত পারমিটের নথি দুর্নীতি দমন কমিশনসহ পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের মাধ্যমে অবিলম্বে তদন্ত করে তাঁকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় পাহাড়ি জনগোষ্ঠী ও পরিবেশবাদী মহল।

সংবাদটি শেয়ার করে অন্য জানার সুযোগ দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *