১১টি নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস চক্র যেভাবে পরিচালনা করতেন খাদ্য নিয়ন্ত্রক হারুন অর রশিদ

নিজস্ব প্রতিবেদক:

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং উত্তর সরবরাহের বিস্তৃত আন্তমন্ত্রণালয় চক্রের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকার গুরুতর অভিযোগে সিরাজগঞ্জ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক হারুন অর রশিদ কর্মস্থল ছেড়ে আত্মগোপন করেছেন। অভিযোগ ওঠার পর এই বিসিএস কর্মকর্তা গা-ঢাকা দেওয়ায় জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে প্রশাসনিক স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি নির্ধারিত নিয়োগ পরীক্ষা বাতিলের ঘটনা তদন্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) ও সিআইডির অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে যে, সরকারি দায়িত্বের আড়ালে হারুন অর রশিদসহ একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে সরকারি দপ্তরের অন্তত ১১টি নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো গুরুতর অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

ঘটনার বিবরণ ও সরেজমিন তথ্যসূত্রে জানা যায়, গত ১০ অক্টোবর ২৪২টি শূন্য পদের বিপরীতে ৩ লাখ ১৮ হাজার ৯৭৬ জন পরীক্ষার্থীর অংশগ্রহণে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের এমসিকিউ বাছাই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পরীক্ষা শুরুর কয়েক মিনিট আগে প্রশ্নপত্র ফাঁসের সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে কর্তৃপক্ষ পরীক্ষা স্থগিত করে। এরপর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের দায়ের করা মামলার তদন্তে নেমে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) চক্রের সাত সদস্যকে গ্রেপ্তার করে। তাঁদের মোবাইল ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপের তথ্য বিশ্লেষণ করে তদন্তকারীরা চক্রটির সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য পান। তদন্তকারীরা জানান, কেবল যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর নয়; প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, সিজিডিএফ (ডিফেন্স ফাইন্যান্স), খাদ্য মন্ত্রণালয়, পরিবেশ অধিদপ্তর, নির্বাচন কমিশন, এনবিআর এবং মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের অন্তত ১১টি সরকারি নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ও উত্তরপত্র ফাঁসের সঙ্গে সিন্ডিকেটটি যুক্ত ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের স্বীকারোক্তির পর অভিযুক্ত সিরাজগঞ্জ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক হারুন অর রশিদ গত ১৫ অক্টোবর (বুধবার) শেষবারের মতো অফিসে এসে পরবর্তী সময়ে মোবাইল ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপ বন্ধ করে আত্মগোপনে চলে যান বলে জানা গেছে।

তদন্তকারী কর্মকর্তাদের বিশ্লেষণে প্রশ্নফাঁস চক্রটির বহুস্তরীয় কাঠামোর বিষয়টি উঠে এসেছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, পুরো সিন্ডিকেটের কেন্দ্রে রয়েছেন বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) পরিসংখ্যান কর্মকর্তা সুজিত গোপ। তাঁর সহযোগীদের মধ্যে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের নিম্নপদস্থ কর্মচারীরা যুক্ত থেকে মতিঝিল এলাকায় গোপন ‘বুথ’ তৈরি করে পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে কোটি টাকার চুক্তিতে প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করাতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। চক্রের অন্যতম পর্যায়ে কাজ করতেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের সহকারী পরিচালক সোহাগ ফকির এবং বিসিএসের ৩৬তম ব্যাচের কর্মকর্তা ও সিরাজগঞ্জ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক হারুন অর রশিদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই দুই শিক্ষার্থী নিজেদের মধ্যে সখ্য কাজে লাগিয়ে প্রশ্নফাঁস ও পরীক্ষার্থী সংগ্রহের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁরা প্রার্থীপ্রতি ১০ লাখ টাকার চুক্তিতে স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর, মূল শিক্ষাগত সনদ অথবা দুই থেকে তিন লাখ টাকার ফাঁকা ব্যাংক চেক জিম্মায় রেখে পুরো প্রক্রিয়াটি পরিচালনা করতেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

বাংলাদেশের প্রচলিত ফৌজদারি আইন ও সরকারি কর্মচারী আচরণবিধি অনুযায়ী, সরকারি পদে আসীন থেকে নিয়োগ পরীক্ষার মতো গোপনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, অসদাচরণ ও প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়া গুরুতর অপরাধ। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার স্বচ্ছতা নষ্ট করার এ ঘটনা জনমনে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। তদন্তকারী সংস্থা সিআইডি জানিয়েছে, অভিযুক্ত কর্মকর্তা হারুন অর রশিদ ও চক্রের মূল হোতা সুজিত গোপকে গ্রেপ্তারে প্রযুক্তিগত নজরদারি ও অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তরের নিয়োগে জালিয়াতির ঘটনায় একজন বিসিএস কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ ও তাঁর আত্মগোপনের বিষয়টি সরকারি প্রশাসনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সিআইডি ও এসআরবির তদন্ত দ্রুত শেষ করে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার এবং জিম্মায় রাখা প্রার্থীদের সনদ উদ্ধারের দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিকেরা। এ ধরনের অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া না হলে সরকারি চাকরির নিয়োগপ্রক্রিয়ায় সাধারণ মেধাবী প্রার্থীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে পড়বে।

সংবাদটি শেয়ার করে অন্য জানার সুযোগ দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *