নিজস্ব প্রতিবেদক:
ভারতে বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় সবচেয়ে বেশি অপরিণত শিশুর জন্ম হয়। এর পেছনে সম্ভবত একটি জিনগত বৈশিষ্ট্য ভূমিকা রাখে। ২০২০ সালে ভারতে আনুমানিক ৩০ লাখ ২০ হাজার শিশু নির্ধারিত সময়ের আগে জন্মগ্রহণ করে, যা বিশ্বজুড়ে মোট অপরিণত শিশুর জন্মের পাঁচ ভাগের এক ভাগেরও বেশি।
গর্ভাবস্থার ৩৭ সপ্তাহ পূর্ণ হওয়ার আগে শিশুর জন্ম হলে তাকে অপরিণত জন্ম (Preterm Birth) বলা হয়। পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ এটি। বিশেষ করে, গর্ভাবস্থার ৩৪ সপ্তাহ পূর্ণ হওয়ার আগেই জন্ম নেওয়া শিশুর দীর্ঘমেয়াদি জটিলতার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে। এসব জটিলতার মধ্যে মস্তিষ্কের বিকাশজনিত সমস্যাও রয়েছে।
PLOS Medicine জার্নালে প্রকাশিত একটি নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, একটি সাধারণ জিনগত ভিন্নতা সময়ের আগে শিশুর জন্মের ঝুঁকি ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস অ্যাট অস্টিনের বিজ্ঞানীদের নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণায় ইউনিভার্সিটি অব কানসাস ও ইউনিভার্সিটি অব কেনটাকির গবেষকেরাও যুক্ত ছিলেন। গবেষণাটি একই সঙ্গে একটি সম্ভাব্য স্বল্পমূল্যের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার দিকেও ইঙ্গিত দিয়েছে—ডকোসাহেক্সানোয়িক অ্যাসিড (DHA), যা এক ধরনের ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড।
গবেষণার জ্যেষ্ঠ লেখক অধ্যাপক কুমার কোথাপল্লি ও অধ্যাপক টম ব্রেনা বলেন, বিশ্বে অপরিণত শিশুর জন্মের সবচেয়ে বড় বোঝা ভারতের ওপর, এবং দেশটির জনগোষ্ঠীতে এমন একটি জিনগত ভিন্নতা থাকার প্রবণতা দেখা যায়, যা এই ঝুঁকি বাড়ায়। DHA নিরাপদ, সস্তা এবং সহজলভ্য। তাই পরবর্তী যৌক্তিক পদক্ষেপ হলো ভারতে এ বিষয়ে একটি গবেষণা পরিচালনা করা।
গবেষণায় কী পাওয়া গেছে?
গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে একটি সাধারণ জিনগত ভিন্নতা গর্ভাবস্থার ৩৪ সপ্তাহ পূর্ণ হওয়ার আগেই শিশুর জন্মের ঝুঁকিকে প্রভাবিত করতে পারে। এর কারণ হলো, নারীর জিনগত বৈশিষ্ট্য গর্ভাবস্থায় তার শরীরে DHA-এর চাহিদাকে প্রভাবিত করে।
যেসব নারী এই জিনগত ভিন্নতার বাহক, তাদের ক্ষেত্রে প্রতিদিন তুলনামূলক বেশি মাত্রায় DHA গ্রহণের সঙ্গে গর্ভাবস্থার ৩৪ সপ্তাহ পূর্ণ হওয়ার আগেই শিশুর জন্মের ঝুঁকি কমে যাওয়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
জিনগত ভিন্নতাটি কীভাবে গর্ভাবস্থাকে প্রভাবিত করে?
এই জিনগত ভিন্নতাটি ফ্যাটি অ্যাসিড ডেস্যাচুরেজ (FADS) জিনে পাওয়া যায়। এই জিনগুলো শরীরে অ্যারাকিডোনিক অ্যাসিড (ARA) নামের একটি ওমেগা-৬ ফ্যাটি অ্যাসিড তৈরির প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
ARA প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিন E2 তৈরিতে ভূমিকা রাখে। এটি হরমোনের মতো কাজ করা একটি পদার্থ, যা প্রসববেদনা শুরু হওয়ার প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়। এই জিনগত ভিন্নতার ইনসারশন (I) সংস্করণ বহনকারী নারীদের শরীরে সাধারণত বেশি ARA তৈরি হয়, যা প্রদাহজনিত প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত।
তৈলাক্ত মাছ ও মাছের তেলে DHA পাওয়া যায়। DHA, ARA-এর কিছু প্রভাব মোকাবিলায় সাহায্য করতে পারে। এ কারণে একটি সম্ভাব্য জৈবিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায় যে, I ভিন্নতার বাহক নারীদের ক্ষেত্রে বেশি পরিমাণে DHA গ্রহণ করলে গর্ভাবস্থার ৩৪ সপ্তাহ পূর্ণ হওয়ার আগেই শিশুর জন্মের ঝুঁকি কমতে পারে।
DHA সাপ্লিমেন্ট কি অপরিণত শিশুর জন্ম প্রতিরোধে সাহায্য করতে পারে?
গবেষকেরা প্রথমে ১০ হাজার ৪৮৭ জন নারীকে গবেষণায় অংশগ্রহণের যোগ্যতা যাচাইয়ের জন্য পরীক্ষা করেন। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের ৭৬১ জন গর্ভবতী নারীর জিনগত বৈশিষ্ট্য ও গর্ভাবস্থাসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়।
নারীদের দৈবভাবে দুটি দলে ভাগ করা হয়েছিল। এক দল প্রতিদিন ২০০ মিলিগ্রাম এবং অন্য দল প্রতিদিন ১,০০০ মিলিগ্রাম DHA গ্রহণ করেন।
যেসব নারী অন্তত একটি I জিনগত ভিন্নতার বাহক ছিলেন, তাদের মধ্যে গর্ভাবস্থার ৩৪ সপ্তাহ পূর্ণ হওয়ার আগেই শিশুর জন্মের হার ছিল:
- প্রতিদিন ২০০ মিলিগ্রাম DHA- ৪.৩%
- প্রতিদিন ১,০০০ মিলিগ্রাম DHA- ১.১%
ঝুঁকির আপেক্ষিক হ্রাস: প্রায় ৭৫%
এই ফলাফলটি I জিনগত ভিন্নতার বাহক নারীদের ক্ষেত্রে পাওয়া গেছে; সব গর্ভবতী নারীর ক্ষেত্রে একই ফল হবে, এমন নয়।
তবে যেসব নারীর মধ্যে এই জিনগত ভিন্নতা ছিল না, তাদের ক্ষেত্রে বেশি মাত্রায় DHA গ্রহণের সঙ্গে গর্ভাবস্থা ৪০ সপ্তাহের পর পর্যন্ত চলার সম্ভাবনা বেড়ে যাওয়ার সম্পর্ক দেখা গেছে।
গবেষণার ফলাফল ইঙ্গিত দেয় যে জিনগত বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী DHA-এর চাহিদা ভিন্ন হতে পারে। তাই কারা বেশি মাত্রার DHA থেকে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হতে পারেন, তা শনাক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ।
যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবহৃত কিছু প্রসবপূর্ব পুষ্টি-সাপ্লিমেন্ট (Prenatal Supplements) ও শিশুখাদ্যে DHA অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে অপরিণত শিশুর জন্ম প্রতিরোধের নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে বেশি মাত্রায় DHA ব্যবহারের কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
ভারতের জন্য এই গবেষণার গুরুত্ব কী?
আগের কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত মানুষের মধ্যে এই I জিনগত ভিন্নতাটি তুলনামূলক বেশি প্রচলিত হতে পারে। বহু প্রজন্ম ধরে প্রাকৃতিক নির্বাচনের কারণে এমনটি হয়ে থাকতে পারে। ফলে অন্য কয়েকটি জনগোষ্ঠীর তুলনায় দক্ষিণ এশীয়দের মধ্যে এই ভিন্নতা বেশি দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এ কারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে: ভারতীয় নারীদের মধ্যে এই জিনগত ভিন্নতা বেশি প্রচলিত হলে, গর্ভাবস্থায় তাদের বেশি মাত্রায় DHA গ্রহণ উপকার করতে পারে কি?
ভারতে অপরিণত শিশুর জন্মের বিপুল সংখ্যার কথা বিবেচনা করলে, কার্যকর ও স্বল্পমূল্যের কোনো পুষ্টিগত হস্তক্ষেপ জনস্বাস্থ্যে বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে এই গবেষণার ফলাফল এখনই ভারতে গর্ভকালীন স্বাস্থ্যসেবার নির্দেশনা পরিবর্তনের ভিত্তি নয়। গবেষণাটি যুক্তরাষ্ট্রে পরিচালিত হয়েছে এবং এতে ভারতের কোনো নারী অংশ নেননি।