নিজস্ব প্রতিবেদক :
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) ফরিদপুর জেলার সেচ বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে ৩৬৫ কোটি ৪৬ লাখ টাকার সেচ উন্নয়ন প্রকল্পে আর্থিক অনিয়ম, ক্রয়প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতা, সরকারি সম্পদ বিক্রি ও পদোন্নতিতে বিধি লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৩ সালের জুনে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে বিএডিসি চেয়ারম্যানকে নির্দেশ দিয়েছিল কৃষি মন্ত্রণালয়। তবে তদন্তের ফলাফল ও পরবর্তী ব্যবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগ অনুযায়ী, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাকের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত মিজানুর রহমান কুমিল্লা, চাঁদপুর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সেচ উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক থাকাকালে নির্ধারিত ক্রয়পদ্ধতি অনুসরণ না করে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ দেওয়া, বাজারদরের চেয়ে বেশি দামে সরঞ্জাম কেনা এবং প্রকল্পের অর্থ ব্যয়ে অনিয়ম করেছেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, অন্য প্রকল্পে প্রতিসেট পিভিসি পাইপ পাঁচ লাখ টাকায় কেনা হলেও একই সময়ে কুমিল্লা প্রকল্পে তা কেনা হয় নয় লাখ টাকায়। খাল পুনঃখননে সিডিউলের সঙ্গে বাস্তবে কাটা মাটির অমিল এবং ঠিকাদারদের গোপনে টেন্ডারের আইডি ও প্রাক্কলিত দর দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
আট জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীকে ডিঙিয়ে পদোন্নতি
অভিযোগ রয়েছে, আট জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীকে অতিক্রম করে মিজানুর রহমানকে নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে তত্ত্বাবধায়ক/উপপ্রধান প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়। এ নিয়ে পদোন্নতিবঞ্চিত প্রকৌশলীরা কৃষি সচিব, বিএডিসি চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আইনি নোটিশ পাঠান এবং হাইকোর্টে রিট করেন বলে জানা গেছে।
আটটি গাছের অনুমোদন, শত শত গাছ কাটার অভিযোগ
কুমিল্লা বিএডিসি কমপ্লেক্সে আটটি গাছ বিক্রির অনুমোদন নিয়ে চার-পাঁচশ গাছ অবৈধভাবে কেটে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। চান্দিনা, মুরাদনগর ও কসবায় পুরোনো অবকাঠামো অকেজো ঘোষণা না করেই বিক্রি করে সংস্থাকে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিযোগও রয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় তিন জেলার নয়টি কমপ্লেক্সের ভবন মেরামতে পাঁচ বছরের জন্য এক কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও মাত্র দুই বছরে কুমিল্লা কমপ্লেক্সের সংস্কারে ৯৫ লাখ টাকা ব্যয়ের অভিযোগ রয়েছে। এ কাজে উন্মুক্ত দরপত্রের পরিবর্তে আরএফকিউ পদ্ধতি ব্যবহারের অভিযোগও করা হয়েছে।
মেরামতে ১ কোটি ৭২ লাখ টাকা, কৃষকের সুফল নিয়ে প্রশ্ন
২০১৯-২০ ও ২০২০-২১ অর্থবছরে সেচযন্ত্র, বারিড পাইপ ও ফসলরক্ষা বাঁধ মেরামতে প্রায় এক কোটি ৭২ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হলেও কৃষকেরা প্রত্যাশিত সুফল পাননি বলে অভিযোগ রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও তোলা হয়েছে।
এ ছাড়া রাজধানীর লালমাটিয়া ও সিদ্ধেশ্বরীতে ফ্ল্যাট, উত্তরা, নিকুঞ্জ ও পূর্বাচলে প্লট এবং জামালপুরের মেলান্দহে জমি ও বাগানবাড়িসহ বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে মিজানুর রহমান ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে। তবে এসব সম্পদের মালিকানা ও অর্থের উৎস স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।
এর আগেও বীজ গুদাম নির্মাণ প্রকল্পে প্রকিউরমেন্ট স্পেশালিস্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে গাজীপুর, টাঙ্গাইলসহ বিভিন্ন জেলায় নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে।
তদন্তের নির্দেশের পর কী হলো?
২০২৩ সালের জুনে কৃষি মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন উপসচিব মো. জসিম উদ্দিন স্বাক্ষরিত আদেশে অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে বিএডিসি চেয়ারম্যানকে নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু তদন্ত প্রতিবেদন, নিরীক্ষা নথি কিংবা পরবর্তী প্রশাসনিক ব্যবস্থার তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর নিষ্পত্তি হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও সাবেক প্রকল্প পরিচালক মো. মিজানুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তাঁর হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরেও বার্তা পাঠানো হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রকাশ করা হবে।
৩৬৫ কোটি টাকার প্রকল্পে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, ব্যয়ের হিসাব যাচাই এবং মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার বাস্তবায়ন সম্পর্কে বিএডিসি ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের স্পষ্ট বক্তব্য এখন জরুরি।