দুই সারোয়ারের কারসাজি: গণপূর্তে বদলি-বাণিজ্য ঘিরে ক্ষোভ তুঙ্গে

নিজস্ব প্রতিবেদক:

বদলি-বাণিজ্য বন্ধ করে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতের লক্ষ্যে লটারির মাধ্যমে কর্মকর্তা ও প্রকৌশলীদের পদায়নের এক অভূতপূর্ব উদ্যোগ নিয়েছিল গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহেরের উপস্থিতিতে সম্প্রতি ৭৬৭ জন উপ-সহকারী প্রকৌশলী, ২৫৪ জন উপ-সহকারী প্রকৌশলী (ইলেকট্রিক্যাল), ২১৯ জন সহকারী প্রকৌশলী এবং ১৯০ জন উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলীসহ সর্বমোট ১ হাজার ৪৩০ জন প্রকৌশলীকে বদলি ও পদায়ন তথ্য প্রকাশ করা হয়। তবে স্বচ্ছতা আনার যে মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে এই লটারির সূচনা হয়েছিল, তা এখন তীব্র বিতর্ক ও দুর্নীতির অভিযোগে ঢাকা পড়েছে। অধিদপ্তরজুড়ে এখন প্রশ্ন উঠেছে—লটারি কি সত্যিই নিরপেক্ষ ছিল, নাকি তা কেবল বদলি-বাণিজ্যের এক পরিকল্পিত নাটক?

 

‘দুই সারোয়ারের’ গোপন সমঝোতা ও নতুন বিতর্ক

কর্মকর্তাদের অভিযোগ, লটারির নামে যে প্রক্রিয়ায় বদলি সম্পন্ন হয়েছে, তার নেপথ্যে ছিল গভীর কারসাজি। নির্বাহী প্রকৌশলীদের লটারি সম্পন্ন হওয়ার পরপরই দুর্নীতি ও অনিয়মের নানা তথ্য প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে। গণপূর্ত অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, পুরো প্রক্রিয়াটি পরিচালনা করেছেন দুই কর্মকর্তা, যাদের নাম কাকতালীয়ভাবে একই—‘সারোয়ার’।

অভিযোগকারীদের মতে, একজন সারোয়ার মন্ত্রণালয়ে বসে পুরো পরিকল্পনার দিকনির্দেশনা দিয়েছেন, আর অপর সারোয়ার গণপূর্ত অধিদপ্তরে বসে তা মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন করেছেন। এই ‘দুই সারোয়ারের’ গোপন যোগসাজশে টাকার বিনিময়ে পদায়ন নিশ্চিত করা হয়েছে বলে তীব্র ক্ষোভে ফুসছে পুরো গণপূর্ত অধিদপ্তর। তাদের দাবি, অপেক্ষাকৃত দক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিদের কৌশল করে ঢাকার বাইরে পাঠানো হয়েছে, আর মোটা অঙ্কের লেনদেনের মাধ্যমে কম যোগ্য অথচ প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ঢাকার ভেতরের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে বসানো হয়েছে।

 

লটারি নাকি পুরনো দুর্নীতিবাজদের পুনর্বাসন

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে কয়েকটি আলোচিত পদায়নের চাঞ্চল্যকর চিত্র, যা লটারির নিরপেক্ষতাকে সরাসরি প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে:

ডিভিশন ৪-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুদ রানা, যার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির একাধিক প্রতিবেদন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, তিনি লটারির মাধ্যমে আশ্চর্যজনকভাবে মেডিকেল ডিভিশনের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পোস্টিং পেয়েছেন।

একইভাবে ডিভিশন ১-এর বিতর্কিত নির্বাহী প্রকৌশলী, হত্যা মামলার আসামি ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আহসান হাবিব পদায়ন পেয়েছেন সরাসরি ‘স্টাফ অফিসার’ হিসেবে।

অপরদিকে দুর্নীতির দায়ে রাজউক থেকে গণপূর্ত অধিদপ্তরে ফেরত পাঠানো নির্বাহী প্রকৌশলী রাজিব ফেরত এসেই প্রথমে টাকার বিনিময়ে মহাখালীর নির্বাহী প্রকৌশলীর পদ বাগিয়ে নেন। লটারির মাধ্যমে আবার তাকে সেই একই ডিভিশন ১-এ পোস্টিং দেওয়া হয়েছে, যেখানে রাজউকে যাওয়ার আগেও তিনি দায়িত্ব পালন করছিলেন। লটারির মতো দৈবচয়ন প্রক্রিয়ায় একের পর এক বিতর্কিত ব্যক্তির এমন একই ও সুবিধাজনক স্থানে পদায়ন পাওয়া নিয়ে ব্যাপক সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে।

এছাড়া শেরেবাংলা ৩-এ দায়িত্ব পালনকারী নির্বাহী প্রকৌশলী আন্দালিব রহমান, যার বিরুদ্ধে বিগত সরকারের আমলে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ ছিল, তাকে পোস্টিং দেওয়া হয়েছে অতি গুরুত্বপূর্ণ সিটি ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে।

‘থলের বিড়াল’ বের করতে উচ্চপর্যায়ের তদন্তের দাবি

লটারির নামে এই ধরনের বৈষম্যমূলক পদায়নে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ কর্মকর্তারা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে গণপূর্ত অধিদপ্তরের একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, গুরুত্বপূর্ণ ও লাভজনক পদগুলোতে কেবল বিতর্কিত ও দুর্নীতিগ্রস্তদের নাম আসা কোনো দুর্ঘটনা হতে পারে না।

ক্ষুব্ধ কর্মকর্তারা জোর দাবি জানিয়েছেন যে, অভিযুক্ত ‘দুই সারোয়ার’ এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক হিসাব অনতিবিলম্বে তলব করা হোক। পাশাপাশি লটারির মাধ্যমে ঢাকার ভেতরে গুরুত্বপূর্ণ পোস্টিং পাওয়া নির্বাহী প্রকৌশলী ও তাদের স্বজনদের ব্যাংক লেনদেন যাচাই করলে দুর্নীতির আসল সত্য বা ‘থলের বিড়াল’ বেরিয়ে আসবে। অনিয়মের জট খুলতে অভিযুক্তদের মোবাইল কথোপকথনের কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর) পর্যালোচনার পাশাপাশি তাদের কঠোর শাস্তির দাবি তুলেছেন অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

 

এসব অভিযোগের বিষয়ে সত্যতা জানতে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত সারোয়ারের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরবর্তীতে লিখিত খুদে বার্তা (এসএমএস) পাঠানো হলেও তার কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে, গণপূর্ত অধিদপ্তরের সারোয়ারের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেন। তার দাবি, তিনি একা এই সিদ্ধান্ত নেননি; মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী শুধু অফিস গ্রেডিংয়ের কাজটি করেছেন। এই মূল্যায়ন ও গ্রেডিংয়ের কাজে তার সাথে আরও চারজন কর্মকর্তা যুক্ত ছিলেন বলেও জানান তিনি।

সংবাদটি শেয়ার করে অন্য জানার সুযোগ দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *