দলিলপ্রতি ঘুষের অভিযোগ শতকোটি টাকার সম্পদের মালিক শফিকুল ইসলাম এখন ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার

নিজস্ব প্রতিবেদক :

চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার জগন্নাথপুর নিবাসী করিৎকর্মা অফিসার বহুল আলোচিত ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার (D.R.) শফিকুল ইসলাম। প্রথম দর্শনে তাঁকে দেখতে নায়কোচিত পরিচ্ছন্ন ব্যক্তিত্ব মনে হলেও তাঁর ঘুষ, দুর্নীতি ও জাল দলিল বাণিজ্যের শিকড় রয়েছে অনেক গভীরে। ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রারে যোগদানের শুরু থেকেই তিনি লুটপাট বাণিজ্যের মাস্টারমাইন্ড হিসেবে আবির্ভূত। তিনি প্রতি মাসে বেতনের বাইরে হাতিয়ে নিচ্ছেন কোটি টাকা।

ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রারের অধীনে জেলা সদরসহ এখানে মোট সাব-রেজিস্ট্রি অফিস আছে ৯টি। সেগুলো হচ্ছে, সাব-রেজিস্ট্রার সদর রেকর্ডরুম ঢাকা, সাব-রেজিস্ট্রার অফিস ঢাকা, সাব-রেজিস্ট্রার অফিস উত্তরা, সাব-রেজিস্ট্রার অফিস খিলগাঁও, সাব-রেজিস্ট্রার অফিস বাড্ডা, সাব-রেজিস্ট্রার অফিস তেজগাঁও, সাব-রেজিস্ট্রার অফিস মোহাম্মদপুর, সাব-রেজিস্ট্রার অফিস সূত্রাপুর, সাব-রেজিস্ট্রার অফিস গুলশান, সাব-রেজিস্ট্রার অফিস ধানমন্ডি, সাব-রেজিস্ট্রার অফিস পল্টন, সাব-রেজিস্ট্রার অফিস মিরপুর, সাব-রেজিস্ট্রার অফিস ডেমরা, সাব-রেজিস্ট্রার অফিস শ্যামপুর, সাব-রেজিস্ট্রার অফিস কেরানীগঞ্জ দক্ষিণ, সাব-রেজিস্ট্রার অফিস কেরানীগঞ্জ মডেল, সাব-রেজিস্ট্রার অফিস নবাবগঞ্জ, সাব-রেজিস্ট্রার অফিস দোহার, সাব-রেজিস্ট্রার অফিস সাভার, সাব-রেজিস্ট্রার অফিস আশুলিয়া, সাব-রেজিস্ট্রার অফিস কালামপুর, ঢাকা।

প্রতি মাসে এই সাব-রেজিস্ট্রি অফিসগুলো থেকে দলিল সম্পাদন হয় ৩০/৩৫ হাজার। তিনি তাঁর সহকারীর মাধ্যমে মাস শেষে দলিলপ্রতি ২,৫০০ টাকা হিসেবে নাশতা খরচের নামে কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও শেখ হাসিনার পেতাত্মা শফিকুল ইসলামের মেহেরপুর ও ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার সাব-রেজিস্ট্রার থাকাকালীন দুর্নীতির হাতেখড়ি হয়। এরপর পার্শ্ববর্তী এলাকার তৎকালীন জনপ্রশাসনমন্ত্রী ফরহাদ হোসেনকে দিয়ে মোটা অঙ্কের দক্ষিণার বিনিময়ে তদবির করিয়ে ২০২১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর জেলা রেজিস্ট্রার হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে নাটোর জেলা রেজিস্ট্রার হিসেবে যোগদান করেন। আর তখন থেকেই দুর্নীতির মাধ্যমে নামে-বেনামে গড়ে তোলা শুরু করেন অবৈধ সম্পদের পাহাড়।

উল্লেখযোগ্য সম্পদ হচ্ছে, কল্যাণপুর, ঢাকা, বাসা নম্বর-১২, রোড নম্বর-০২, ওয়ার্ড নম্বর-১১, ড্রিম হেভেন ভবনে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট রয়েছে। তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া ইসলামের নামে একটি অত্যাধুনিক গাড়ি রয়েছে। যার গাড়ি নম্বর ঢাকা মেট্রো-গ-২৫-৬১৬৬। তাঁর দুই ছেলে মাহি ও মুহিতের নামে অবৈধ সম্পদের বিষয়ে অনুসন্ধান চলমান।

নিজ জেলা চুয়াডাঙ্গা সদরে কাঠপট্টি এলাকায় চারতলা আলিশান বাড়ি এবং কার্পাসডাঙ্গা বাজারে মার্কেটসহ আরও একটি চারতলা ভবন। আট কবর এলাকায় রয়েছে মার্কেটসহ দোতলা ভবন। এ ছাড়া জগন্নাথপুর নিজ গ্রামেও রয়েছে বিলাসবহুল দোতলা বাড়ি।

রাজধানী ও অন্যান্য জেলা: ঢাকার মোহাম্মদপুরে একটি বাড়ি ছাড়াও যশোর ও ঝিনাইদহে তাঁর একাধিক বাড়ির সন্ধান পাওয়া গেছে।

বেনামি সম্পদ: মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলার আনন্দবাস গ্রামে ভাইয়ের নামে বিপুল পরিমাণ জমি ক্রয় করেছেন তিনি।

ব্যবসা ও বিলাসিতা: ভাগিনা মো. হুমায়ুন আহমেদের মাধ্যমে পরিচালনা করছেন কোটি টাকার ‘নেহা ত্বহা ট্রেডার্স’। এ ছাড়া নিজের চলাচলের জন্য ব্যবহার করেন বিলাসবহুল প্রাইভেট কার। এ ছাড়া তিনি সংগোপনে ব্যবহার করেন একাধিক বেনামি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ৫ আগস্ট ২০২৪, জুলাই আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে গেলে শফিকুল ইসলাম আইজিআর অফিসের অনুমতি ছাড়াই আত্মগোপন করেন। সে সময় দীর্ঘদিন যাবৎ অনুপস্থিত থাকার কারণে ব্যাপক ক্ষোভে ফেটে পড়েন ভুক্তভোগী ও সচেতন মহল। এরপর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে ২০২৪ সালের ১০ অক্টোবর ফরিদপুর জেলা রেজিস্ট্রার হিসেবে যোগদান করেন। তারপর থেকে তাঁরই ছত্রছায়ায় ফরিদপুর সদর সাব-রেজিস্ট্রারসহ জেলার অন্যান্য সাব-রেজিস্ট্রারগণ ঘুষ-দুর্নীতির অপ্রতিরোধ্য প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠেন। যা ছাত্র-জনতার হাতে ধরাও পড়ে এবং দুদকেও মামলা দায়ের হয় সাব-রেজিস্ট্রারদের নামে। কিন্তু এই সমস্ত দুর্নীতির মাস্টারমাইন্ড সুচতুর শফিকুল পর্দার আড়াল থেকে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যান।

এর আগে শেখ হাসিনার পেতাত্মা শফিকুল ইসলাম ‘জুলাই বিপ্লব দমন’ করার মানসে কতিপয় অস্ত্রধারী যুবলীগ ও ছাত্রলীগ ক্যাডারদের সঙ্গে রাতের আঁধারে গভীর চক্রান্ত ও শলাপরামর্শে লিপ্ত হন। তাছাড়াও ছাত্র-জনতার ওই আন্দোলন নস্যাৎ করার জন্য বিশেষ মহলের ফোন পেয়ে মোটা অঙ্কের টাকা লগ্নি করেন। ওই সময় নাটোর জেলা রেজিস্ট্রার শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে ঘুষ, দুর্নীতি ও অসদাচরণের অভিযোগ তুলে ভুক্তভোগীরা দুর্নীতির বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) সুস্পষ্ট অভিযোগ দাখিল করেছেন এবং প্রয়োজনীয় তথ্যপ্রমাণও সরবরাহ করেছেন। তবে অত্যন্ত হতাশাজনক বিষয় হলো, অভিযোগ দাখিলের দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও দুদক দৃশ্যত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি।

বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হওয়ার পরও যখন তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, তখন তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার মুন্সি মোখলেছুর রহমানের পদোন্নতিজনিত কারণে বদলি হলে শফিকুল ইসলাম মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায়ে ম্যানেজ করে ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার হিসেবে পদ বাগিয়ে নেন। অতঃপর ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার হিসেবে যোগদান করেন। যদিও নিবন্ধন অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সর্বশেষ হালনাগাদ করা তালিকায় শফিকুল ইসলামকে ফরিদপুর জেলা রেজিস্ট্রার হিসেবেই দেখানো হয়েছে। কিন্তু শফিকুল ইসলাম ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। যা ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে (তেজগাঁও রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সে) দুদকের চালানো অভিযানের সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে গণমাধ্যমের সামনে কথা বলা থেকে প্রকাশিত হয়।

এ ছাড়া গত ৯ সেপ্টেম্বর পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সিনিয়র সাংবাদিক জিএম রফিকুল ইসলামের ওপর হামলা করেন মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের উমেদার আওলাদ ওরফে ব্লেট আওলাদ, সদর রেজিস্ট্রি অফিসের রাসেল ওরফে পটু রাসেল, লম্বু রাসেল ওরফে ইয়াবা রাসেল, তেজগাঁও ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার শফীর ব্যক্তিগত চালক কামাল ওরফে মাতাল কামাল, ট্যাবলেট হামিদ এবং পল্লবী সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের ব্লেট রাজিবসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ করা হয়েছে। এ ছাড়া রেজিস্ট্রি কমপ্লেক্সের উমেদারদের একটি সংগঠনের কয়েকজনের বিরুদ্ধেও অভিযোগ তোলা হয়। কিন্তু জেলা রেজিস্ট্রার শফিকুল এখনো পর্যন্ত এই উমেদারদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেননি।

জেলা রেজিস্ট্রার শফিকুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে ঘুষ বাণিজ্য, হয়রানি ও দুর্ব্যবহারের মাধ্যমে সাধারণ জনগণের ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন। প্রতি দলিল নিবন্ধনের ক্ষেত্রে গড়ে ৫ হাজার টাকা ঘুষ নেওয়া হয়, যা না দিলে দলিল বাতিলের হুমকি দেওয়া হয়। এ ছাড়া, প্রতিটি সাব-রেজিস্ট্রার অফিস থেকে প্রতি মাসে নিয়মিতভাবে ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা করে ঘুষ আদায়ের অভিযোগও তোলা হয়।

সবচেয়ে বিস্ফোরক অভিযোগটি হলো দুদকের কার্যক্রম নিয়ে। সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণসহ অভিযোগ দাখিল করা হলেও দীর্ঘ সময় ধরে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বিশ্বস্ত সূত্রের দাবি, তদন্ত প্রক্রিয়াকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে দুদকের একটি প্রভাবশালী অংশ ও কতিপয় গণমাধ্যমকর্মীকে বিপুল পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে ‘ম্যানেজ’ করেছেন শফিকুল ইসলাম। ফলে ঝুলে আছে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির ফাইল।

এই সমস্ত অভিযোগের বিষয়ে জানতে শফিকুল ইসলামের ব্যবহৃত নম্বরে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

জনমনে প্রশ্ন: খুঁটির জোর কোথায়?

একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকেও অতীতে এতসব গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কীভাবে তিনি স্বপদে বহাল রয়েছেন, তা নিয়ে সরকারি মহলে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমান কর্মস্থল কিশোরগঞ্জেও তাঁর এই নেতিবাচক ভাবমূর্তি প্রশাসনের সুনাম ক্ষুণ্ন করবে কি না, তা নিয়ে দেখা দিয়েছে সংশয়।

ভুক্তভোগীরা এবং সচেতন নাগরিক সমাজ অবিলম্বে এই ‘দুর্নীতিবাজ’ কর্মকর্তার অবৈধ সম্পদের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগী ও দলিল লেখক সমিতির একজন শীর্ষ নেতা বলেন, প্রতি বৃহস্পতিবার অফিস শেষে তাঁর সহকারী ও তাঁকে তল্লাশি করলে ‘দুদক এনফোর্সমেন্ট টিম’ অবৈধ টাকাসহ হাতেনাতে গ্রেপ্তার করতে পারবে।

সংবাদটি শেয়ার করে অন্য জানার সুযোগ দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *