পাখি আমদানির আড়ালে শতকোটি টাকা বিদেশে পাচার: তদন্তের মুখে বন কর্মকর্তারা

নিজস্ব প্রতিবেদক:

পাখি আমদানির আড়ালে শত শত কোটি টাকা পাচারের অভিযোগে বন অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে নতুন করে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। প্রধান বন সংরক্ষকের কার্যালয় থেকে শুরু করে অধিদপ্তরের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সম্ভাব্য যোগসাজশ খতিয়ে দেখবে সংস্থাটি। একই সঙ্গে বন অধিদপ্তরে বদলি ও পদায়নে ঘুষ লেনদেন এবং বড় অঙ্কের সরকারি প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের পুরোনো অভিযোগও সামনে এসেছে।

তবে প্রশ্ন উঠেছে, বন অধিদপ্তরের বিভিন্ন পর্যায়ে অনিয়মের অভিযোগ এবং দুদকের অভিযান ও নথি সংগ্রহের পরও কেন দীর্ঘ সময় ধরে অনুসন্ধান শেষ হচ্ছে না? ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে বদলি-পদায়নে ঘুষ এবং প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে অভিযান চালানোর পর দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও সংশ্লিষ্ট অনুসন্ধান এখনো নিষ্পত্তি হয়নি।

মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) দুদকের উপপরিচালক আকতারুল ইসলাম বলেন, পাখি আমদানির আড়ালে অর্থ পাচারের অভিযোগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা ও অন্যান্য বিষয় অনুসন্ধান করা হবে। নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর অনুসন্ধান পর্যায়ে আটকে থাকা বিষয়গুলোও পর্যালোচনা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

বদলি-পদায়নে ঘুষের নির্ধারিত দর?

দুদকের এনফোর্সমেন্ট ইউনিটের ২০২৫ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারির নথি অনুযায়ী, পরদিন বন ভবনে অভিযান চালানো হয়। এ সময় বন অধিদপ্তরের তৎকালীন প্রধান বন সংরক্ষক আমীর হোসাইন চৌধুরী, উপপ্রধান বন সংরক্ষক ও টেকসই বন ও জীবিকা (সুফল) প্রকল্পের পরিচালক গোবিন্দ রায়, উম্মে হাবিবাসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নথিপত্রও সংগ্রহ করে দুদক।

অভিযানে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি প্রতিবেদনে বন বিভাগের বিভিন্ন রেঞ্জ, চেকপোস্ট ও বিভাগীয় কার্যালয়ে পদায়নের ক্ষেত্রে পদভেদে ঘুষের নির্ধারিত অঙ্ক থাকার অভিযোগ উঠে আসে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দুই বছরের জন্য প্রথম শ্রেণির বিভাগীয় বন কর্মকর্তা পদে পদায়নে ৫০ লাখ টাকা, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ৩০ লাখ এবং তৃতীয় শ্রেণিতে ২০ লাখ টাকা নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

একইভাবে দুই বছরের জন্য প্রথম শ্রেণির রেঞ্জ কর্মকর্তা পদে ১৫ লাখ, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ১০ লাখ এবং তৃতীয় শ্রেণিতে ৫ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এক বছরের জন্য প্রথম শ্রেণির চেকপোস্টে স্টেশন কর্মকর্তা পদে ২০ লাখ, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ১০ লাখ এবং তৃতীয় শ্রেণিতে ৫ লাখ টাকা নেওয়ার তথ্যও প্রতিবেদনে উঠে আসে। শুধু পদায়নের সময় অর্থ লেনদেন নয়, নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন পদায়ন না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছ থেকে মাসিক মাসোহারা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগগুলো সত্য হলে বন বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ ও পদায়ন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়। তবে এসব অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা অনুসন্ধান ও তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়ার বিষয়।

দেড় হাজার কোটি টাকার প্রকল্পেও অনিয়মের অভিযোগ

বন অধিদপ্তরের প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার সুফল প্রকল্পেও অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুদক। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে নেওয়া প্রকল্পটির আওতায় কক্সবাজারের রামু উপজেলার জোয়ারিয়ানালা রেঞ্জে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫১০ হেক্টর এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৩৬২ হেক্টর এলাকায় বনায়ন ও নার্সারি সৃজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। দুদকের এনফোর্সমেন্ট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৫১০ হেক্টর এলাকায় বাগান সৃজনের বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবে আনুমানিক ১৬০ হেক্টর এলাকায় চারা রোপণ করা হয়েছিল বলে তথ্য পাওয়া যায়। বাকি এলাকায় বনায়ন না করেই বরাদ্দের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।

পরবর্তী অর্থবছরে ৩৬২ হেক্টর এলাকায় বনায়নের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অনিয়মের তথ্য উঠে আসে। প্রতিবেদনে কোথাও বাগানের সাইনবোর্ড থাকলেও ভেতরে গাছের অস্তিত্ব না থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আবার যেসব স্থানে চারা রোপণ করা হয়েছিল, সেগুলোর যথাযথ পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে। প্রকল্পের আওতায় কতটুকু বনায়ন হয়েছে, বরাদ্দের অর্থ কীভাবে ব্যয় করা হয়েছে এবং মাঠপর্যায়ের কাজের সঙ্গে নথিপত্রের সামঞ্জস্য কতটা—এসব বিষয় অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ ধরনের প্রকল্পে অনিয়ম প্রমাণিত হলে শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, বন পুনরুদ্ধার ও পরিবেশ সংরক্ষণের লক্ষ্যও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

সুপারিশের পরও অনুসন্ধান শেষ হয়নি:

এসব অভিযোগের ভিত্তিতে সুফল প্রকল্পের পরিচালক গোবিন্দ রায় ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের সুপারিশ করে এনফোর্সমেন্ট প্রতিবেদন জমা দেয় দুদক। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও অভিযোগগুলোর অনুসন্ধান শেষ হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি। এদিকে পাখি আমদানির আড়ালে শত শত কোটি টাকা পাচারের অভিযোগে নতুন অনুসন্ধান শুরু হওয়ায় বন অধিদপ্তরের আর্থিক লেনদেন, আমদানি কার্যক্রম এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়েও নতুন করে নজর পড়েছে।

দুদকের উপপরিচালক আকতারুল ইসলাম জানান, নতুন কমিশন দায়িত্ব নিয়েছে অল্প কিছুদিন আগে। তাই প্রতিটি বিষয় কমিশনের নজরে রাখা হচ্ছে। অনুসন্ধান পর্যায়ে আটকে থাকা বিষয়গুলোও পর্যালোচনা করা হবে। সব মিলিয়ে বন অধিদপ্তরের বিরুদ্ধে একদিকে পাখি আমদানির আড়ালে অর্থ পাচারের অভিযোগ, অন্যদিকে বদলি-পদায়নে ঘুষ এবং বনায়ন প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ—একাধিক বিষয় সামনে এসেছে। এখন দেখার বিষয়, দুদকের নতুন অনুসন্ধান ও পুরোনো অভিযোগগুলোর পর্যালোচনা শেষ পর্যন্ত কতদূর এগোয় এবং অভিযোগগুলোর বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত আসে।

সংবাদটি শেয়ার করে অন্য জানার সুযোগ দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *