নিজস্ব প্রতিবেদক:
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) ফরিদপুর জেলার সেচ বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, ক্রয়ে অস্বচ্ছতা ও দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগে পরেও বহাল তবিয়তে আছেন। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক কৃষি মন্ত্রী ডক্টর আব্দুর রাজ্জাকের পালিত পুত্র খ্যাত মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে বিগত সময় বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) অধীনে কুমিল্লা, চাঁদপুর, বি-বাড়িয়া জেলা সেচ উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক থাকাকালীন বিরুদ্ধে নানা আর্থিক অনিয়ম, অস্বচ্ছতা ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠে। এর প্রেক্ষিতে এর আগে ২০২৩ সালের জুন মাসে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে ও মন্ত্রণালয়কে অবহিত করার জন্য বিএনডিসির চেয়ারম্যানকে নির্দেশ দিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। কিন্তু অদৃশ্য ক্ষমতা বলে তাছাড়া আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকায় তার বিরুদ্ধে জমা পড়া সকল অভিযোগ ধামাচাপা পড়ে যায়। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের ক্ষমতাধর দুর্নীতিবাজ তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মিজান’র অনিয়ম দুর্নীতির সংবাদ তৎকালীন সময়ে দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। কিন্তু তার পরেও কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি তদন্তে দয়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের।
প্রাপ্ত অভিযোগ থেকে জানা যায়, দুর্নীতির মাধ্যমে তিনি রাজধানীর লালমাটিয়া ও সিদ্বেশ্বরীসহ বিভিন্নস্থানে বেশ কয়েকটি বিলাশ বহুল ফ্ল্যাট কিনেছেন। উত্তরা, নিকুঞ্জ ও পূর্বাচলে তার একাধিক প্লট রয়েছে। গ্রামের বাড়ি জামালপুরের মেলান্দহ উপজেলায় বাগান বাড়ি নির্মাণসহ বিপুল পরিমাণে জমি কিনেছেন। পরিবার ও শ্বশুরবাড়ির পরিবারের সদস্যদের নামে বেনামে কোটি কোটি টাকার সম্পদ গড়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে,বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মিজানুর রহমান তার জৈষ্ঠ্য ৮ জনকে ডিঙিয়ে প্রভাব খাটিয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী চলতি দায়িত্ব পদটি বাগিয়ে নেন। তার অধীনস্ত কর্মকর্তা- কর্মচারীদেরকেও বলে বেড়ান মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরকে ম্যানেজ করে এই পদটি বাগিয়েছেন তিনি। শুধু তাই নয় প্রকল্প পরিচালককে প্রকল্প এলাকায় অবস্থানের নির্দেশনা থাকলেও উর্ধ্বতন কর্মকর্তার সাথে অবৈধ সখ্যতআর সুযোগে তিনি অধিকাংশ সময় ঢাকায় অবস্থান করেন।
মিজানের বিরুদ্ধে এমন অপকর্মের ফিরিস্তি নিয়ে সরব হয়েছিলো মন্ত্রনালয়। প্রাপ্ত অভিযোগের তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে ও মন্ত্রনালয়কে অবহিত করার জন্য বিএনডিসির চেয়ারম্যানকে নির্দেশ দিয়েছে কৃষি মন্ত্রনালয়।তখনকার সময়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মো: জসিম উদ্দিন স্বাক্ষরিত আদেশে এ নির্দেশনা দেয়া হয়।
একাধিক সূত্রে জানা যায়,বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ২০১৯ থেকে ২০২৪ অর্থ বছরে ৩৬৫.৪৬ কোটি টাকা ব্যয়ে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) অধীনে কুমিল্লা, চাঁদপুর, বি-বাড়িয়া জেলা সেচ উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে খাল পুনঃখনন, ভূপরিস্থ সেচ নালা, ভূগর্ভস্থ সেচনালা নির্মাণ, রাবার ড্যাম নির্মাণ, হাইড্রোলিক এলিভেটর ড্যাম, ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ, সেচ অবকাঠামো নির্মাণ, শক্তিচালিত পাম্প স্থাপন, গভীর নলকূপ স্থাপন ও পুনর্বাসন, আর্টসিয়ান নলকূপ স্থাপন, সৌরশক্তিচালিত পাম্প ও টিউবওয়েল স্থাপন করার কথা রয়েছ।
প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদনের সময় তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীকে প্রকল্প পরিচালক করার বিধান রাখা হয়। কিন্তু বিধি বর্হিভুত ভাবে এবং ডিপিপি অনুসরণ না করে বিএডিসি’র তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলীকে প্রভাবিত করে একজন জুনিয়র নির্বাহী প্রকৌশলীকে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ করা হয়। প্রকল্পের প্রায় দুই বছর অতিবাহিত হওয়ার পর বিএডিসি’র ৮ জন সিনিয়র কর্মকর্তাদের ডিঙ্গিয়ে মোহাম্মদ মিজানুর রহমানকে নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে পদোন্নতি দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক-উপপ্রধান প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। অথচ ১৯৯০ এর প্রবিধানমালা ১৫/৪ ধারা মোতাবেক পঞ্চম গ্রেডের ওপরে পদোন্নতির ক্ষেত্রে অবশ্যই সিনিয়রিটি দেখার বাধ্য বাধকতা রয়েছে। এদিকে পদোন্নতি বঞ্চিত নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আশরাফুজ্জামান, মো. নূরুল ইসলাম, প্রণজিত কুমার দেব, আবুল হাসান, মো. মিজানুল ইসলাম, মো. মাহবুব আলম ও সহকারী প্রধান প্রকৌশলী মো. শওকত আলী আকন্দ এই ৬ প্রকৌশলী গত ১৩ জুন কৃষি সচিব, বিএডিসি চেয়ারম্যান, বিএডিসি সচিব ও বিএডিসির পরিচালকদের লিগ্যাল নোটিশ পাঠায় এবং পরবর্তীতে হাইকোর্টে রীট করেছিলেন।
অভিযোগে বলা হয়, মিজানুর রহমান প্রকল্প পরিচালক হিসেবে যোগদান করে সংস্থার নিয়ম কানুনের কোন তোয়াক্কা না করে নিজের ইচ্ছামত কাজ চালিয়ে যান। কুমিল্লা বিএডিসি কমপ্লেক্সের ভিতরের ৮ টি গাছ বিক্রির অনুমোদন নিয়ে কমপ্লেক্সের চার-পাঁচশত গাছ অবৈধ ভাবে কেটে বিক্রি করে বিপুল পরিমাণের অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন। বিএডিসি ইউনিট অফিস নির্মাণের জন্য বিএডিসি’র সার ও বীজ বিভাগ থেকে প্রাপ্ত জায়গায় পুরাতন অবকাঠামো (চান্দিনা/মুরাদ নগর/ কসবা) কোনরূপ অকেজো ঘোষনা ছাড়াই অবৈধ ভবে বিক্রি করে দেন। ফলে সংস্থা আর্থিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে কোটি কোটি টাকা।
অভিযোগে বলা হয়, প্রকল্পের আওতাধীন তিনটি জেলার ৯ টি কমপ্লেক্সের অফিস/আবাসিক ভবন মেরামতে ৫ বছরের জন্য এক কোটি টাকা’র সংস্থান রাখা হলেও তিনি ২ বছরেই শুধুমাত্র ১ টি কমপ্লেক্সের (কুমিল্লা) রিনোভেশনের নামে পঁচানব্বই লক্ষ টাকা খরচ করেছেন প্রকল্প পরিচালক মিজানুর। উক্ত কাজের জন্য কোন দরপত্র আহ্বান না করে আরএফকিউ -এর মাধ্যমে নিজেই উক্ত কাজ করেন যা আরপিআর-এর পরিপন্থি।
অভিযোগে আরো বলা হয়, ডিপিপিতে বিভিন্ন ক্রয়/ কাজের পদ্ধতি (ওটিএম/এলটিএম/আরএফকিউ) ইত্যাদি নির্দিষ্ট করা থাকলেও তিনি নিজের ইচ্ছামত ক্রয় পদ্ধতি অবলম্বন করে নিজে লাভবান হওয়াসহ নিজের পছন্দের লোককে কাজ পাইয়ে দিয়ে সরকারের অর্থের অপচয় করেছেন।
অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পিডি মিজানের সিন্ডিকেট ছাড়া অন্য কোন ঠিকাদার কাজ পায় না। এই ঠিকাদারী সিন্ডিকেট চক্রকে এককভাবে কোটি কোটি টাকার কাজ বন্টন করে তিনি নিজেও বিপুল অর্থের মালিক বনে গেছেন। তাঁর মনোনীত ঠিকাদারকে গোপনে টেন্ডারের আইডি ও এস্টিমেট দর প্রদান করে দেন। অন্য প্রকল্পে যেখানে প্রতিসেট পিভিসি পাইপ পাঁচ লক্ষ টাকায় কিনেছে সেখানে একই সময়ে কুমিল্লা প্রকল্পে কিনেছে নয় লক্ষ টাকা দিয়ে। এভাবেই সরকারের কোটি কোটি টাকা অতিরিক্ত খরচ দেখিয়ে নিজের পকেট ভারী করেছেন পিডি মিজানুর রহমান। খাল পূনঃখনন কাজে সিডিউলে উল্লেখিত মাটির সঙ্গে বাস্তবে কাটা মাটির কোন মিল নেই। যা ভাউচার, দরপত্র ও চুক্তিপত্র যাচাই-বাছাই করলে প্রমাণ হবে।
এছাড়াও, বিগত ২০১৯-২০ ও ২০২০-২১ অর্থ বছরে সেচযন্ত্র মেরামত/বারিডপাইপ মেরামত ও ফসল রক্ষা বাঁধ মেরামত বাবদ প্রায় এক কোটি বাহাত্তর লাখ টাকা খরচ করলেও মাঠ পর্যায়ে কৃষকরা তার কোন সুফল পায়নি। কোন কোন ক্ষেত্রে ভূয়া বিল, ভাউচার, আরএফকিউ এর মাধ্যমে টাকা আত্মসাৎ হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, এর আগেও একটি প্রকল্পের বীজ গোডাউন নির্মাণ প্রকল্পের প্রকিউরমেন্ট স্পেশালিস্ট অফিসার থাকাকালীন দুর্নীতির স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছিলেন এই মিজানুর রহমান। সেই সময় গাজীপুর, টাঙ্গাইলসহ একাধিক জেলায় ব্রিজ গোডাউন নির্মাণ করেছিলেন অতি নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে। ইতিপূর্বেও তার বিরুদ্ধে একাধিকবার দুনীর্তি অনিয়মের অভিযোগ উঠলেও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরকে ম্যানেজ বিষয়গুলো ধামাচাপা দিয়ে দেন মিজানুর।
এ ব্যাপারে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও সাবেক প্রকল্প পরিচালক মো. মিজানুর রহমানের সাথে একাধিক বার মুঠোফোনে যোগাযোগ করে না পেয়ে তার ওয়ার্টসআপ নাম্বারে ক্ষুদে বার্তা পাঠালেও কোন উত্তর পাওয়া যায় নাই।