লগ বইয়ে ভুয়া ট্রিপ ও ‘খালি ট্রাক’ দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা লোপাট : বিআরটিসি ঢাকা ট্রাক ডিপোয় ডিজিএম আশরাফুলের দুর্নীতির পাহাড় পর্ব-১

নিজস্ব প্রতিবেদক:

বিশেষ প্রতিবেদক, ঢাকাঃ বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশন (বিআরটিসি)-এর ঢাকা ট্রাক ডিপো এখন এক বিশাল দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। সরকারি এ লাভজনক সংস্থাকে পরিকল্পিত ভাবে লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে ডিপোর ইউনিট প্রধান ও ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) মোঃ আশরাফুল আলমের বিরুদ্ধে।

লগবই জালিয়াতি করে সচল গাড়িকে ‘খালি গাড়ি’ বা ‘রিটার্ন ট্রিপ’ দেখানো, নতুন গাড়ির মূল্যবান যন্ত্রাংশ ও টায়ার চুরি, জ্বালানি তেলের ভুয়া বিল ভাউচার তৈরি এবং সচল গাড়িকে অকেজো ঘোষণা করে স্ক্র্যাপ বাণিজ্যের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কোষাগার লুটের বিবরণ দিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) কর্মচারীদের পক্ষ থেকে একটি সুনির্দিষ্ট ও লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছে। এই গুরুতর অনিয়ম গুলোর বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই বিআরটিসির প্রধান কার্যালয়ের নির্দেশে একটি বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

তারিখের আবেদনে বর্ণিত অভিযোগের তদন্তক্রমে স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রতিবেদন সাত কার্যদিবসের মধ্যে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তা পাওয়া যায়নি। পরে তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন পাঠানোর জন্য পুনরায় নির্দেশ দেওয়া হয়।

একই সময়ের আরেকটি অভিযোগ পত্রে বিস্তারিত ভাবে উল্লেখ করা হয় যে, আশরাফুল আলম গাজীপুরে ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে মন্ত্রণালয় কর্তৃক সুইডেন থেকে আমদানিকৃত ভলভো বাস মেরামত বাবদ টাকা থেকে প্রায় ৮ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন, যার বিষয়ে দুদক মামলা দায়ের করেছিল এবং তিনি আসামি হিসেবে অভিযুক্ত হয়েছিলেন।

ইন্সপেক্টর পদ থেকে ম্যানেজার হয়ে বিভিন্ন ডিপোতে কর্মরত থাকাকালে দুর্নীতি করে কোটি কোটি টাকার মালিক হন আশরাফুল আলম।
তিনি মতিঝিল বাস ডিপো ও আন্তর্জাতিক বাস ডিপো থেকে প্রতি মাসে ৩০-৩৫ লাখ টাকা আয় করে থাকেন বলে অভিযোগ ছিল।

প্রতি ডিপোর ম্যানেজারদের কাছ থেকে প্রতিমাসে ৫-১০ লাখ টাকা পর্যন্ত উৎকোচ গ্রহণ, ব্যক্তিগত ভাবে মনোরঞ্জন কামরা বা যৌন কাজ চরিতার্থ করার জন্য বিভিন্ন মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক, চেয়ারম্যানকে খুশি করতে বিভিন্ন ম্যানেজারকে বদলি করা, একাধিক ডিপোর নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখা, অফিসে মদ্যপান এবং বিআরটিসির টাকা দিয়ে গাজীপুরে বিলাসবহুল ফ্ল্যাটসহ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও ওই সময়ের নোটিশে উঠে এসেছিলো।

৩ ডিসেম্বর ২০১৯ তারিখের আরেকটি স্মারকে (নং-৩৫.০১৬.০৪.০০০০.০৫০.২০১৮-৫৫৩) আইন অধিশাখা থেকেও একই অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত পূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পুনরায় নির্দেশ দেওয়া হয়।

বিআরটিসির বর্তমান চেয়ারম্যান, আব্দুল লতিফ মোল্লা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিআরটিসিকে একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক সেবামূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে বর্তমান সরকার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। ঢাকা ট্রাক ডিপোর ডিজিএম মোঃ আশরাফুল আলমের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ গুলো অত্যন্ত গুরুতর। আমরা ইতিমধ্যেই এই বিষয়ে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি এবং একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। তদন্তাধীন বিষয়ে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। যদি তদন্তে আর্থিক অনিয়ম বা রাষ্ট্রীয় সম্পদ চুরির প্রমাণ মেলে, তবে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি ফৌজদারি আইনে মামলা দায়েরের জন্য দুদককে পূর্ণ সহযোগিতা করা হবে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিআরটিসির ডিপো গুলোতে দীর্ঘদিন ধরে এই ধরনের পদ্ধতিগত দুর্নীতি বা ‘সিস্টেমিক করাপশন’ চলে আসছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ডিপো প্রধানের সম্মতি বা অংশীদারিত্ব ছাড়া কোনো ভাবেই রাষ্ট্রীয় গাড়ির পার্টস বদলানো কিংবা ভুয়া ট্রিপ দেখিয়ে জ্বালানি চুরি করা সম্ভব নয়।

তিনি আরও বলেন, কর্মচারীরা যখন দুদকের কাছে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ নিয়ে যান, তখন বুঝতে হবে দুর্নীতি কতটা চরম আকার ধারণ করেছে। আমরা দাবি জানাব, দুর্নীতি দমন কমিশন যেন কোনো রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে এই সিন্ডিকেটের মূল হোতাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনে। অন্যথায় রাষ্ট্রীয় এই প্রতিষ্ঠানগুলো পুরোপুরি দেউলিয়া হয়ে যাবে।

যোগাযোগ ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ এবং বুয়েটের অধ্যাপক ড. মোঃ শামসুল হক বলেন, সরকারি পরিবহন খাতের মূল সমস্যা হলো দুর্বল তদারকি এবং জবাবদিহিতার অভাব। ঢাকা ট্রাক ডিপোর মতো কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ স্থানে যখন একজন শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পার্টস চুরি ও রাজস্ব আত্মসাতের মতো অভিযোগ ওঠে এবং তার প্রেক্ষিতে বিভাগীয় তদন্ত চলে, তখন সাময়িক ভাবে তাঁকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে রাখা উচিত। কারণ পদে বহাল থাকলে তিনি তথ্য প্রমাণ বা লগবই নষ্ট করার সুযোগ পাবেন।

তিনি আরও বলেন, ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও জিপিএস সিস্টেম ব্যবহারের মাধ্যমে এই ধরনের ট্রিপ চুরি ও জ্বালানি অপচয় শতভাগ বন্ধ করা সম্ভব। কিন্তু দুর্নীতিবাজ চক্র নিজেদের স্বার্থেই প্রযুক্তি বাস্তবায়নে বাধা দেয়।

তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, একটি নির্দিষ্ট চক্র ডিপোর শৃঙ্খলা নষ্ট করতে আমার বিরুদ্ধে ভুয়া তথ্য ছড়াচ্ছে। আমি নিয়ম মেনেই ডিপো পরিচালনা করছি। চলমান বিভাগীয় তদন্তে আমি সম্পূর্ণ নির্দোষ প্রমাণিত হবো।

অপরদিকে বিআরটিসি ঢাকা ট্রাক ডিপোর সাধারণ কর্মচারীদের পক্ষে দুদকের কাছে প্রতিকার চাওয়া মোঃ রফিকুল ইসলাম জানান, আমরা সৎ ভাবে কাজ করতে চাই। কিন্তু ডিজিএম স্যারের সিন্ডিকেটের কারণে ডিপোর সাধারণ চালক ও কর্মচারীদের ন্যায্য ট্রিপ বোনাস ও ওভার টাইমের টাকা কেটে রাখা হচ্ছে। অথচ ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে লাখ লাখ টাকা লোপাট হচ্ছে। আমরা নিরুপায় হয়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ তদন্ত সংস্থার দ্বারস্থ হয়েছি।

তিনি আরও বলেন, ২০১৯ সালের সেই প্রশাসনিক নোটিশ গুলো এবং বর্তমান অভিযোগের মিল দেখে স্পষ্ট যে, মোঃ আশরাফুল আলমের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকায় কেনা রাষ্ট্রীয় সম্পদ এভাবে গুটিকয়েক কর্মকর্তার পকেটস্থ করার এই মহোৎসব বন্ধে এখন দুর্নীতি দমন কমিশনের কঠোর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপের অপেক্ষায় আছেন ডিপোর কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সাধারণ জনগণ।

সংবাদটি শেয়ার করে অন্য জানার সুযোগ দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *