নিজস্ব প্রতিবেদক:
রাজধানীর মিরপুরে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কার্যালয়ে দালাল চক্রের তৎপরতা, সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি ও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও বিআরটিএ কার্যালয়ের বিভিন্ন শাখায় একটি চক্রের প্রভাব ও দৌরাত্ম্য অব্যাহত রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সেবাগ্রহীতাদের কয়েকজন।
অভিযোগের কেন্দ্রে উঠে এসেছে মোহাম্মদ দুলাল ওরফে ‘খাটো দুলাল’ বা ‘পিচ্চি দুলাল’ নামের এক ব্যক্তির নাম। তাঁর বিরুদ্ধে বিআরটিএ কার্যালয়ের বিভিন্ন কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার, দালালি ও চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন দুলাল।
১২৭ নম্বর কক্ষসহ বিভিন্ন শাখায় দালালের তৎপরতার অভিযোগ
সংশ্লিষ্টদের দাবি, বিআরটিএর ১২৭ নম্বর কক্ষসহ কার্যালয়ের বিভিন্ন শাখায় দীর্ঘদিন ধরে দালালদের আনাগোনা রয়েছে। যানবাহনের ফিটনেস সনদ, মালিকানা পরিবর্তন, রোড পারমিটসহ বিভিন্ন সেবা নিতে আসা গ্রাহকদের একটি অংশকে দালালদের মাধ্যমে কাজ করাতে চাপ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, নিয়মিত প্রক্রিয়ায় সরকারি সেবা নিতে গেলে যেখানে নির্ধারিত ফি পরিশোধই যথেষ্ট, সেখানে দালালদের মাধ্যমে কাজ করালে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়। দ্রুত কাজ করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে এসব অর্থ নেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তবে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের নির্দিষ্ট ঘটনা বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের স্বাধীন যাচাই এই প্রতিবেদনে সম্ভব হয়নি।
কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, বিআরটিএর কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে দুলাল ও তাঁর সহযোগীদের যোগাযোগ রয়েছে। এই যোগাযোগের সুযোগ কাজে লাগিয়ে দালালরা কার্যালয়ের বিভিন্ন কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করেন বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন।
তবে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী সরাসরি দুলাল বা তাঁর সহযোগীদের সঙ্গে অনৈতিকভাবে জড়িত—এমন অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যও পাওয়া গেলে অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ চিত্র আরও স্পষ্ট হতে পারে।
রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহারের অভিযোগ
দুলাল নিজেকে স্থানীয় যুবদলের এক নেতার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচয় দেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে বিআরটিএ কার্যালয়ে নিজের প্রভাব ধরে রাখার চেষ্টা করা হয় বলেও সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ দাবি করেছেন।
তবে যে নেতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার দাবি করা হয়েছে, তিনি দুলালের সঙ্গে এমন ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।
স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা জানিয়েছেন, দুলাল বর্তমানে দলের কোনো পদে নেই। দলের নাম ব্যবহার করে কেউ কোনো ধরনের বেআইনি কর্মকাণ্ডে জড়িত হলে তার দায় দল নেবে না বলেও তারা জানিয়েছেন।
তথ্য সংগ্রহে হুমকির অভিযোগ
দালাল চক্রের কর্মকাণ্ড নিয়ে তথ্য সংগ্রহের সময় হুমকি দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এসব ঘটনায় বিআরটিএর কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সেবাগ্রহীতাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
তথ্য সংগ্রহ বা অভিযোগ যাচাইয়ের ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে বাধা বা হুমকি দেওয়া হয়ে থাকলে সেটিও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সব অভিযোগ অস্বীকার দুলালের
অভিযোগের বিষয়ে মোহাম্মদ দুলালের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিআরটিএ কার্যালয়ের কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার, দালালি বা চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেন।
তিনি বিআরটিএ বা কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর দাবি, তাঁকে ঘিরে যেসব অভিযোগ করা হচ্ছে, সেগুলোর কোনো ভিত্তি নেই।
দালালমুক্ত সেবা চান গ্রাহকেরা
বিআরটিএতে সেবা নিতে আসা গ্রাহকদের অভিযোগ, সরকারি দপ্তরে দালালদের দৌরাত্ম্য বন্ধ না হলে সাধারণ মানুষকে হয়রানি ও অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার পরিস্থিতি থেকে পুরোপুরি মুক্ত করা কঠিন হবে।
তাদের দাবি, কার্যালয়ের বিভিন্ন শাখায় দালালদের প্রবেশ ও কার্যক্রম কীভাবে চলছে, তাদের সঙ্গে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগাযোগ রয়েছে কি না এবং সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের ঘটনা ঘটছে কি না—এসব বিষয় প্রশাসনিকভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।
অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দালাল চক্রের সদস্যদের পাশাপাশি তাদের সহযোগিতা করা কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী থাকলে তাঁদের বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সেবাগ্রহীতারা।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু একজন দুলালকে ঘিরে নয়—সরকারি সেবা নিতে আসা মানুষকে মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে কি না এবং বিআরটিএ কার্যালয়ের ভেতর-বাইরের এই চক্রের সঙ্গে কারা জড়িত, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।