নিজস্ব প্রতিবেদক:
ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখা-২ ঘিরে ঘুষ, কমিশন ও অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন শাখাটির সার্ভেয়ার আফজাল হোসেন। ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণের অর্থ ছাড় করিয়ে দেওয়ার নামে জমির মালিকদের কাছ থেকে ৫ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন আদায়ের অভিযোগ করেছেন একাধিক ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্ট সূত্র।
অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এলএ শাখা-২-এর ক্ষতিপূরণের ফাইল নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেও অনেক জমির মালিককে ফাইল নিয়ে একাধিকবার ঘোরানো হয় এবং একপর্যায়ে কমিশন ছাড়া অর্থ ছাড়ে জটিলতা তৈরি করা হয় বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত হলে অর্থ লেনদেন, ফাইল প্রক্রিয়াকরণ এবং সংশ্লিষ্টদের ভূমিকার প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।
একাধিক সূত্রের দাবি, অনিয়মের অভিযোগের পর একপর্যায়ে আফজাল হোসেনকে ঢাকা এলএ শাখা থেকে অন্যত্র বদলি করা হয়েছিল। কিন্তু বদলির প্রায় চার মাসের মধ্যেই তিনি আবার ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ফিরে আসেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
তার এই পুনরায় ঢাকা অফিসে পদায়ন ঘিরে অনৈতিক লেনদেনের অভিযোগও করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে বদলি বা পুনঃপদায়নের ক্ষেত্রে কোনো আর্থিক লেনদেন হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে কোনো নথি বা সরকারি তদন্তের তথ্য এই প্রতিবেদনের জন্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগকারীদের দাবি, বর্তমানে এলএ শাখা-২-এ দায়িত্ব পালন করে আফজাল তার পুরোনো যোগাযোগ ও প্রভাবকে কাজে লাগাচ্ছেন। তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি চক্র ক্ষতিপূরণের ফাইল ছাড়ের ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
ভূমি অধিগ্রহণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিকদের জন্য ক্ষতিপূরণের অর্থ পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, সেই অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়াকেই একটি চক্র অতিরিক্ত আয়ের উৎস হিসেবে ব্যবহার করছে।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ফাইলের কাজ শেষ হওয়ার পরও অর্থ ছাড়ে নানা অজুহাতে বিলম্ব করা হয়। পরে নির্দিষ্ট হারে কমিশন দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়। ৫ শতাংশ থেকে শুরু করে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ দাবি করা হয় বলে অভিযোগ তাদের।
একাধিক ভুক্তভোগী আরও অভিযোগ করেছেন, কমিশনের দাবি মেনে না নিলে ফাইলের অগ্রগতি ধীর হয়ে যায়। ফলে জমির মালিকরা বাধ্য হয়ে মধ্যস্থতাকারী বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মাধ্যমে টাকা দেওয়ার চেষ্টা করেন।
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে নির্দিষ্ট অর্থ লেনদেনের নথি বা রসিদ প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে অভিযোগগুলো তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
সাধারণ কর্মচারীর সম্পদ নিয়ে নানা প্রশ্ন
আফজাল হোসেনের বিরুদ্ধে শুধু ঘুষ বা কমিশন নেওয়ার অভিযোগই নয়, তার কথিত সম্পদের উৎস নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রের দাবি, ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় আফজালের নামে বা বেনামে একাধিক ফ্ল্যাট ও প্লট রয়েছে। পুরান ঢাকার মিটফোর্ড এলাকায় তার নামে বা কথিত ছদ্মনামে কয়েকটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া তার ও পরিবারের সদস্যদের নামে বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে বিপুল অর্থ রয়েছে বলেও দাবি করেছেন অভিযোগকারীরা। তবে এসব সম্পদের মালিকানা, ব্যাংক হিসাবের পরিমাণ এবং অর্থের উৎস সম্পর্কে কোনো যাচাইকৃত নথি এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
ফলে আফজালের ঘোষিত আয়, চাকরিজীবনের বৈধ উপার্জন এবং তার নামে থাকা কথিত সম্পদের মধ্যে কোনো অসামঞ্জস্য আছে কি না, তা নির্ধারণে সম্পদ বিবরণী ও সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই প্রয়োজন।
আফজাল হোসেনের বিরুদ্ধে ভূমি অধিগ্রহণ-সংক্রান্ত একটি বড় প্রকল্পে কয়েক শ কোটি টাকার দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলা রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, মামলা হওয়ার পর নিজেকে আইনি জটিলতা থেকে রক্ষা করতে তিনি বিভিন্ন মহলে তদবির করছেন। এমনকি প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে মামলাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগও রয়েছে।
তবে এ বিষয়ে দুদকের মামলা নম্বর, মামলার ধারা, আসামির তালিকা বা আদালতের নথি প্রতিবেদনের জন্য উপস্থাপন করা হয়নি। তাই মামলাটি সত্যিই আফজাল হোসেনের বিরুদ্ধে দায়ের হয়েছে কি না এবং মামলায় তার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ আনা হয়েছে, তা সংশ্লিষ্ট নথি দিয়ে যাচাই করা জরুরি।
ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ প্রত্যাশী কয়েকজন জমির মালিক অভিযোগ করেছেন, জমি সরকারের প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণের পরও তারা
সময়মতো ক্ষতিপূরণের টাকা পাচ্ছেন না। ফাইলের বিভিন্ন ধাপের কথা বলে তাদের দীর্ঘদিন ঘোরানো হচ্ছে।
তাদের অভিযোগ, শেষ পর্যন্ত সংশ্লিষ্টদের চাহিদা অনুযায়ী ৫ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ দেওয়ার বিষয়ে সম্মতি জানালে ফাইল ছাড়ের প্রক্রিয়া এগোয়।
ভুক্তভোগীদের এমন অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু ব্যক্তিগত অনিয়ম নয়, ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পের প্রতি মানুষের আস্থার জন্যও গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে।
অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আফজাল হোসেনের দায়িত্ব পালনকালে কোন কোন ভূমি অধিগ্রহণের ফাইল তার মাধ্যমে প্রক্রিয়াকরণ হয়েছে, সেগুলোর অর্থ ছাড়ের সময় ও প্রক্রিয়া কী ছিল এবং কোনো মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে অর্থ লেনদেন হয়েছে কি না-এসব বিষয় তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
একই সঙ্গে তার সম্পদ বিবরণী, আয়কর নথি, ব্যাংক হিসাব, জমি-ফ্ল্যাটের মালিকানা এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের প্রকৃত মালিকানা যাচাইয়েম
দাবিও উঠেছে।
8
বিশেষ করে তার বিরুদ্ধে দুদকের মামলা থাকার দাবি সত্য হলে সেই মামলার বর্তমান অবস্থা এবং সেখানে উত্থাপিত অভিযোগের সঙ্গে বর্তমান দায়িত্ব পালনের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
সার্ভেয়ার আফজাল হোসেনের বিরুদ্ধে ওঠা ঘুষ, কমিশন, সম্পদ ও অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাইই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ প্রদানের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার প্রয়োজন রয়েছে।