নিজস্ব প্রতিবেদক:
বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) ৫৮২ কোটি টাকার সার আত্মসাতের ঘটনায় পরিবহন ঠিকাদার ও সাবেক সংসদ সদস্য কামরুল আশরাফ পোটনসহ তাঁর প্রতিষ্ঠানের পাঁচ ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা হলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং সার আত্মসাতে সহযোগিতার অভিযোগ ওঠা কর্মকর্তাদের কেউ কেউ পেয়েছেন পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম বিসিআইসির বর্তমান ঊর্ধ্বতন মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মো. সহিদুল ইসলাম।
অভিযোগ রয়েছে, ২০১৬ সাল থেকে বিসিআইসির সার পরিবহন ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের মাধ্যমে পোটনকে সরকারি সার আত্মসাতের সুযোগ করে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন মো. সহিদুল ইসলাম। ওই সময় তিনি সংস্থাটির ক্রয় বিভাগের মহাব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তাঁর দায়িত্বকালে পোটন বিসিআইসির সার পরিবহনের বিভিন্ন লটের একের পর এক ঠিকাদারি পান। আগের লটের সার বুঝিয়ে না দিলেও তাঁকে নতুন লটের পরিবহন ঠিকাদার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এভাবে দীর্ঘদিন ধরে পোটনকে নতুন নতুন পরিবহন চুক্তি দেওয়ার ফলে বিসিআইসির সার বাইরে বিক্রি করে অর্থ আত্মসাতের সুযোগ তৈরি হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, পোটনের সার আত্মসাতের ঘটনায় বিসিআইসির তৎকালীন ক্রয় বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মো. সহিদুল ইসলামসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তবে তাঁদের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
বিসিআইসির নথিপত্র অনুযায়ী, পরিবহন ঠিকাদার কামরুল আশরাফ পোটনের কাছে সংস্থাটির মোট ৭১ হাজার ৮০১ টন ৩১ কেজি সার পাওনা রয়েছে। এসব সারের সরকারি নির্ধারিত ভর্তুকি মূল্য ৫৮১ কোটি ৫৮ লাখ ৯ হাজার ৬৪ টাকা। তবে সারের আমদানি মূল্য আরও বেশি হওয়ায় সরকারের প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ এই অর্থের চেয়েও বেশি বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
নথিতে সার আত্মসাতের সময়কাল ২০২১ সালের ১ নভেম্বর থেকে ২০২২ সালের ৩০ জুলাই পর্যন্ত দেখানো হলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, পোটনের সার আত্মসাতের ঘটনা ২০১৬ সাল থেকেই চলছিল। ওই সময় মো. সহিদুল ইসলাম বিসিআইসির ক্রয় বিভাগের মহাব্যবস্থাপকের দায়িত্ব পান। অভিযোগ রয়েছে, তিনি দায়িত্বে থাকাকালে পোটনের আগের চুক্তির সার বুঝিয়ে দেওয়ার বিষয়টি যথাযথভাবে নিশ্চিত না করেই তাঁকে নতুন পরিবহন চুক্তির সুযোগ দেওয়া হয়।
২০২২ সালের মাঝামাঝি সময়ে পোটনের বিপুল পরিমাণ সার আত্মসাতের বিষয়টি ধরা পড়লে বিসিআইসির তৎকালীন কর্তৃপক্ষ তাঁকে নতুন করে সার পরিবহনের ঠিকাদারি দেওয়া বন্ধ করে দেয়। আগের চুক্তির সার বুঝিয়ে না দেওয়া পর্যন্ত নতুন কোনো পরিবহন ঠিকাদারি দেওয়া হবে না বলে জানানো হয়। এরপর হিসাব-নিকাশে পোটনের কাছে বিপুল পরিমাণ সার পাওনা থাকার বিষয়টি স্পষ্ট হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের অভিযোগ, ওই সময় ক্রয় বিভাগের মহাব্যবস্থাপকের দায়িত্বে থাকা মো. সহিদুল ইসলাম পোটনের কাছে পাওনা থাকা সব সারকে শেষ দিকের বকেয়া হিসেবে দেখানোর মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র আড়াল করার চেষ্টা করেন। এতে ২০১৬ সাল থেকে চলা অনিয়মের ধারাবাহিকতা আড়ালে থেকে যায়। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে মো. সহিদুল ইসলামের বক্তব্য জানা যায়নি।
পোটনকে একাধিকবার নোটিশ দেওয়া হলেও তিনি বিসিআইসির পাওনা সার বুঝিয়ে দিতে ব্যর্থ হন। চূড়ান্ত নোটিশের পর তাঁর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। পরবর্তীতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) পোটনের সার আত্মসাতের ঘটনায় অনুসন্ধান শুরু করে এবং কামরুল আশরাফ পোটনসহ তাঁর প্রতিষ্ঠানের পাঁচ ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করে। মামলার অন্য আসামিরা হলেন পোটন ট্রেডার্সের মহাব্যবস্থাপক মো. শাহাদাত হোসেন নিপু ও মো. নাজমুল আলম বাদল, উত্তরবঙ্গ প্রতিনিধি সোহরাব হোসেন এবং খুলনা ও নওয়াপাড়ার প্রতিনিধি মো. আতাউর রহমান।
পোটনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও বিসিআইসির অভ্যন্তরে তাঁর সহযোগীদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। এ বিষয়ে ২০২৩ সালের ১৭ জানুয়ারি বিসিআইসি কর্তৃপক্ষ সংস্থাটির পরিচালক (অর্থ)-এর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটিকে ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়। তদন্তের উদ্দেশ্য ছিল পোটনের সঙ্গে সম্পাদিত পরিবহন চুক্তির ত্রুটি-বিচ্যুতি চিহ্নিত করা, চুক্তি ব্যবস্থাপনা ও সার পরিবহনে বিসিআইসির মনিটরিং এবং রিপোর্টিংয়ের যথার্থতা যাচাই করা, পোটন ট্রেডার্সের সার সরবরাহে ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান করা এবং সার আত্মসাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের গাফিলতি বা অবহেলার দায় নির্ধারণ করা।
কমিটির সদস্যদের মধ্যে ছিলেন বিসিআইসির পরিচালক (উৎপাদন ও গবেষণা), তৎকালীন চিফ অডিটর এবং বর্তমানে প্রধান অর্থ কর্মকর্তা মো. গোলাম ফারুক, তৎকালীন মহাব্যবস্থাপক (আইন) ও বর্তমানে ঊর্ধ্বতন মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) আহসান কুদ্দুস কুন্তল এবং তৎকালীন উপমহাব্যবস্থাপক ও বর্তমানে মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মোহাম্মদ সারোয়ার জাহান। বিসিআইসির তৎকালীন চিফ অব পার্সোনালের স্বাক্ষরে কমিটি গঠন করা হয়।
তবে অভিযোগ রয়েছে, কমিটি গঠনের পর ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ থাকলেও তদন্ত কার্যক্রম এগোয়নি। প্রতিবেদন তৈরি করা তো দূরের কথা, কমিটি তদন্তকাজেই হাত দেয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। ফলে সার আত্মসাতে বিসিআইসির কর্মকর্তাদের ভূমিকা, তাঁদের দায়-দায়িত্ব এবং সম্ভাব্য অনিয়মের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি।
তদন্ত কমিটির কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ার পেছনে প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের ভূমিকা রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তাঁদের মধ্যে মো. সহিদুল ইসলামের নামও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, যথাযথ তদন্ত হলে সার আত্মসাতের ঘটনায় বিসিআইসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্ব ও ভূমিকা স্পষ্ট হয়ে যেত। এতে তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় বা আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পথ তৈরি হতে পারত।
কিন্তু তদন্ত ঝুলে থাকার মধ্যেই মো. সহিদুল ইসলামের পদোন্নতি হয়। পদোন্নতির পর তাঁকে প্রথমে ঘোড়াশাল-পলাশ সার কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে পদায়ন দেওয়া হয়। পরবর্তীতে তিনি বিসিআইসির ঊর্ধ্বতন মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) পদে দায়িত্ব পান। বর্তমানে তিনি ওই পদেই রয়েছেন।
বিসিআইসিতে ঊর্ধ্বতন মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) পদটি ব্যবস্থাপনা পরিচালক পর্যায়ের সমমর্যাদার হিসেবে বিবেচিত। তবে কর্মকর্তাদের কাছে এ পদটি ব্যবস্থাপনা পরিচালকের তুলনায় অধিক আকর্ষণীয় বলে বিবেচিত হয়। ফলে সার আত্মসাতের অভিযোগের সঙ্গে তাঁর নাম উঠে আসার পরও এমন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পাওয়াকে ঘিরে বিসিআইসির ভেতরে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
একদিকে পোটনের বিরুদ্ধে বিপুল পরিমাণ সরকারি সার আত্মসাতের অভিযোগে মামলা হয়েছে, অন্যদিকে এই আত্মসাতের সুযোগ তৈরিতে যেসব কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করেছেন বলে অভিযোগ, তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা মো. সহিদুল ইসলাম পদোন্নতি পেয়ে সংস্থাটির গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে দায়িত্ব পালন করছেন।
এতে বিসিআইসির সার পরিবহন ব্যবস্থাপনা, চুক্তি বাস্তবায়ন ও তদারকিতে জবাবদিহির ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে ২০১৬ সাল থেকে পোটনকে ধারাবাহিকভাবে পরিবহন চুক্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা, পাওনা সার আদায়ে ব্যর্থতা এবং ২০২৩ সালে গঠিত তদন্ত কমিটির নিষ্ক্রিয়তার বিষয়গুলো এখনো অমীমাংসিত।
সংশ্লিষ্টদের মতে, পোটনের সার আত্মসাতের ঘটনায় শুধু ঠিকাদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াই যথেষ্ট নয়। সরকারি সার পরিবহন ও সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনায় যেসব কর্মকর্তা দায়িত্বে ছিলেন, তাঁদের ভূমিকা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা জরুরি।
এসব বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য সহিদুল ইসলামকে বারবার মুঠোফোনে চেষ্টা করেও সাড়া পাওয়া যায়নি।