নিজস্ব প্রতিবেদক:
শিক্ষামন্ত্রীর বাসায় হামলা কেন, খুনি খালেদা জবাব দে’ স্লোগান ও মিছিলের আয়োজক মোঃ আব্দুল্লাহ আল মামুনকে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপপরিচালক (প্রশাসন) পদে পদায়নের জন্য করা আবেদনে সুপারিশ করেছেন খোদ শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন, চট্টগ্রাম ১০ আসনের (ডবলমুরিং, খুলশী ও হালিশহর) সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান ও মৎস্য ও প্রাণি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু। এছাড়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রদলের সভাপতি খুরশিদ আলম মোঃ আব্দুল্লাহ আল মামুনকে প্রত্যয়ন পত্র দিয়েছে তিনি ছাত্রদলের পদধারী হিসেবে। বাস্তবে মোঃ আব্দুল্লাহ আল মামুন কোন সময়েই ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না।
সম্প্রতি ডিএস পুলে উপসচিব হয়েছেন শিক্ষা ক্যাডারের ২২ কর্মকর্তা । এই ২২ জনের মধ্যে একজন শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপপরিচালক (প্রশাসন) মো. শহীদুল হক। তিনি শিক্ষা ক্যাডারের অর্থনীতি বিষয়ের সহযোগী অধ্যাপক। শহীদুল হক গত ১৭ আগস্ট উপসচিব হওয়ায় ঐ দিন থেকেই শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপপরিচালক (প্রশাসন) পদটি শূন্য রয়েছে। গাড়ি ও অন্যান্য নানা সুবিধা থাকায় এই পদের বিপরীতে আবেদনও পড়েছে অগণিত। অর্ধশত আবেদনের মধ্যে এই পদের বিপরীতে যে ফাইলটি চুড়ান্ত করা হয়েছে তিনি আর কেউ নন আওয়ামী আমলের অন্যতম সহযোগী ও শিক্ষা ভবনে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালানোর একদিন আগে অর্থ্যাৎ ৪ আগস্ট মিছিলের আয়োজক বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের ২৯ তম ব্যাচের কর্মকর্তা ও নড়াইলের লোহাগড়া সরকারি আদর্শ মহাবিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক (বাংলা) মোঃ আব্দুল্লাহ আল মামুন। ২০১৫ সালের ৭ মে থেকে ২০২৪ সালের মার্চের ১২ তারিখ পর্যন্ত ছিলেন পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের সহকারী শিক্ষা পরিদর্শক। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই ছাত্রনেতা নওফেলপন্থী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
শিক্ষা সংবাদের অনুসন্ধানে জানা গেছে, কোটা আন্দোলনকারীদের এ যুগের রাজাকার বলে অভিহিত করেন সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। এরপর বিক্ষুদ্ধ ছাত্র-জনতা ৩ আগস্ট (২০২৪) চট্টগ্রামের নওফেলের বাড়িতে হামলা করে। সেই হামলার প্রতিবাদে ৪ আগস্ট রাস্তায় নামেন বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের অর্ধডজন কর্মকর্তা। এ সময় তারা স্লোগান দেন, “চলছে লড়াই চলবে, শেখ হাসিনা লড়বে। শেখ হাসিনার ভয় নাই, রাজপথ ছাড়ি নাই। দালাল-বদর রাজাকার, এই মুহূর্তে বাংলা ছাড়। ঘাপটি মারা দালালেরা হুশিয়ার সাবধান। আমার মাটি, আমার মা, পাকিস্তান হবে না। শিক্ষামন্ত্রীর (নওফেল) বাসায় হামলা কেন, খুনি খালেদা জবাব দে। মন্ত্রীর বাসায় হামলা কেন, খুনি খালেদা জবাব দে।”
আর এই মিছিল আয়োজনে ৩ আগস্ট রাতে জুম মিটিংয়ের আয়োজন করা হয়। এই জুম মিটিংয়ের আয়োজক ছিলেন তিন জন মাধ্যমিক শাখার পরিচালক সৈয়দ জাফর আলী, এনামুল হক ও মোঃ আব্দুল্লাহ আল মামুন। এই জুম মিটিং থেকেই সিদ্ধান্ত হয় পরের দিন অর্থ্যাৎ ৪ আগস্ট শিক্ষা ভবনে মিছিল করার। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মোঃ আব্দুল্লাহ আল মামুন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০০৩ সালে বাংলায় বিএ (সম্মান) ও ২০০৫ সালে এমএ সম্পন্ন করেন। ছাত্র জীবন থেকেই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি নওফেলপন্থী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ২৯ তম বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে ২০১১ সালে যোগদান করে মাদারীপুর সরকারি কলেজ এরপর নারায়ণগঞ্জের সরকারি তোলাম কলেজে বছর তিনেক চাকরি করেই আসেন শিক্ষার ঘুসের হাট খ্যাত পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরে। এই দপ্তরে পদায়নের পর তিনি কক্সবাজারে প্রায় ৫৭ কাঠা জমি কেনেন। যার মধ্যে নুনিয়ার ছড়ায় ২০ কাঠা, মেরিন ড্রাইভে ১৬ কাঠা। যার বর্তমান বাজার মূল্য অন্তত ১০ কোটি টাকা। টানা দশ বছর ডিআইএ তে পদায়ন থেকে তার ঘুস দুর্নীতি ব্যাপক আলোচনায় আসলে আওয়ামী আমলের শেষ সময়ে অর্থ্যাৎ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালানোর চার মাস আগে তাকে বদলি করা হয়। তবে সেই বদলিও হন নিজ উপজেলা লোহাগড়ায়।
শিক্ষামন্ত্রীর বাসায় হামলা কেন, খুনি খালেদা জবাব দে’ স্লোগান ও মিছিলের আয়োজক মোঃ আব্দুল্লাহ আল মামুনকে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপপরিচালক (প্রশাসন) পদে পদায়নের জন্য করা আবেদনে সুপারিশ করেছেন খোদ শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন, চট্টগ্রাম ১০ আসনের (ডবলমুরিং, খুলশী ও হালিশহর) সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান ও মৎস্য ও প্রাণি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু। এছাড়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রদলের সভাপতি খুরশিদ আলম মোঃ আব্দুল্লাহ আল মামুনকে প্রত্যয়ন পত্র দিয়েছে তিনি ছাত্রদলের পদধারী হিসেবে। বাস্তবে মোঃ আব্দুল্লাহ আল মামুন কোন সময়েই ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। শিক্ষা ক্যাডারের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, মুলত এই প্রত্যয়নপত্রের আলোকেই মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও এমপি নোমান সুপারিশ করেছে তাকে এই পদে পদায়নের জন্য।
চট্টগ্রাম ১০ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান – আব্দুল্লাহ আল মামুনের শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপপরিচালক পদে করা আবেদনের উপর গত ১২ আগস্ট স্বাক্ষরিত সুপারিশের লেখেন, ‘বিশেষ গুরুত্বসহকারে বিষয়টি বিবেচনার জন্য জোর সুপারিশ করছি।’
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু ৩০ আগস্ট তার স্বাক্ষরিত সুপারিশে লেখেন, “বিবেচনা করার জন্য জোর সুপারিশ করছি।” শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন তার সিল স্বাক্ষর দিয়ে জরুরি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য শিক্ষা সচিব বরাবর পাঠান।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিসিএস জেনারেল এডুকেশন অ্যাসোসিয়েশনের একাধিক নেতা বলেন, যারা প্রকৃত ছাত্রদল করা বা বিএনপি করা তারাই বঞ্চিত হচ্ছেন। আওয়ামী আমলের সুবিধাভুগি, ছাত্রলীগ করা শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা ভালো পদায়ন পাচ্ছেন। তারা প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি কামনা করেন।
জানতে চাইলে মোঃ আব্দুল্লাহ আল মামুন মুঠোফোন নম্বর বন্ধ থাকায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক শিক্ষা সংবাদ’কে বলেন, “শুক্রবার অফিস ছুটির দিন। এখন অফিস আওয়ারের বাইরেও সময় চলছে। এ মুহূর্তে কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে পারব না। কিছু জানার থাকলে রবিবার অফিসে এসে যোগাযোগ করবেন।” এ কথা বলার পর তিনি ‘ভালো থাকবেন’ জানিয়ে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
শিক্ষা ভবনে মিছিল আয়োজককে কিভাবে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক পদে সুপারিশ করলেন জানতে চাইলে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলনের মুঠোফোনে কল ও মেসেজ করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ের শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি অধ্যক্ষ সেলিম ভুইঁয়া, এমপি শিক্ষা সংবাদ’কে বলেন, “এটি আসলেই দুঃখজনক বিষয়। ছাত্ররা আন্দোলন করে অনেক কষ্টে ফ্যাসিবাদী সরকারকে বিদায় করেছে। অথচ সেই সরকারের পক্ষে মিছিল আয়োজনের অভিযোগ থাকা একজন কর্মকর্তাকে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পদায়নের জন্য একাধিক রাজনৈতিক ব্যক্তির সুপারিশ আসা অত্যন্ত দুঃখজনক।”
তিনি বলেন, “কারা ওই কর্মকর্তার পক্ষে সুপারিশ করেছেন, সেই তথ্য ও সুপারিশপত্রগুলো পাঠাতে বলেন। বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রিসভায় আলোচনা করা হবে। একই সঙ্গে এ বিষয়ে তদন্ত করা হবে বলেও জানান তিনি।