রেলের ডিজির পিএস নাসিরকে ঘিরে অভিযোগের পাহাড়

নিজস্ব প্রতিবেদক:

বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালকের (ডিজি) ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) মো. নাসির উদ্দিনকে ঘিরে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। ব্যক্তিগত জীবনের বিয়ে ও যৌতুকের অভিযোগ থেকে শুরু করে মানসিক নির্যাতন, ডিজিটাল মাধ্যমে হুমকি ও গালিগালাজ, রেলের বিভিন্ন নিয়োগে অনিয়ম, জমি লিজ ও উচ্ছেদ কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার এবং অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জন—বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

অভিযোগগুলোর মধ্যে কিছু বিষয়ে লিখিত অভিযোগ, অডিও রেকর্ড, ভয়েস মেসেজ ও স্ক্রিনশটসহ তথ্য-প্রমাণ থাকার দাবি করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হয়নি এবং আদালত বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তে কোন অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে কি না, তাও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর প্রকৃত সত্য উদঘাটনে নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি উঠেছে।

বিয়ে ও ৩০ লাখ টাকা যৌতুক দাবির অভিযোগ

লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সাল থেকে নাসির উদ্দিনের সঙ্গে সাইদা পারভীনের পরিচয় ছিল। পরবর্তীতে পারিবারিক ও ধর্মীয় রীতিনীতি অনুসরণ করে ১৭ মে ২০২৬ তাঁদের বিয়ে হয় এবং ১ জুন ২০২৬ বিয়েটি আনুষ্ঠানিকভাবে রেজিস্ট্রি করা হয়।

সাইদা পারভীনের অভিযোগ, বিয়ের আগে নাসির উদ্দিন তাঁর পূর্বের বৈবাহিক জীবনসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করেন। বিয়ের পর তিনি জানতে পারেন, এটি নাসির উদ্দিনের তৃতীয় বিয়ে। এরপর বিভিন্ন অজুহাতে তাঁর কাছে ৩০ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

অভিযোগ অনুযায়ী, দাবিকৃত টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানানোর পর তাঁকে মানসিকভাবে নির্যাতন, অপমান ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়।

WhatsApp-Messenger-এ হুমকি ও গালিগালাজের অভিযোগ

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ২৫ মে ২০২৬ থেকে মোবাইল ফোন, WhatsApp ও Messenger-এর মাধ্যমে সাইদা পারভীনকে অশালীন ভাষায় গালিগালাজ, চরিত্রহনন এবং হুমকি দেওয়া হচ্ছে।

এসব অভিযোগের সমর্থনে অডিও, ভয়েস রেকর্ড ও স্ক্রিনশটসহ বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ সংরক্ষিত রয়েছে বলে দাবি করেছেন অভিযোগকারী। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট ডিজিটাল ডিভাইস, যোগাযোগের রেকর্ড ও অন্যান্য তথ্য-প্রমাণ পরীক্ষা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পিএস নিয়োগের প্রক্রিয়াতেও প্রশ্ন

নাসির উদ্দিন কীভাবে রেলের মহাপরিচালকের ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পেলেন, সেই প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগ রয়েছে, পিএস হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার আগে তিনি সংশ্লিষ্ট মহাপরিচালককে এসএমএসের মাধ্যমে তাঁকে ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন।

তবে এ অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে তাঁর নিয়োগ/দায়িত্ব প্রদানসংক্রান্ত অফিস আদেশ, নথিপত্র এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

পাকশীতে দায়িত্ব পালনকালেও নানা অভিযোগ

অভিযোগকারীদের দাবি, ২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত রেলওয়ের পাকশী অঞ্চলে দায়িত্ব পালনকালে নাসির উদ্দিনের বিরুদ্ধে শ্রমিক সর্দার নিয়োগ, সহকারী স্টেশন মাস্টার নিয়োগ এবং রেলের জমি লিজ ও উচ্ছেদ কার্যক্রম নিয়ে নানা অভিযোগ উঠেছিল।

এ ছাড়া নারীসংক্রান্ত বিভিন্ন অভিযোগ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের কথাও বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তবে এসব অভিযোগের কোনোটিই আদালত কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

সম্পদ নিয়ে অনুসন্ধানের দাবি

নাসির উদ্দিনের আয় ও জীবনযাত্রার সঙ্গে কথিত সম্পদের সামঞ্জস্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।

তাঁদের দাবি, গ্রামের বাড়িতে রয়েছে ব্যয়বহুল ডুপ্লেক্স ভবন। ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে তাঁর নামে-বেনামে জমি বা প্লট এবং তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রীর নামে একটি রেস্টুরেন্ট থাকার অভিযোগও করা হয়েছে।

তবে এসব সম্পদের প্রকৃত মালিকানা, ক্রয়ের অর্থের উৎস এবং তাঁর বৈধ আয়ের সঙ্গে সম্পদের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না—তা এখনো যাচাই করা হয়নি।

এ কারণে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তাঁর আয়কর নথি, সম্পদ বিবরণী, ব্যাংক হিসাব, জমি ও অন্যান্য স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের তথ্য যাচাই করে অনুসন্ধানের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।

দুদকে অভিযোগের দাবিও

অভিযোগকারীদের দাবি, অতীতে রেলের এক কর্মচারী নাসির উদ্দিনের বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগ করেছিলেন। তবে সেই অভিযোগের বর্তমান অবস্থা কী, অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো অনুসন্ধান বা তদন্ত হয়েছে কি না কিংবা কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না—তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

ফলে দুদকে দাখিল করা অভিযোগের নথি এবং এর পরবর্তী কার্যক্রম প্রকাশ্যে এলে অভিযোগের বিষয়ে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগও

নাসির উদ্দিন ও রেলের সংশ্লিষ্ট একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বাড়ি একই জেলায় এবং তাঁদের মধ্যে দীর্ঘদিনের পরিচয় রয়েছে—এমন দাবিও করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁদের রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা নিয়েও অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, ২০২২-২৪ সালে পাকশী অঞ্চলে দায়িত্ব পালনকালে নাসির উদ্দিনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ উঠলেও সে সময় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

তবে এসব অভিযোগের পেছনে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা রাজনৈতিক প্রভাব ছিল কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ নেই। সংশ্লিষ্ট সময়ের সরকারি নথি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করলেই এ বিষয়ে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।

তদন্তেই বেরিয়ে আসবে প্রকৃত সত্য

সংশ্লিষ্টদের মতে, নাসির উদ্দিনকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোকে শুধু ব্যক্তিগত বিরোধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ এর সঙ্গে একদিকে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের গুরুতর অভিযোগ, অন্যদিকে সরকারি প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ, রেলের জমি ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক প্রভাব এবং সম্পদ অর্জনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জড়িয়ে রয়েছে।

তাই অভিযোগগুলো সত্য না মিথ্যা—তা নির্ধারণে রেলের প্রশাসনিক নথি, দায়িত্ব প্রদানসংক্রান্ত কাগজপত্র, নিয়োগের নথি, জমি লিজ ও উচ্ছেদসংক্রান্ত রেকর্ড, সম্পদের বিবরণ, আয়কর নথি এবং দুদকে দাখিল করা অভিযোগের কাগজপত্র পর্যালোচনা করা জরুরি।

অভিযোগকারী সাইদা পারভীন একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন, অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং তদন্তকালীন সময়ে তাঁর ও তাঁর পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।

এদিকে মো. নাসির উদ্দিনের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথভাবে প্রকাশ করা হবে।

সংবাদটি শেয়ার করে অন্য জানার সুযোগ দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *