নিজস্ব প্রতিবেদক :
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি, রংপুর) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মুসার বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং টেন্ডার বাণিজ্যের এক চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এই পদে থেকে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং ঠিকাদারদের সঙ্গে আঁতাত করে তিনি বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থের মালিক হয়েছেন, যার একটি বড় অংশ বিনিয়োগ করা হয়েছে রাজধানীর অভিজাত এলাকার রিয়েল এস্টেট খাতে।
অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, মো. মুসা ঢাকা শহরের অন্যতম ব্যয়বহুল এলাকা লালমাটিয়ার ‘ব্লক-এ’ এর ৬/৪ এবং ৬/১১ নাম্বারে মমনেট বিল্ডিংয়ে লিফটের ফোরে ফ্ল্যাট নাম্বার ফোর-এ সাড়ে ৩ কোটি টাকা মূল্যের একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ক্রয় করেছেন, যার আয়তন প্রায় ১৭০০ স্কয়ার ফিট।
সরকারি বেতন স্কেলের একজন প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা হিসেবে বৈধ আয়ের সাথে এই কোটি টাকার ফ্ল্যাট ক্রয়ের কোনো সংগতি খুঁজে পাওয়া যায় না, যা সরাসরি তার দুর্নীতির দিকেই ইঙ্গিত করে।
২০২৪ সালের ১ আগস্ট তারিখে রংপুর এলজিইডিতে যোগদানের পর থেকে গত দুই বছরে মো. মুসার বিরুদ্ধে বিভিন্ন গ্রামীণ রাস্তাঘাট সংস্কার, ব্রিজ নির্মাণ ও সরকারি অবকাঠামো উন্নয়নের ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে সরকারি টাকা আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত স্থানীয় সরকার বিভাগের অন্যান্য সমসাময়িক দুর্নীতি সংক্রান্ত প্রতিবেদন ও দুদকের গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, এলজিইডির প্রকৌশলীদের একাংশ ই-জিপি টেন্ডার প্রক্রিয়ায় নির্দিষ্ট লাইসেন্সধারী ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিয়ে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত অগ্রিম কমিশন গ্রহণ করেন। মো. মুসাও এই একই প্রক্রিয়ায় রংপুর অঞ্চলের বিভিন্ন প্রকল্পে কোটি টাকার কাজের বরাদ্দ থেকে বিপুল পরিমাণ পার্সেন্টেজ বাণিজ্য বা কমিশন হাতিয়ে নিয়েছেন বলে ঠিকাদার মহলে গুঞ্জন রয়েছে।
২০২৫ সালে গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার পবনাপুর ইউনিয়ন পরিষদ থেকে হরিনাবাড়ী বাজার পর্যন্ত সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে চরম অনিয়ম, ভয়াবহ দুর্নীতি ও প্রকৌশলগত দায়িত্বে তার অবহেলার অভিযোগ উঠে। তৎকালীন রংপুর বিভাগীয় ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মুসাসহ নির্বাহী প্রকৌশলী উজ্জ্বল চৌধুরীকেও মৌখিকভাবে বিষয়টি অবহিত করা হলেও, প্রকল্প যাচাই বা বিল স্থগিতের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। উল্টো, নিরীক্ষাহীন অবস্থায় বিল ছাড় করার মাধ্যমে প্রকল্পটি দায়মুক্ত করে দেন মো. মুসা।
পতিত আওয়ামী আমলে তার ব্যাপক দাপট ছিল বলে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে ওপেন সিক্রেট ছিল। ২০২৩ সালে তৎকালীন ফ্যাসিস্ট আমলে আওয়ামী পৃষ্টপোষক চীফ ইন্জিনিয়ার আলী আখতার হোসেনের সহকারী প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করেন। তারপর সেখান এক্সএন প্রমোশন ভাগিয়ে তিনি চলে যান রংপুরে। তবে মো. মুসা প্রধান প্রকৌশলী আলী আখতার হোসেনের কাছের লোক হিসেবে এমজিএসপি (MGSP) হলো Municipal Governance and Services Project (মিউনিসিপ্যাল গভর্ন্যান্স অ্যান্ড সার্ভিসেস প্রজেক্ট), এর প্রকল্প পরিচালক হিসেবে কোটি কোটি টাকা কামিয়ে নেন। যেখানে তাকে সরাসরি সহযোগিতা করেন।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. আলি আখতার হোসেনের বিরুদ্ধে পিরোজপুরের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে কাজ না করে ১ হাজার ৭৯ কোটি ৪ লাখ ৯৩ হাজার ৮৩৯ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে যে তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন দুদক রংপুরের বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মুসার সেখানেও সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়াও ফ্যাসিস্ট আমলের প্রধান প্রকৌশলী আলী আখতার হোসেনের নিয়োগ, বদলি এবং কমিশন বাণিজ্যের প্রধান সেনাপতি হিসেবেও তিনি কাজ করেছেন।
সাড়ে ৩ কোটি টাকার ফ্ল্যাট ক্রয়ের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে, citypostbd.comকে রংপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ মুসা জানান, তিনি ব্যাংক লোনের মাধ্যমে তা কিনেছেন। কিন্তু কোন ব্যাংক থেকে লোন নিয়েছেন কিংবা কার নামে লোন নিয়েছেন তার কোনো তথ্য দিতে পারেননি।
এছাড়াও মোঃ মুসার বিরুদ্ধে উঠা দুর্নীতির নানান অভিযোগের বিষয়ে তাকে প্রশ্ন করা হলে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
এমনকি দুর্নীতির বিষয়ে হোয়াটসঅ্যাপে কয়েকটি প্রশ্নের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলেও কোনো উত্তর দেননি রংপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ মুসা।