সরকারি প্রকল্পের কোটি টাকার অনুদান লোপাটের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক:

প্রকল্প বাস্তবায়নে সম্পৃক্ত কর্মকর্তা তাঁর স্ত্রীর নামে ভুয়া প্রতিষ্ঠান দেখিয়ে অনুদানের অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। প্রাণিসম্পদ ও দুগ্ধজাত পণ্য (ডেইরি) উন্নয়নের জন্য নেওয়া একটি প্রকল্পে এ ঘটনা ঘটেছে। শুধু একটি ঘটনা নয়, প্রকল্পটিতে অনুদানের অর্থ ব্যবহারে আরও নানা ধরনের দুর্নীতির তথ্য পাওয়া গেছে। মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) কার্যালয়ের নিরীক্ষা (অডিট) প্রতিবেদনে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকারের প্রায় ৬৭ কোটি টাকার নিরীক্ষা আপত্তি দেওয়া হয়েছে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে প্রকল্পটিতে সুনির্দিষ্ট ১৭টি ক্ষেত্রে অনিয়ম ও দুর্নীতির আভাস পাওয়া গেছে। প্রকল্পটিতে অকেজো পাম্প মোটর কেনা, বেশি দামে গাড়ি ক্রয় এবং টেন্ডারে কারসাজি করে পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়া, ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে অনুদান বিতরণ করে টাকা আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

২০১৯ সালের মাঝামাঝি সময়ে ‘দ্য লাইভস্টক অ্যান্ড ডেইরি ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (এলডিডিপি)’ নামে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন শুরু হয়। বিশ্বব্যাংকের ৩ হাজার ৮৮৬ কোটি টাকা ঋণসহ প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হয় ৪ হাজার ২৮০ কোটি টাকা। কাজ ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত করা হয়। দেশের তিন পার্বত্য জেলা ছাড়া ৬১টি জেলার ৪৬৫টি উপজেলায় এর কার্যক্রম রয়েছে।

সিএজি কার্যালয় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ প্রকল্পের ব্যয়ের ওপর প্রাথমিক নিরীক্ষা করে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে। এতে অর্থ আত্মসাতে জড়িত কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা বা ব্যক্তিগত সম্পদ থেকে অর্থ আদায় করে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার সুপারিশ করেছে। প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রতিবেদনটি পাঠানো হয়েছে।

প্রকল্পের পরিচালক ড. মো. মোস্তফা কামাল বলেন, অডিটে যেসব অভিযোগ তোলা হয়েছে, সেগুলোর জবাব দেওয়া হচ্ছে। জবাবে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা না মিললে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে। তবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগগুলোর বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, অডিট প্রতিবেদনটি এখনও হাতে পৌঁছেনি। কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতি হয়ে থাকলে দায়ীদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রাণিজাত পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি, বাজার সংযোগ (মার্কেট লিংকেজ) ও ভ্যালু চেইন তৈরি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিদের জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা বৃদ্ধি, নিরাপদ প্রাণিজ খাদ্য উৎপাদন এবং বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে প্রাণিসম্পদ খাত তথা কৃষির টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জন ছিল প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, নিরীক্ষা প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণ ও প্রাক্কলিত আর্থিক ক্ষতি পুরোটাই সরাসরি দুর্নীতির চিত্র– এমনটি বলা কঠিন। এর কতটুকু আত্মসাৎ বা লোপাট হয়েছে, তা ফরেনসিক তদন্তসহ আরও গভীর অনুসন্ধানের মাধ্যমে নিরূপণ করে সুনির্দিষ্ট হিসাব বের করা এবং যথাযথ প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সরকার, দুদকসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব। তবে এ প্রতিবেদন প্রমাণ করে– উন্নয়নের নামে ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির মহোৎসব দেশে কতটা স্বাভাবিক চর্চায় পরিণত হয়েছে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা ১৭টি বিষয়ের মধ্যে দৈবচয়নের ভিত্তিতে মাঠ পর্যায়ে অনুসন্ধান করেছে। দুটি ক্ষেত্রেই অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

‘শনপাপড়ি মিঠাই ঘর’ এবং কর্মকর্তার জালিয়াতি
গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার সাবেক প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. ইউসুফ হাবিব প্রকল্পের ‘ম্যাচিং গ্র্যান্ট’ আত্মসাতের জন্য অভিনব কৌশল নেন। ম্যাচিং গ্র্যান্ট হলো খামারি ও ডেইরি খাতের উদ্যোক্তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নের জন্য দেওয়া আর্থিক অনুদান। অডিট রিপোর্টে বলা হয়েছে, তিনি তাঁর স্ত্রী কান্তার ‘শনপাপড়ি মিঠাই ঘর’ নামের এক প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ১২ লাখ ৪৫ হাজার টাকা অনুদান অনুমোদন করিয়ে নেন। এ বিষয়ে তাদের বক্তব্য নিতে গিয়ে জানতে পারে, তাদের মধ্যে ‘ডিভোর্স’ হয়ে গেছে।

অডিট দল সরেজমিনে তদন্তে দেখতে পায়, ‘শনপাপড়ি মিঠাই ঘর’ নামে বাস্তবে কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব নেই। একই সঙ্গে কান্তাও পেশাদার খামারি নন। অথচ প্রকল্পের নীতিমালা অনুযায়ী প্রকৃত খামারিদের আবেদন ও ব্যবসায়িক প্রস্তাব যাচাই-বাছাইয়ের ভিত্তিতেই অনুদান দেওয়ার কথা।

অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডা. ইউসুফ হাবিব নিজের পদমর্যাদা ও প্রভাব খাটিয়ে তথ্য গোপন করেন এবং স্ত্রীর মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করেন। এটি সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

কান্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রতিষ্ঠানটির অস্তিত্ব না থাকার বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি বলেন, ২০২৫ সালে তিনি ১২ লাখ ৪৫ হাজার টাকা অনুদান পেয়েছিলেন। তখন কালীগঞ্জ উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. ইউসুফ হাবিব তাঁর স্বামী ছিলেন। প্রতিষ্ঠানের নামে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তিনিই করেছিলেন। বাস্তবে কোনো প্রতিষ্ঠান ছিল না। অনুদানের টাকা প্রথমে তাঁর ব্যাংক হিসাবেই জমা হয়েছিল। পরে ডা. ইউসুফ নিজের হিসাবে নিয়ে নেন। তিনি আরও বলেন, ২০২৫ সালের নভেম্বরে একটি মিঠাই ঘর দেখিয়ে কিছু ছবি তোলা হয়। সেটি আসলে তাদের বাসাতেই করা হয়েছিল।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডা. ইউসুফ হাবিব বলেন, ‘প্রকল্পের নিয়ম মেনেই এ অনুদান অনুমোদন করা হয়। পরে তিনি দেখেছেন, কান্তা কিছু যন্ত্রপাতি কিনেছেন। তবে এখন তালাক হয়ে যাওয়ায় কান্তা মিথ্যা কথা বলছেন।’ উল্লেখ্য, ডা. ইউসুফ হাবিব বর্তমানে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা (লিভ, ডেপুটেশন অ্যান্ড ট্রেনিং রিজার্ভ পদ) হিসেবে দায়িত্বরত।

২০২৫ সালের ১৫ অক্টোবর সিএজি প্রতিনিধি দলের সরেজমিনে পরিদর্শনের সময় উপস্থিত ছিলেন গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. মাহমুদুল হাসান। যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, তিনি এমন কোনো প্রতিষ্ঠান দেখতে পাননি।

কান্তার নামে অনুদানের আবেদন থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত মুলগাঁও ও বাঘারপাড়া–এ দুটি ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে। পক্ষ থেকে দুটি এলাকাতেই সরেজমিনে ‘শনপাপড়ি মিঠাই ঘর’ নামে কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

অনুদানের যন্ত্রপাতির খোঁজ মিলল না
ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে ‘মেসার্স কেসি এগ্রো’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে ১ কোটি ৪৩ লাখ ৬৫ হাজার টাকা ম্যাচিং গ্র্যান্ট দেওয়া হয়েছে। তবে অনুদান পাওয়ার প্রয়োজনীয় যোগ্যতা প্রতিষ্ঠানটির ছিল না। ভুয়া পরিদর্শন প্রতিবেদন ও বিল-ভাউচার প্রত্যয়ন করে প্রতিষ্ঠানটির নামে অর্থ ছাড় করা হয়েছে।
সরেজমিনে তদন্তে দেখা গেছে, কেসি এগ্রোর নথিতে ফ্রিজার ভ্যান, দই তৈরির মেশিনসহ যেসব যন্ত্রপাতির উল্লেখ রয়েছে, বাস্তবে সেগুলোর কোনো অস্তিত্ব নেই। এমনকি প্রতিষ্ঠানটি ডিএমসিসি বা ডেইরি হাব স্থাপনের শর্তও পূরণ করেনি।

গাড়ি কেনায় অনিয়ম
প্রকল্পের সবচেয়ে বড় আর্থিক ক্ষতি হয়েছে নির্ধারিত দরের চেয়ে বেশি দামে গাড়ি কেনার মাধ্যমে। অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অর্থ বিভাগের নির্ধারিত দরের চেয়ে বেশি দামে ১১৫টি ডাবল কেবিন পিকআপ কেনায় সরকারের ৩৪ কোটি ৭২ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

শুল্ক, কর, রেজিস্ট্রেশনসহ আড়াই হাজার সিসির প্রতিটি ডাবল কেবিন পিকআপের দাম অর্থ বিভাগ নির্ধারণ করেছে ৫৬ লাখ ২০ হাজার টাকা। তবে প্রকল্পে প্রতিটি গাড়ি কেনা হয়েছে ৮৬ লাখ ৪০ হাজার টাকায়। প্রতিটি গাড়ির জন্য অনুমোদিত দামের তুলনায় ৩০ লাখ ২০ হাজার টাকা বেশি পরিশোধ করা হয়েছে।

পানির পাম্প কেনায় ১৭ কোটি টাকার অপচয়
নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী ব্যবহারযোগ্যতা যাচাই ছাড়াই ১৭ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ব্যয়ে শূন্য দশমিক ৫০ হর্সপাওয়ার ক্ষমতার ২৬ হাজার ৩২০টি ওয়াটার পাম্প কেনা ও বিতরণ করা হয়। সরেজমিনে দেখা গেছে, এসব পাম্পের অধিকাংশই কোনো কাজে আসছে না। কম ক্ষমতার কারণে এগুলোর মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন সম্ভব নয়। ফলে পাম্পগুলো অব্যবহৃত অবস্থায় আছে কিংবা নষ্ট হয়ে গেছে।

এ অনিয়ম বিষয়ে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ কোনো জবাব দেয়নি। তাই প্রকল্প পরিচালকের কাছ থেকে এ অর্থ আদায় করে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার সুপারিশ করেছে সিএজি কার্যালয়।

অন্যান্য অনিয়ম
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফিড ট্রলি, ল্যাকটোমিটারসহ বিভিন্ন সামগ্রী কেনার ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠান পুনম ট্রেড ইন্টারন্যাশনালকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বাদ দেওয়া হয়। পরিবর্তে উচ্চ দরদাতা প্রতিষ্ঠান জেনটেক্স-সেমেক্স জেভিকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। এর ফলে সরকারের ৪ কোটি ৬১ লাখ টাকা ক্ষতি হয়েছে।

টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলায় ‘মেসার্স মিনিস্টার ফিডস’ নামে একটি অযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে ২০ লাখ ৭৫ হাজার টাকা অনুদান দেওয়া হয়েছে। বাস্তবে এটি একটি গোডাউন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রকৃত ফিড উৎপাদনকারীদের বঞ্চিত করে এমন অযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে সরকারি অর্থ বরাদ্দ দেওয়ার মাধ্যমে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করে অন্য জানার সুযোগ দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *