ট্রাম্পের চাপ, বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র চুক্তি ও ইউক্রেন যুদ্ধের সমীকরণ

আন্তর্জাতিক ডেক্স :

তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় ভূরাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে শুরু হয়েছে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর দুই দিনব্যাপী শীর্ষ সম্মেলন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটে এবং জোটের ৩২টি সদস্য দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা এই বৈঠকে অংশ নিচ্ছেন। গতকাল মঙ্গলবার আঙ্কারার এসেনবোগা বিমানবন্দরে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে বহনকারী এয়ারফোর্স ওয়ান অবতরণের পর তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোয়ান ট্রাম্পকে স্বাগত জানান। এবারের সম্মেলনটি ন্যাটোর অভ্যন্তরীণ ঐক্য এবং ট্রান্স আটলান্টিক সম্পর্কের জন্য একটি বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সম্মেলনের আবহেই এক নাটকীয় মোড় নিয়েছে ইউক্রেন পরিস্থিতি। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে ফোনালাপের পর ট্রাম্প দাবি করেছেন, ‘আমরা ইউক্রেন যুদ্ধ সমাধানের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছি।’ তবে মাঠের বাস্তবতা ভিন্ন। সোমবার কিয়েভ ও আশপাশের এলাকায় রাশিয়ার ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় অন্তত ২৮ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। এর পর জেলেনস্কি আঙ্কারায় পৌঁছে ট্রাম্পের সঙ্গে জরুরি বৈঠকের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তিনি রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে ন্যাটোর কাছে জরুরি ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহের জোর দাবি জানাবেন।

প্রতিরক্ষা বাজেট নিয়ে ট্রাম্পের চাপ ও ন্যাটোর প্রতিক্রিয়া

দীর্ঘদিন ধরেই ট্রাম্প অভিযোগ করে আসছিলেন, ইউরোপীয় দেশগুলো নিজেদের প্রতিরক্ষায় পর্যাপ্ত খরচ না করে আমেরিকার ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করছে। ট্রাম্পের এই ক্ষোভ প্রশমিত করতে সম্মেলনের শুরুতেই ন্যাটোর ইউরোপীয় সদস্যরা বিলিয়ন ডলারের বিশাল সব অস্ত্র চুক্তির ঘোষণা দিতে শুরু করেছে। এর মধ্যে মার্কিন কোম্পানি নর্থরপ গ্রুমেন থেকে ড্রোন এবং সুইডেনের সাব এবি কোম্পানি থেকে যুদ্ধবিমান কেনার চুক্তি অন্যতম।

ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটে জানিয়েছেন, ট্রাম্পের জোরালো তাগিদ এবং রাশিয়ার আগ্রাসনের ভয়ে ২০২৫ সালে ন্যাটোর ইউরোপীয় সদস্য ও কানাডা সামরিক খাতে আগের বছরের চেয়ে ৯০ বিলিয়ন ডলার বেশি খরচ করেছে। এই ব্যয়ের পরিমাণ মোট ৫৭০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ট্রাম্প এখন চান ইউরোপ তার জিডিপির ৫ শতাংশ প্রতিরক্ষায় খরচ করুক। ইউরোপীয় সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে একটি শিল্পবিপ্লবের ডাক দিয়ে রুটে বলেন, ‘আমাদের হাতে সময় নষ্ট করার মতো বিলাসিতা নেই। রাশিয়ার বিশাল সামরিক ব্যয় এবং চীন, উত্তর কোরিয়া ও ইরানের হুমকির মুখে আমাদের এখনই সক্ষমতা বাড়াতে হবে। কারখানার যন্ত্রপাতির মৃদু আওয়াজকে এখন গর্জনে রূপ দিতে হবে।’

রাশিয়ার পাল্টা প্রচারণা ও ন্যাটোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ 

এদিকে রাশিয়া এই সম্মেলনকে ঘিরে নিজেদের প্রচারণা জোরদার করেছে। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ সরাসরি যুদ্ধ শব্দটি ব্যবহার করে বলেছেন, ‘এটি এখন একটি বাস্তব যুদ্ধ। কারণ, কিয়েভের পেছনে ওয়াশিংটন, বার্লিন, প্যারিস ও হেগ দাঁড়িয়ে আছে।’

বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেনীয় বাহিনীর ড্রোন হামলায় রাশিয়ার তেল শোধনাগার ধ্বংস হওয়া এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট থেকে জনগণের দৃষ্টি ঘোরাতেই এমন প্রচারণা চালানো হচ্ছে। পুতিন প্রশাসন দাবি করছে, তারা শুধু ইউক্রেন নয়, বরং পুরো ন্যাটোর বিরুদ্ধে লড়ছে।

তুরস্কের এফ-৩৫ সমীকরণ

এবারের সম্মেলনে মার্কিন-তুরস্ক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের দীর্ঘদিনের বরফ গলতে পারে। ২০১৯ সালে রাশিয়ার কাছ থেকে এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কেনার কারণে ওয়াশিংটন তুরস্ককে এফ-৩৫ আধুনিক যুদ্ধবিমান কর্মসূচি থেকে বাদ দিয়েছিল। রয়টার্সের সূত্রমতে, ট্রাম্প এবার এরদোয়ানকে পুনরায় এই যুদ্ধবিমান কর্মসূচিতে ফিরিয়ে নেওয়ার সবুজ সংকেত দিতে পারেন।

সাম্প্রতিক সময়ে ইরান সংকট এবং ইউরোপ থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের হুমকি নিয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে সদস্য দেশগুলোর টানাপোড়েন চলছে। তবে সম্মেলনের যৌথ ঘোষণায় ন্যাটোর মূল ভিত্তি আর্টিকেল ৫ (এক সদস্যের ওপর হামলা মানে সবার ওপর হামলা) এর প্রতি আবারও দৃঢ় প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা হবে। জোটের নেতারা ২০২৬ সালের জন্য ইউক্রেনকে আরও ৭০ বিলিয়ন ইউরোর সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়েও একমত হতে পারেন।

সংবাদটি শেয়ার করে অন্য জানার সুযোগ দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *