লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে রাখা যায়নি মূল্যস্ফীতি

নিজস্ব প্রতিবেদক:

সদ্য বিদায় নেওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৬৮ শতাংশে নেমেছে। গড় মূল্যস্ফীতির এ হার গত চার অর্থবছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। তবে সরকারের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়নি। গত অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার সময় গড় মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে রাখার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে এ লক্ষ্যমাত্রা ৭ শতাংশে পুনর্নির্ধারণ করা হয়।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতি সম্পর্কিত প্রতিবেদনটি গতকাল সোমবার প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে দেখা যায়, গড় মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি গত অর্থবছরের শেষ মাস জুনে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতিও কিছুটা কমেছে। জুনে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। মে মাসে যা ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। অবশ্য গত জুনে মূল্যস্ফীতির এ হার ছিল আগের অর্থবছরের একই মাসের চেয়ে বেশি। ওই মাসে এ হার ছিল ৮ দশমিক ৪৮ শতাংশ।

বিভিন্ন পণ্য ও সেবা বাবদ মানুষের খরচের হিসাবের ভিত্তিতে প্রতি মাসের ভোক্তা মূল্যসূচক (সিপিআই) তৈরি করে থাকে বিবিএস। এ জন্য মাঠ পর্যায় থেকে বিভিন্ন পণ্য ও সেবার দামের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে সংস্থাটি। এই সূচক আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কতটা বাড়ল, তার শতকরা হারই পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতি। এটির ১২ মাসের চলন্ত গড় হিসাব হচ্ছে বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি।

বিবিএসের প্রতিবেদন অনুসারে, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল দুই অঙ্কের ঘরে। গড় মূল্যস্ফীতি হয় ১০ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। এর আগে গড় মূল্যস্ফীতির হার ছিল ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৯ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে ৬ দশমিক ১৫ শতাংশ।

গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ মাস জুনে খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত দুই ক্ষেত্রেই পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমেছে। মাসটিতে খাদ্যে মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ৬০ শতাংশ, যা মে মাসে ছিল ৯ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ। জুনে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ৬১ শতাংশ। মে মাসে এটি ছিল ৯ দশমিক ৭১ শতাংশ।

পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে গত মাসে গ্রাম ও শহর দুই জায়গাতেই মূল্যস্ফীতির হার কমেছে। গ্রামে মূল্যস্ফীতির এ হার ছিল ৯ দশমিক ২৩ শতাংশ। আগের মাসে যা ছিল ৯ দশমিক ৪৮ শতাংশ। শহর এলাকায় গত জুনে মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ। মে মাসে যা ছিল ৯ দশমিক ২৫ শতাংশ।

গত জানুয়ারি মাস পর্যন্ত টানা তিন মাস মূল্যস্ফীতি বাড়তি প্রবণতার মধ্যে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয় গত ১৭ ফেব্রুয়ারি। ফেব্রুয়ারিতেও মূল্যস্ফীতি হয়। পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে বেড়ে দাঁড়ায় ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ, যা ছিল ১০ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। ফেব্রুয়ারিসহ টানা চার মাস মূল্যস্ফীতি হয়েছে। তবে নতুন সরকারের দায়িত্বকালে প্রথম পূর্ণ মাস মার্চে মূল্যস্ফীতি কমে আসে। ওই মাসে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয় ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। কিন্তু এই শুভ সূচনা ধরে রাখা যায়নি। পরের মাস এপ্রিলে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতি দাঁড়ায় ৯ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। সে ধারাবাহিকতায় মে মাসেও মূল্যস্ফীতি হয় ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। তবে জুন মাসে এসে তা কমেছে।

গত মাসে অর্থ মন্ত্রণালয় প্রকাশিত মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতিতে (২০২৬-২৭ থেকে ২০২৮-২৯) বলা হয়েছে, ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। এ সময়ে দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশে মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা কমে এলেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ পরিস্থিতি কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছেনি। সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, বিশেষত জ্বালানি ও আমদানি ব্যয় বাড়ার কারণে উৎপাদন ব্যয় ও মূল্যচাপ পুনরায় বাড়তে পারে। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা ও বাজার ব্যবস্থাপনার কাঠামোগত সমস্যার কারণে মূল্যস্তর দীর্ঘ সময় ঊর্ধ্বমুখী থাকতে পারে। সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় মূল্যস্ফীতি সাময়িকভাবে কমে এলেও নীতিনির্ধারকদের সতর্ক অবস্থান বজায় রাখতে হবে।

সংবাদটি শেয়ার করে অন্য জানার সুযোগ দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *