নিজস্ব প্রতিবেদক:
বরিশালের বাকেরগঞ্জ পৌরসভার একাউন্টেন্ট মো. আব্দুস সালাম মল্লিককে ঘিরে দুর্নীতি, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, ভুয়া বিল-ভাউচার, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং ব্যক্তিগত আচরণসংক্রান্ত বিভিন্ন অভিযোগ নিয়ে এলাকাজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। অভিযোগকারীদের দাবি, একজন সাধারণ ক্যাশিয়ার হিসেবে চাকরি শুরু করলেও অল্প সময়ের ব্যবধানে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন, যার উৎস নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় একাধিক সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, আব্দুস সালাম মল্লিক প্রথমে বাকেরগঞ্জ পৌরসভায় ক্যাশিয়ার হিসেবে যোগদান করেন। পরবর্তীতে তৎকালীন পৌর মেয়র লোকমান হোসেন ডাকুয়ার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে ধাপে ধাপে একাউন্টেন্ট পদে উন্নীত হন। অভিযোগ রয়েছে, ওই সময় থেকেই পৌরসভার আর্থিক কার্যক্রমে তার প্রভাব ক্রমশ বৃদ্ধি পায় এবং গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে তিনি প্রভাব বিস্তার করতে থাকেন।
অভিযোগকারীদের দাবি, বিগত সরকারের সময় রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে পৌরসভার আর্থিক ব্যবস্থাপনার ওপর কার্যত একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। এমনকি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (প্রশাসক) অধীনে পৌরসভা পরিচালিত হলেও তার প্রভাব অক্ষুণ্ন ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
টেন্ডার, কমিশন ও ভুয়া বিল-ভাউচারের অভিযোগ
স্থানীয় ঠিকাদার, সচেতন নাগরিক ও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অতিরিক্ত ব্যয় দেখানো, সরবরাহ বা কাজ সম্পন্ন না করেই বিল উত্তোলন, ভুয়া বিল-ভাউচার প্রস্তুত এবং ঠিকাদারদের কাছ থেকে কমিশন আদায়ের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে বিপুল অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের একটি সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়া এবং বিনিময়ে আর্থিক সুবিধা গ্রহণের ঘটনাও স্থানীয়ভাবে আলোচিত।
যদিও এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য সরকারি নথি এই প্রতিবেদকের হাতে আসেনি, তবে একাধিক সূত্র একই ধরনের অভিযোগ তুলে ধরেছে।
আয়ের সঙ্গে সম্পদের অসামঞ্জস্য?
স্থানীয়দের দাবি, সীমিত বেতনের সরকারি চাকরিজীবী হওয়া সত্ত্বেও আব্দুস সালাম মল্লিকের নামে ও পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ স্থাবর সম্পদ গড়ে উঠেছে।
স্থানীয়ভাবে আলোচিত তথ্যমতে, বাকেরগঞ্জ চৌমাথা সিনেমা হলের পেছনে একটি প্লট ক্রয় ও সেখানে ভবন নির্মাণের মাধ্যমে তার সম্পদ বৃদ্ধির সূচনা হয়। পরবর্তীতে হেলিপোর্ট সংলগ্ন এলাকায় প্রায় ১২ শতাংশ জমি, রোহিতারপাড় এলাকায় সিএনবি সড়কের পাশে প্রায় ২৮ শতাংশের একটি বাগানবাড়ি, বরিশাল সেনানিবাস সংলগ্ন এলাকায় একটি প্লট এবং বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেও জমি ক্রয়ের অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব সম্পদের মালিকানা, ক্রয়মূল্য এবং অর্থের উৎস সম্পর্কে সরকারি কোনো নথি এই প্রতিবেদকের হাতে আসেনি। বিষয়গুলো তদন্তসাপেক্ষ।
ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও আলোচনা
আব্দুস সালাম মল্লিকের ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও এলাকায় নানা আলোচনা রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রথম স্ত্রী জীবিত থাকা অবস্থায় তিনি বাকেরগঞ্জ পৌর স্বাস্থ্য বিভাগের স্বাস্থ্য সহকারী আইরিন আক্তার ছবিকে দ্বিতীয় বিয়ে করেন। এছাড়া দ্বিতীয় স্ত্রীর জন্য আলাদা বাসা ভাড়া করে রাখা এবং একাধিক নারীর সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের অভিযোগও স্থানীয়ভাবে প্রচলিত।
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য প্রমাণ এই প্রতিবেদকের হাতে নেই। তাই বিষয়গুলোকে অভিযোগ হিসেবেই দেখা উচিত।
বক্তব্য পাওয়া যায়নি
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য মো. আব্দুস সালাম মল্লিকের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তার বক্তব্য এই প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি।
ভবিষ্যতে তিনি বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা বা বক্তব্য দিলে তা গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে।
তদন্তের দাবি
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, একজন সরকারি কর্মচারীর ঘোষিত আয় ও বাস্তব সম্পদের মধ্যে অসামঞ্জস্য দেখা দিলে তা যাচাই করা সংশ্লিষ্ট সংস্থার দায়িত্ব। তাদের দাবি, অভিযোগগুলোর বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকেও যথাযথভাবে অব্যাহতি দেওয়া প্রয়োজন।
জনমনে প্রশ্ন
বাকেরগঞ্জের সাধারণ মানুষের মুখে এখন একটি প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে—একজন পৌরসভার কর্মকর্তা কীভাবে স্বল্প সময়ে বিপুল সম্পদের মালিক হলেন? টেন্ডার, বিল-ভাউচার ও আর্থিক লেনদেনের আড়ালে কোনো সংঘবদ্ধ দুর্নীতির চক্র সক্রিয় ছিল কি না, সেটিই এখন সংশ্লিষ্টদের অনুসন্ধান ও সম্ভাব্য তদন্তের প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে।