নিজস্ব প্রতিবেদক :
গণপূর্ত অধিদফতরের সম্পদ বিভাগ-এলেনবাড়িতে সরকারি বাসভবন সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের নামে বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন নির্বাহী প্রকৌশলী শফিউল ইসলাম ও তার ঘনিষ্ঠ একটি প্রকৌশলী-ঠিকাদার সিন্ডিকেট। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাস্তবে কাজ না করেই ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে প্রায় ৮ কোটি টাকা উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে এই চক্রের বিরুদ্ধে। টাইমস টুডের হাতে আসা নথিতে ভুয়া বিল উত্তোলন, কমিশন বাণিজ্য এবং ই-জিপি টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়মের চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
তথ্য বলছে, বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে পাবনা অঞ্চলের সাবেক এক শীর্ষ ব্যক্তির প্রভাব খাটিয়ে এলেনবাড়িতে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেন নির্বাহী প্রকৌশলী শফিউল। ২০২৪ এর আগস্ট পরবর্তী পরিস্থিতি বদলে চাকরি ও বলয় বাড়াতে ভোল পাল্টে নতুন বন্দোবস্তে নেমেছেন এই কর্মকর্তা। সহযোগী বাহিনী ও ঠিকাদাররা মিলে কমিশন বাণিজ্য ও টেন্ডার নিয়ন্ত্রণে হয়ে উঠেছেন ফের তৎপর। এ ছাড়া, এই সিন্ডিকেটে সহযোগী হিসেবে সহকারী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম ও উপ-সহকারী প্রকৌশলী সুশান্ত দত্তসহ প্রভাবশালী সিন্ডিকেটে কলকাঠি নাড়ছেন নির্বাহী প্রকৌশলী শফিউল।
প্রাপ্ত সূত্র বলছে, গণপূর্ত অধিদফতরের সম্পদ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর শফিউল ইসলামকে কেন্দ্র করে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী কিছু ঠিকাদারের সঙ্গে গোপন আঁতাতের মাধ্যমে ত্রুটিপূর্ণ কাজ, ভুয়া বিল-ভাউচার এবং কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে এই চক্র।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, নির্বাহী প্রকৌশলী শফিউল ইসলামের সঙ্গে সহকারী প্রকৌশলী ও স্টাফ অফিসার শরিফুল ইসলাম এবং উপ-সহকারী প্রকৌশলী সুশান্ত দত্তের যোগসাজশে সাধারণ ঠিকাদাররা কার্যত জিম্মি হয়ে পড়েছেন। অনেক ঠিকাদারের দাবি, নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের সুবিধা দিতে টেন্ডার প্রক্রিয়া প্রভাবিত করা, কাজের মান উপেক্ষা করা এবং বিল পাসে কমিশন নেওয়ার মতো অনিয়ম নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রভাব খাটিয়ে একচেটিয়া কাজ বাগিয়ে নেওয়া কয়েকজন ঠিকাদার নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে তৎপর। সাধারণ ও পেশাদার ঠিকাদারদের অভিযোগ, এলেনবাড়ি ঘিরে গড়ে ওঠা এই লুটপাটের বলয়ে শফিউল ইসলামের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কয়েকজন ঠিকাদার এখনও সক্রিয়। তাদের মধ্যে সদ্য সাবেক এক প্রভাবশালী মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিরাও রয়েছেন।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪-২৫ এবং সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সংস্কারের নামে প্রায় ৮ কোটি টাকা লোপাট হয়েছে মূলত তিনটি খাত থেকে। এরমধ্যে- ভিআইপি বাসভবন মেরামত খাতে ৩ কোটি ২০ লাখ টাকা। যার অধিকাংশ ভবনে সামান্য চুনকাম বা কোনো কাজ না করেই পুরো বিল উত্তোলন। আসবাবপত্র সরবরাহ খাতে ২ কোটি ১০ লাখ টাকা যা পুরাতন আসবাবপত্রকে নতুন দেখিয়ে ভুয়া কাগজের মাধ্যমে অর্থ গায়েব। এবং কোয়ার্টার সংস্কারে ২ কোটি ৭০ লাখ টাকা, যা এলেনবাড়ি ১ ও ২ নম্বর ভবনের মেরামতের নামে পুরো বিল।
বাস্তবে কাজের চিত্র কত করুণ, তার প্রমাণ মেলে ১ নম্বর ভবনে বসবাসরত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কথায়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, গত দুই বছরে এই ভবনে কোনো সংস্কারই হয়নি। অথচ শুনছি, কাগজে-কলমে বড় বাজেট পাস দেখিয়ে বিল তুলে নেওয়া হয়েছে। এটি স্রেফ ডাকাতি।
এদিকে, শুধু ভুয়া বিল নয়, নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিতে ই-জিপি টেন্ডারেও চলছে নজিরবিহীন কারসাজি। সম্প্রতি আহ্বান করা দুটি টেন্ডার নিয়ে ক্ষোভে ফুঁসছেন সাধারণ ঠিকাদাররা। অভিযোগ রয়েছে, সুইমিং পুল মেরামতের একটি টেন্ডারে এমন কিছু অদ্ভুত ও কাল্পনিক শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে, যা কেবল নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানের নেই । একইভাবে আউটসোর্সিং জনবল নিয়োগের আরেকটি টেন্ডারে গোপনীয় প্রাক্কলন ও শর্ত আগেই পছন্দের ঠিকাদারের কাছে ফাঁস করে দেওয়া হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঠিকাদার বলেন, শর্তগুলো এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যেন আগেই ঠিক করা ছিল কাজটা কে পাবে। আমরা শুধু চেয়ে চেয়ে দেখেছি, টেন্ডারে অংশ নেওয়ার কোনো সুযোগই আমাদের রাখা হয়নি।
সংশ্লিষ্ট দফতরে গুঞ্জন রয়েছে, সরকারি অর্থ লোপাটের টাকায় রাজধানীর ধানমন্ডি ১২/এ নম্বর রোডে কয়েক কোটি টাকা মূল্যের একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কিনেছেন নির্বাহী প্রকৌশলী শফিউল ইসলাম। সেখানে তিনি পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন বলেও দাবি করেছেন একাধিক সূত্র। একজন সরকারি কর্মকর্তার বৈধ আয়ের সঙ্গে এমন জীবনযাত্রার অসংগতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) বেনামে লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে বলে একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র টাইমস টুডেকে নিশ্চিত করেছে।
টেন্ডার কারসাজি, ভুয়া বিল-ভাউচার ও প্রায় ৮ কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ নিয়ে ঠিকাদারদের মধ্যে ক্ষোভ থাকলেও গণপূর্ত অধিদফতরের শীর্ষ পর্যায়ের নীরবতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এত সুনির্দিষ্ট অভিযোগের পরও দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা না নেওয়ায় অভিযুক্ত চক্র আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
অভিযোগের বিষয়ে শরিফুল বলেন, বিস্তারিত স্যার বলবেন। তার বিরুদ্ধে সিন্ডিকেটের বিষয়ে বলতেই তিনি রেগে যান। কোনো কথাই বলবো না বলে উঠে গিয়ে এটুকু বলেন, স্যার ভবনে গিয়েছেন তার সাথে বোঝেন! পরবর্তীতে শফিউলের হোয়াটসঅ্যাপে কয়েকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি সাড়া দেননি।
এ বিষয়ে প্রধান প্রকৌশলীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন ধরেননি।