মাটি কাটা বন্ধ, বৃক্ষরোপণের সিদ্ধান্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক :

নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার আলীগঞ্জে পদ্মা রেল সেতুর পিলারের নিচ থেকে মাটি কেটে নেওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসন মাটি কাটা বন্ধ করে দেয়। তবে চুক্তি অনুযায়ী মাটি কাটা হচ্ছিল বলে প্রশাসনকে জানিয়েছে সেতু নির্মাণকারী চীনের প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টরা। গতকাল মঙ্গলবার জেলা প্রশাসক জানান, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় থেকে একটি ঘোষণা এসেছে, এই মাটি কাটা যাবে না। এখানে বৃক্ষরোপণ করা হবে।

স্থানীয়রা জানান, পদ্মা রেল সেতুর উড়াল অংশ নারায়ণগঞ্জের আলীগঞ্জের ওপর দিয়ে গেছে। এর ৭৬ থেকে ৯০ নম্বর পিলার পাগলার আলীগঞ্জে পড়েছে। গত ১৩ জুন ৮৬ থেকে ৯০ নম্বর পিলারের মধ্যবর্তী অংশে বিশাল কাটিং কার দিয়ে মাটি কাটা শুরু করে চীনা কোম্পানি নিয়োজিত লোকজন। ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, স্থানীয় এক যুবদল নেতার কয়েক সমর্থক সেখানে গিয়ে মাটি কাটার অনুমতি আছে কিনা জানতে চান। কোম্পানির লোকজন অনুমতির কাগজ দেখিয়ে মাটি কাটতে থাকেন।
ওই দিনই বিকেলে ইউএনও সেখানে ফতুল্লার সহকারী কমিশনার (ভূমি) আসাদুজ্জামানকে পাঠান। আসাদুজ্জামান জানান, সেতুটি রেলওয়ের হলেও প্রকল্পটির দায়িত্বে রয়েছে সেনাবাহিনী। যারা মাটি কেটে নিচ্ছেন তারা জানিয়েছেন, সেতুর নির্মাণকারী সংস্থার কাছ থেকে মাটি কাটার ওয়ার্ক অর্ডার পেয়েছেন তারা। তিনি বলেন, মাটি অপসারণ এই প্রকল্পের কাজেরই অংশ। তবে বিতর্ক সৃষ্টি হওয়ায় আপাতত কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশনা দিয়ে আসি।
বাংলাদেশ রেলওয়ের ঢাকা বিভাগের বিভাগীয় ভূসম্পত্তি কর্মকর্তা শিমুল কুমার সাহা বলেন, বাংলাদেশ রেলওয়ে এমন মাটি কাটার অনুমোদন দেয় না। এটা কে, কেন করল তা সংশ্লিষ্ট প্রজেক্টের লোকজন বলতে পারবেন।

পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের উপপরিচালক আমিনুল করিম বলেন, ফতুল্লার আলীগঞ্জে পদ্মা রেল সেতুর পিলারের নিচ থেকে মাটি কাটা হচ্ছে। ৭৬ থেকে ৯০ নম্বর পিলার পর্যন্ত প্রায় ৬০০ মিটার দৈর্ঘ্যের এই জায়গার অধিকাংশ আগে বিল বা জলাশয় ছিল। চায়না রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানির কনট্রাক্টর মাটি বা বালু দিয়ে স্থানটি ভরাট করে ভায়াডাক্ট নির্মাণ করে। সেতুর পিলার বা ভায়াডাক্ট নির্মাণের আগে জায়গাটি ছিল জলাশয়। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় আমরা আবার মাটি কেটে জলাশয় ফিরিয়ে দিয়েছি। কেরানীগঞ্জেও একইভাবে জলাশয় ভরাট করতে হয়েছিল নির্মাণ কাজের জন্য। পরে আবার কাজ শেষে সেখানে জলাশয় করা হয়েছে। চীনা কোম্পানির সঙ্গে এটিই চুক্তি ছিল। মাটি সরালেও পদ্মা সেতুর পিলারের কোনো ক্ষতি হবে না। পরিকল্পিতভাবেই মাটি সরিয়ে আবার জলাশয় ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছিল।
আগে জলাশয় থাকলেও ভরাটের পর বর্তমানে স্থানীয়রা জায়গাটি রাস্তা হিসেবে ব্যবহার করছেন। তাই এটি রাস্তা হিসেবেই রাখার দাবি জানান স্থানীয় কুতুবপুর ইউনিয়ন চেয়ারম্যান মনিরুল আলম সেন্টু। তিনি বলেন, পদ্মা সেতু করার সময় এটি ভরাট করা হয়। ফলে এটি এখন আলীগঞ্জ থেকে ফতুল্লা ও পাগলায় যাতায়াতের রাস্তায় পরিণত হয়েছে। তাই এটি না কেটে বরং সুন্দর রাস্তা বানিয়ে দুই পাশে গাছ লাগিয়ে দৃষ্টিনন্দন করা যায়।

নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির জানান, কেউ কেউ লিখছে- মাটি কাটা হচ্ছে। আসলে তা নয়। মাটি একদিনই কাটা হয়েছে। সেটা ১৩ জুন। ওইদিন বিকেলেই আমরা এটা বন্ধ করে দিয়েছি। তাদের কাগজপত্র নিয়ে আসতে বলেছি। কার কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে, কাকে জানিয়ে তারা মাটি কাটছে জানতে চেয়েছি। তারা আমাদের জানিয়েছে, রেল সেতুর ভায়াডাক্ট বসানোর জন্য তারা নিচে মাটি ফেলে জায়গা উঁচু করেছিল। এখন কাজ শেষ, তাই সে মাটি সরিয়ে নিচ্ছে। এই সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি তাদের চুক্তির মধ্যে রয়েছে। এটি তারা এতদিন করেনি, এখন করছে। আমরা তাদের বলেছি, মাটি সরালে তো সেতুর ক্ষতিও হতে পারে। এ ছাড়া মাটি সরাতে জেলা প্রশাসনের কাছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়ে অনুমতি নিতে হবে। তবে এর মধ্যেই সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় থেকে একটি ঘোষণা এসেছে, এই মাটি কাটা যাবে না। এখানে বৃক্ষরোপণ করা হবে।
গতকাল সচিবালয়ে পিলারের নিচের মাটি কাটা প্রসঙ্গে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, মাটি খুঁড়ে নেওয়া হয়েছে বিষয়টা এ রকম না। ওখানে সেতু হয়েছে। কিছু প্রতিবন্ধকতা রাখা হয়, ছোট ছোট ব্যারিয়ার তৈরি করা হয়। সেখান থেকে প্রয়োজনে মাটি সরানো হয়েছিল। এটা কনস্ট্রাকশনের অংশ হিসেবে থাকে। কিন্তু দীর্ঘদিন তা সরানো হয়নি। একটু উঁচু হওয়ায় ওখান থেকে মই দিয়ে কিছু কিছু জিনিস চুরি হয়েছে বা হওয়ার উপক্রম হয়েছে। ফলে সার্বিক বিবেচনায় মাটি সরানো হয়েছিল। অতিরিক্ত মাটি ছিল প্রতিবন্ধক তৈরির জন্য। কনস্ট্রাকশন কাজের সহায়ক হিসেবে।

সংবাদটি শেয়ার করে অন্য জানার সুযোগ দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *