নিজস্ব প্রতিবেদক :
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলার আসামি হওয়ার পরও রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্রধান স্থপতি মোস্তাক আহমদ বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করছেন। ভূমি অনুমোদনে জালিয়াতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অবৈধ সুবিধা দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগে মামলা হওয়ার পরও তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা না নেওয়ায় রাজউকের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তৎকালীন গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী রেজাউল করিমের রাজনৈতিক আশীর্বাদে রাজউকে প্রভাবশালী অবস্থান তৈরি করেন মোস্তাক আহমদ। মন্ত্রীর নিজ এলাকা পিরোজপুরের বাসিন্দা হওয়ায় তিনি
বিশেষ সুবিধা পান এবং গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয়কে কাজে লাগান বলে অভিযোগ রয়েছে।
রাজউকের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “একই দপ্তরে এত দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকার পেছনে মূল শক্তি ছিল রাজনৈতিক পরিচয়। আগে মন্ত্রীর পরিচয়ে চলতেন, এখন আবার নতুন ক্ষমতাকেন্দ্রের আশ্রয়ে রয়েছেন। ফলে তার বিরুদ্ধে কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পান না।”
অভিযোগ রয়েছে, পটপরিবর্তনের পরও ক্ষমতার বলয় পরিবর্তন হলেও মোস্তাক আহমদের অবস্থানের তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। বরং নতুন প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলে তিনি নিজের অবস্থান অক্ষুণ্ণ
রেখেছেন। রাজউকের অভ্যন্তরে একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে প্রভাব খাটানোর অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
দুদকের মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১১ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে দায়িত্ব পালনের সময় তিনি একটি বেসরকারি হাউজিং প্রতিষ্ঠানের জন্য নিয়মবহির্ভূতভাবে ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র, বিশেষ প্রকল্প অনুমোদন ও নির্মাণ অনুমতি প্রদানে ভূমিকা রাখেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, জমির মালিকানা, দাগ, খতিয়ান কিংবা বাস্তব অবস্থা যাচাই ছাড়াই এসব অনুমোদন দেওয়া হয়, যা সরকারি নীতিমালা ও দায়িত্ব পালনের বিধান লঙ্ঘনের শামিল।
মামলায় আরও অভিযোগ করা
হয়েছে, জালিয়াতি, পরস্পর যোগসাজশ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে অবৈধ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় দণ্ডবিধির একাধিক ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনে মামলা দায়ের করেছে দুদক।
এদিকে রাজউক চেয়ারম্যানের সরকারি বাসভবন সংস্কারকাজ নিয়েও নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের তদন্তে উঠে এসেছে, উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়াই সংস্কারকাজ শুরু করা হয় এবং কাজের অধিকাংশ সম্পন্ন হওয়ার পর আনুষ্ঠানিক দরপত্রের আয়োজন করা হয়। তদন্ত প্রতিবেদনে এ প্রক্রিয়াকে নিয়মবহির্ভূত ও প্রহসনমূলক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্তে আরও দেখা যায়, প্রাথমিকভাবে প্রায় ৩০ লাখ টাকার প্রকল্পের ব্যয় শেষ পর্যন্ত ২ কোটি ১৬ লাখ টাকায় উন্নীত হয়। ব্যয়ের এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং অনুমোদন
প্রক্রিয়ায় অসঙ্গতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে তদন্ত কমিটি। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ ধরনের ঘটনা শুধু আর্থিক অনিয়ম নয়, বরং সরকারি প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতারও প্রতিফলন।
প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীর উন্নয়ন পরিকল্পনা, ভবন নির্মাণ অনুমোদন এবং ভূমি ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে দায়িত্ব পালনকারী একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা থাকা অবস্থায় তার দায়িত্বে বহাল থাকা জনআস্থার জন্য নেতিবাচক বার্তা বহন করে। তারা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, দায় নিরূপণ এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, মোস্তাক আহমদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর পূর্ণাঙ্গ তদন্ত সম্পন্ন হলে শুধু একজন কর্মকর্তার দায়-দায়িত্বই নয়, বরং রাজউকের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা প্রভাবশালী সিন্ডিকেট, অনুমোদন বাণিজ্য এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের বিস্তৃত চিত্রও সামনে আসতে পারে। ফলে এই মামলার অগ্রগতি এখন রাজউকের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।