নিজস্ব প্রতিবেদক :
রাজধানীর আজিমপুরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নির্মাণাধীন আবাসন প্রকল্পকে ঘিরে দুর্নীতি, কমিশন বাণিজ্য, টেন্ডার কারসাজি, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার এবং বিদেশে অর্থ পাচারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। গণপূর্ত অধিদপ্তরের আজিমপুর বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল হালিম ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ইলিয়াস আহমেদকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগপত্র, প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট নথি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং মাঠপর্যায়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রায় ৭৭৪ কোটি ৫৯ লাখ টাকার আবাসন প্রকল্পটি শুরু থেকেই নানা প্রশ্নের মুখে। অভিযোগ
রয়েছে, প্রকল্পের টেন্ডার
প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে বিল পরিশোধ, উপকরণ ক্রয়, শ্রমিক নিয়োগ এবং সম্পদ নিলাম প্রতিটি ধাপেই একটি সংঘবদ্ধ চক্র প্রভাব বিস্তার করেছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্পে কাজ পাওয়া ঠিকাদারদের কাছ থেকে নিয়মিত কমিশন নেওয়া হয়েছে এবং সেই কমিশনের হার অতীতের তুলনায় দ্বিগুণ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
দুদকে দেওয়া অভিযোগে বলা হয়েছে, নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর ফয়সাল হালিম ঠিকাদারদের কাছ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নেওয়ার একটি অলিখিত ব্যবস্থা চালু করেন। এস্টিমেট প্রণয়ন, চুক্তি সম্পাদন এবং বিল ছাড় প্রতিটি ধাপেই কমিশন আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আহবান করা ১১০টি দরপত্রে সীমিত সংখ্যক ঠিকাদারকে অংশগ্রহণের সুযো প্রতিযোগিতা নিয়ন্ত্রণের অভিযোগও উঠেছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, প্রকল্পে ব্যবহৃত লিফট, জেনারেটর ও ফায়ার ফাইটিং সরঞ্জাম ক্রয়ের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডকে সুবিধা দিতে বাজারদরের চেয়ে অনেক বেশি মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এই খাতেই প্রায় ১২০ কোটি টাকার একটি অস্বচ্ছ আর্থিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে। এছাড়া ৮৩৬টি আবাসিক ফ্ল্যাটের ফিনিশিং কাজে নিম্নমানের টাইলস ও স্যানিটারি সামগ্রী ব্যবহার করে বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও তদন্তের আওতায় এসেছে।
অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অর্থ পাচার। অভিযোগকারীদের দাবি, কমিশন ও অনিয়মের মাধ্যমে অর্জিত অর্থের একটি অংশ বিদেশে পাচারের চেষ্টা করা হয়েছে। দুদকে জমা দেওয়া নথিতে প্রায় ২৮ কোটি টাকা পাচারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীরা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ব্যাংক হিসাব জব্দ ও আর্থিক লেনদেন তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
প্রকল্পের অগ্রগতিও প্রশ্নের মুখে। ২০১৯ সালে শুরু হওয়া প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার বৃহৎ আবাসন প্রকল্পটি ২০২১ সালে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও একাধিকবার সময় বাড়ানোর পরও এখনো সম্পূর্ণ হয়নি। প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ অর্থের অধিকাংশ ব্যয় হলেও বাস্তব অগ্রগতি নিয়ে রয়েছে ভিন্নমত। সরকারি নথিতে অগ্রগতি ৮০ শতাংশের কাছাকাছি দেখানো হলেও প্রকৌশলীদের একটি অংশের দাবি, বাস্তবে কাজের অগ্রগতি আরও কম।
এদিকে অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পে ভুয়া শ্রমিক দেখিয়ে নিয়মিত অর্থ উত্তোলন করা হচ্ছে। মাস্টাররোলভুক্ত অনেক শ্রমিকের অস্তিত্বই নেই বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
এছাড়া আরএফকিউ পদ্ধতিতে কেনাকাটার ক্ষেত্রেও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগও রয়েছে। প্রকল্পের অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন তোলায় কয়েকজন কর্মকর্তা হুমকির মুখে পড়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল হালিমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে। তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নজরুল ইসলাম বলেন, অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে সরকারের অবস্থান কঠোর। প্রকল্পের ব্যয় ও বাস্তবায়নসংক্রান্ত বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে। কোনো অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।দুদকের তদন্ত এখন এই অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে দেশের অন্যতম বৃহৎ সরকারি আবাসন প্রকল্পে সংঘটিত অনিয়ম ও দুর্নীতির একটি বড় চিত্র সামনে আসতে পারে। আর অভিযোগ মিথ্যা হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আইনি ও প্রশাসনিকভাবে দায়মুক্তি পাবেন। ফলে এখন নজর তদন্তের ফলাফলের দিকে।