নিজস্ব প্রতিবেদক :
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি ও পদায়নকে কেন্দ্র করে এক চরম অনিয়ম ও রাতারাতি সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। ঢাকা মেট্রো সার্কেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্টেশন থেকে মফস্বলে বদলির মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে, মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের বিনিময়ে সেই আদেশ সম্পূর্ণ বাতিল করার অভিযোগ উঠেছে বিআরটিএ-র প্রশাসন শাখার বিরুদ্ধে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, গত ১২ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে জারি করা একটি ব্যাপক রদবদলের আদেশ, কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই পরদিন অর্থাৎ ১৩ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে সম্পূর্ণ বাতিল ঘোষণা করা হয়। এই ‘বদলি ও বাতিল’ নাটকের নেপথ্যে প্রায় অর্ধকোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্য হয়েছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে গেছে।
২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে যা ঘটেছিল
নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত ১২ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিআরটিএ সদর কার্যালয়ের প্রশাসন শাখা থেকে উপপরিচালক (প্রশাসন) তানভীর আহমেদ সিদ্দিকী স্বাক্ষরিত একটি অফিস আদেশ (স্মারক নং-৩৫.০৩.০০০০.০০০.০০১.১৯.০১০৮.২৫-৭৭৭) জারি করা হয়।
ঐ আদেশে বিআরটিএ-র ৫ জন প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তাকে (৪ জন সহকারী পরিচালক এবং ১ জন মোটরযান পরিদর্শক) ঢাকার ‘ক্লিন স্টেশন’ থেকে ঢাকার বাইরে মফস্বল জেলাগুলোতে বদলি করা হয়েছিল। বদলিকৃত কর্মকর্তারা হলেন:
১. মোঃ রিয়াজুল ইসলাম (সহকারী পরিচালক, ইঞ্জি:): ঢাকা মেট্রো-১ সার্কেল থেকে ঝালকাঠি সার্কেল।
২. জনাব পলাশ খীসা
(সহকারী পরিচালক, ইঞ্জি:)**: ফরিদপুর সার্কেল থেকে ঢাকা মেট্রো-১ সার্কেল।
৩. জনাব জিয়াউর রহমান (সহকারী পরিচালক, ইঞ্জি:): ঢাকা মেট্রো-১ সার্কেল থেকে বগুড়া সার্কেল।
৪. জনাব মোহাম্মদ হারুন উর রশিদ (সহকারী পরিচালক, ইঞ্জি:): ঢাকা মেট্রো-৩ সার্কেল থেকে ঢাকা মেট্রো-১ সার্কেল।
৫. জনাব লাভলু সিকদার (মোটরযান পরিদর্শক): ঢাকা মেট্রো-১ সার্কেল থেকে বাগেরহাট সার্কেল।
আদেশে স্পষ্ট উল্লেখ ছিল, জনস্বার্থে জারিকৃত এই আদেশ অনুযায়ী কর্মকর্তাদের আগামী ১৯ এপ্রিল ২০২৬ তারিখের মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগদান করতে হবে, অন্যথায় ২০ এপ্রিল তারা তাৎক্ষণিক অবমুক্ত (রিলিজ) বলে গণ্য হবেন।
‘ম্যাজিক’ আদেশ: ২৪ ঘণ্টা না
পেরোতেই ভোলবদল
১২ এপ্রিলের বদলি আদেশের পরদিনই, অর্থাৎ ১৩ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিআরটিএ সদর কার্যালয় থেকে আরেকটি নাটকীয় অফিস আদেশ জারি করা হয় (স্মারক নং-৩৫.০৩.০০০০.০০০.০০১.১৯.০১০৮.২৫-৭৯৫)। পূর্বের আদেশের মতো এই আদেশেও স্বাক্ষর করেন একই কর্মকর্তা, তানভীর আহমেদ সিদ্দিকী।
মাত্র এক লাইনের এই নতুন আদেশে বলা হয়:
“বিআরটিএ সদর কার্যালয়ের ১২.০৪.২০২৬খ্রি:
তারিখের
৩৫.০৩.০০০০.০০০.০০১.১৯.০১০৮.২৫-৭৭৭নং
স্মারকের বদলি সংক্রান্ত অফিস আদেশটি এতদ্দ্বারা বাতিল করা হলো।”
জনস্বার্থে জারি করা একটি
আদেশ মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে কোন “বিশেষ জনস্বার্থে” বাতিল করতে হলো, সে বিষয়ে অফিস আদেশে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
নেপথ্যে অর্ধকোটি টাকার মিশন!
বিআরটিএ সদর কার্যালয়ের একাধিক গোপন সূত্র এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা মেট্রো-১ সার্কেলের মতো লাভজনক ও প্রভাবশালি কর্মস্থল থেকে একযোগে কর্মকর্তাদের ঢাকার বাইরে প্রত্যন্ত অঞ্চলে বদলি করায় সংশ্লিষ্ট সিন্ডিকেটটি চরম বেকায়দায় পড়ে। বদলি ঠেকাতে ১২ এপ্রিল রাতেই প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাথে তদবির ও সমঝোতা বৈঠক শুরু হয়।
অভিযোগ উঠেছে, ঢাকা মেট্রো-১ সার্কেল থেকে বদলি হওয়া কর্মকর্তাদের ঢাকাতেই রেখে দেওয়া এবং মফস্বল থেকে ঢাকায় আসার আদেশ হওয়া কর্মকর্তাদের যোগদান রাতেই প্রায় অর্ধকোটি
৫০ লাখ) টাকার একটি তহবিল গঠন করা হয়। এই বিপুল অঙ্কের টাকা বিআরটিএ-র প্রশাসন শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তানভীর আহমেদ সিদ্দিকীসহ সংশ্লিষ্ট একটি প্রভাবশালী মহলের কাছে পৌঁছানোর পরপরই পরদিন সকাল সকাল সম্পূর্ণ বদলি প্রক্রিয়াটি বাতিলের ফাইল অনুমোদন পায়।
প্রশাসনিক অসঙ্গতি ও প্রশ্নাবলি
এই দুটি আদেশের বিশ্লেষণ থেকে বেশ কিছু গুরুতর প্রশাসনিক অসঙ্গতি ও প্রশ্ন সামনে এসেছে: স্বার্থের সংঘাত ও দ্বৈত ভূমিকা:** আদেশ প্রদানকারী কর্মকর্তা তানভীর আহমেদ সিদ্দিকী একই সাথে উপপরিচালক (অর্থ) [অতিরিক্ত দায়িত্বে] এবং উপপরিচালক (প্রশাসন) (প্রতিকল্প) হিসেবে কাজ করছেন। প্রশাসন ও অর্থ শাখার মতো দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ একই ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে থাকায় এই ধরণের আর্থিক অনিয়ম ঢাকা দেওয় হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত:
সরকারি কোনো বদলি আদেশ জারি করার পর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তা বাতিল করা অত্যন্ত নজিরবিহীন। কোনো প্রশাসনিক বা আইনি জটিলতা ছাড়া এমন ইউ-টার্ন সরাসরি আর্থিক লেনদেনের দিকেই আঙুল তোলে। তবে এই বদলি এবং বাতিলের আদেশ ওয়েব সাইটসহ সকলস্থান থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে।
ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অবগতি
উল্লেখ্য, ১৩ এপ্রিলের বাতিল আদেশের অনুলিপি সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সচিব এবং বিআরটিএ চেয়ারম্যানের একান্ত সচিবসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সকল দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এই নজিরবিহীন ও সন্দেহজনক বাতিলের পেছনে প্রকৃত কারণ খতিয়ে দেখতে উচ্চপর্যায়ের কোনো তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে কিনা, তা এখনো জানা যায়নি।
বিআরটিএ-র সাধারণ কর্মকর্তা ও সেবাগ্রহীতাদের দাবি, সরকারি একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাকে দুর্নীতিমুক্ত করতে এবং এই বদলি বাণিজ্যের সাথে জড়িত মূল হোতাদের চিহ্নিত করতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একটি নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া জরুরি।
এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে উপপরিচালক (প্রশাসন) তানভীর আহমেদ সিদ্দিকীর সাথে যোগাযোগ করা হলে, তিনি কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি।