নিজস্ব প্রতিবেদক : শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) ঢাকা কার্যালয়ের সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) গোপাল চন্দ্র সাহার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে একই দপ্তরে বহাল থেকে একটি শক্তিশালী ও দুর্ভেদ্য ‘টেন্ডার সিন্ডিকেট’ গড়ে তোলার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রভাবশালী প্যানেল ‘বঙ্গবন্ধু আওয়ামী প্রকৌশলী পরিষদ’-এর সদস্যপদের রাজনৈতিক দাপট খাটিয়ে এবং অধিদপ্তরের এক শীর্ষ প্রকৌশলীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বা ‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুবাদে তিনি এই সিন্ডিকেট পরিচালনা করে আসছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, নিয়ম-বহির্ভূতভাবে দীর্ঘদিন একই দপ্তরে চাকরি করার সুযোগে তিনি শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণকারী এক অঘোষিত সম্রাট হিসেবে নিজের অস্তিত্বের জানান দিচ্ছেন এবং মাফিয়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে মোটা অংকের কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে অনৈতিক সুবিধা দিয়ে আসছেন। তৎকালীন সময়ে একেবারে প্রকাশ্য দিবালোকে শতকরা (পার্সেন্টেজ) ভাগাভাগির কাজ পরিচালনা করলেও দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর, অর্থাৎ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং পরবর্তীতে বর্তমান বিএনপি সরকার ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও এই সিন্ডিকেটের দাপট ও থাবা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে, যা খোদ অধিদপ্তর ও ঠিকাদার মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। একজন সাধারণ সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে গোপাল চন্দ্র সাহার নির্ধারিত বেতনের তুলনায় তার দৃশ্যমান জীবনযাত্রার মান ও বিপুল বৈভব যে কাউকেই অবাক করবে; অনুসন্ধানে জানা যায় যে তিনি ইতিমধ্যেই ঢাকা শহরে তিনটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট এবং নিজ গ্রামে আত্মীয়-স্বজনদের নামে প্রায় ২০ বিঘা জমি ক্রয় করেছেন। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের এই টেন্ডার সিন্ডিকেটটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও সুকৌশলে পরিচালনা করা হয়, যেখানে ওটিএম (Open Tendering Method) টেন্ডারের অত্যন্ত গোপনীয় কোটেশন পত্র নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের নিকট আগেভাগেই পাচার করে দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে ৫ থেকে ১০ শতাংশ নিশ্চিত কমিশনের বিনিময়ে কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এই সিন্ডিকেটের সবুজ সংকেত ছাড়া শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে বর্তমানে কোনো উন্নয়নমূলক কাজ সম্পন্ন হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। একজন রাজনৈতিকভাবে চিহ্নিত ও চরম বিতর্কিত কর্মকর্তা হয়েও কোন অদৃশ্য ক্ষমতার বলে তিনি এখনো প্রধান শাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে আসছেন, তা নিয়ে বর্তমানে অধিদপ্তরের ভেতরে-বাইরে আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে।
এই সিন্ডিকেটের কর্মকাণ্ড ও ভেতরের অনিয়ম নিয়ে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী আবেদ আলী (ছদ্মনাম) তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, গোপাল চন্দ্র সাহা বিগত দিনগুলোতে আওয়ামী প্রকৌশলী পরিষদের দাপট দেখিয়ে অধিদপ্তরে একক আধিপত্য ও সিন্ডিকেট পরিচালনা করলেও, বর্তমানে সরকার পরিবর্তনের পরও এক অদৃশ্য শক্তির আশ্রয়ে একই ঠিকাদারি সিন্ডিকেট কার্যক্রম বহাল তবিয়তে চালিয়ে আসছেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, গোপাল চন্দ্র সাহা অতীতে যেমন চরম সুবিধাবাদী ছিলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটেও নিজের অবস্থান ধরে রেখে ঠিক তেমনই সুবিধাবাদী রয়ে গেছেন; তাই এই বিতর্কিত কর্মকর্তাকে অতি দ্রুত শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে সরিয়ে ঢাকার বাইরে পোস্টিং দেওয়ার ব্যবস্থা করা উচিত এবং তার অবৈধ সম্পদ ও কমিশন বাণিজ্যের বিরুদ্ধে একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা অত্যন্ত জরুরি। এই সিন্ডিকেটের একচেটিয়া বাণিজ্যের একটি বাস্তব উদাহরণ হিসেবে জানা যায়, সম্প্রতি ‘সৈকত এন্টারপ্রাইজ’ নামক একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সাথে গোপাল চন্দ্র সাহার বড় অংকের আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত বিরোধ তৈরি হয় এবং এর জেরে তাদেরকে নতুন কোনো কাজ না দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটে। এই বিরোধের সূত্র ধরে পরবর্তীতে গোপাল চন্দ্র সাহার নিজস্ব দপ্তরেই সৈকত এন্টারপ্রাইজের একজন কর্মচারীর সাথে তার তীব্র কথা কাটাকাটি ও উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়, যা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং সাধারণ ঠিকাদারদের প্রায় সকলেই অবগত রয়েছেন এবং এটি নিয়ে এখনো কানাঘুষা চলছে। সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পকে এই মাফিয়া চক্রের হাত থেকে রক্ষা করতে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এই সমস্ত গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে এবং নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে সহকারী প্রকৌশলী গোপাল চন্দ্র সাহার বক্তব্য নেওয়ার জন্য তার ব্যক্তিগত মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি এবং কোনো সাড়া মেলেনি।