বিআইডব্লিউটিএ’র নিয়োগে ৮-১০ লাখের চুক্তি ‘ডামি পরীক্ষার্থী’ ও তিন ধাপের জালিয়াতির চাঞ্চল্যকর খতিয়ান

নিজস্ব প্রতিবেদক :
১৯৯০ সালের বিধিমালা লঙ্ঘন করে লিখিত পরীক্ষার আয়োজন; ৮-১০ লাখ টাকার চুক্তি; ‘ডামি পরীক্ষার্থী’ ও তিন ধাপের জালিয়াতির চাঞ্চল্যকর খতিয়ান

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)-র তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী নিয়োগে পরীক্ষা শুরুর আগেই প্রশ্নপত্র ও উত্তরপত্র ফাঁসের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমল থেকে সক্রিয় একটি সংঘবদ্ধ চক্র পরীক্ষার আগেই মনোনীত প্রার্থীদের কাছে প্রশ্ন পৌঁছে দিয়ে এই নিয়োগ বাণিজ্য সচল রেখেছে বলে ভুক্তভোগীদের দাবি। জনপ্রতি ৮ থেকে ১০ লাখ টাকার চুক্তিতে এই নিয়োগ জালিয়াতি চললেও বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ এই বিষয়ে সম্পূর্ণ উদাসীনতা দেখাচ্ছে। ক্ষুব্ধ পরীক্ষার্থীবৃন্দ এ বিষয়ে নৌ মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং নৌমন্ত্রী রবিউল ইসলামের সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ১৬ মে রাজধানীর মিরপুর বাংলা স্কুল অ্যান্ড কলেজ (বালক ও বালিকা শাখা) এবং মিরপুর গার্লস আইডিয়াল কলেজে বিআইডব্লিউটিএ’র তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী পদের নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।
বিকেল ৩টা থেকে ৪:৩০ মিনিট পর্যন্ত পরীক্ষা

চলার কথা থাকলেও, পরীক্ষা শুরুর আগেই অর্থাৎ বেলা ২:৫৪ মিনিটে উত্তরপত্রসহ প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটে, যা মুহূর্তের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং কেন্দ্রজুড়ে হট্টগোলের সৃষ্টি করে।

নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি-০৩/২০২৫ অনুযায়ী- ২১ জন লস্কর, ১ জন বাস হেলপার, ২৩ জন শুল্ক প্রহরী, ৬ জন মার্কম্যান, ১৩ জন পরিচ্ছন্নতা কর্মী ও ২ জন ড্রাইভারসহ মোট ৬৬টি পদের জন্য এই পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছিল।

বাংলাদেশ গেজেট (অতিরিক্ত, নভেম্বর-৮, ১৯৯০) নিয়োগ বিধিমালার ২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এমএলএসএস, গার্ড, নৈশ প্রহরী, শুল্ক প্রহরী ও ক্লিনারসহ চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা ৮ম শ্রেণী পাশ এবং সুস্বাস্থ্যের অধিকারী ব্যক্তিদের কেবল ‘মৌখিক পরীক্ষা’র মাধ্যমে নির্বাচন করার স্পষ্ট আদেশ রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, মৌখিক পরীক্ষার নিয়ম থাকলেও সিন্ডিকেটের অসাধু কর্মকর্তারা নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করতে এবং জালিয়াতির পথ সুগম করতে জোরপূর্বক ‘লিখিত পরীক্ষা’র আয়োজন করে। কারণ, লিখিত পরীক্ষাতেই সাধারণত প্রশ্ন ফাঁস এবং খাতা বদলের মতো জালিয়াতিগুলো সহজে করা যায়।

ভুক্তভোগীদের দাবি, ২০২৫ সালেও এই দপ্তরের বিভিন্ন নিয়োগে দুর্নীতির খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে পতিত সরকারের দোসররা এখনো বহাল তবিয়তে সক্রিয়। এই চক্রের মূল হোতা হিসেবে নাম এসেছে বিআইডব্লিউটিএ’র শ্রমিক লীগের সাবেক কার্যনির্বাহী কমিটির সভাপতি আকতার এবং সাধারণ সম্পাদক ছরোয়ারের। এই দুই নেতার মাধ্যমেই নিয়োগ কমিটি এবারও মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। বিগত দিনে ছরোয়ার একাই সাবেক নৌমন্ত্রী শাজাহান খান ও প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরীর প্রভাব খাটিয়ে নিজের আত্মীয়স্বজনসহ কয়েকশত অযোগ্য লোককে চাকরি দিয়েছেন বলে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।

এই বিতর্কিত নিয়োগ পরীক্ষার আহবায়ক হলেন
বিআইডব্লিউটিএ’র যুগ্ম সচিব (সদস্য, পরিকল্পনা ও পরিচালন) মোঃ সাজেদুর রহমান এবং সদস্য সচিব হলেন মোঃ কবির হোসেন (অতিরিক্ত পরিচালক, প্রশাসন ও মানব সম্পদ)। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- গোপাল বাবু (পরিচালক, হিসাব), মোঃ গোলাম ফারুক (নিরীক্ষা) এবং মোঃ মিজানুর রহমান (যুগ্ম পরিচালক, প্রশাসন ও মানব সম্পদ)।

বিআইডব্লিউটিএ’র একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এই সিন্ডিকেটটি মূলত তিন ধাপে জালিয়াতি সম্পন্ন করে:

১. প্রথম ধাপ: প্রথমে চুক্তি অনুযায়ী মোট টাকার

৩০% অগ্রিম নিয়ে প্রকৃত পরীক্ষার্থীর পরিবর্তে ‘ডামি পরীক্ষার্থী’ বা ‘বডি চেঞ্জ’ করে লিখিত পরীক্ষায় পাস করানো হয়।

২. দ্বিতীয় ধাপ: ব্যবহারিক (প্র্যাকটিক্যাল)

পরীক্ষাতেও মূল প্রার্থীর বদলে ডামি প্রার্থী অংশ নেয় এবং চুক্তি অনুযায়ী আরও ৩০% টাকা লেনদেন হয়।

৩. তৃতীয় ধাপ: সর্বশেষ ভাইভা (মৌখিক)

পরীক্ষাতেও ডামি প্রার্থী এসে অংশ নেয় এবং চূড়ান্ত পাসের পর বাকি ৪০% টাকার ভাগবাটোয়ারা হয়।

এবারের পরীক্ষায় কোনো প্রার্থীর পূর্বের ছবির সাথে চেহারা মেলানো হয়নি এবং পরীক্ষার্থীদের স্বাক্ষরের সত্যতা যাচাই না করায় ব্যাপক হারে ভুয়া পরীক্ষার্থী ও ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়েছে। বঞ্চিত পরীক্ষার্থীদের দাবি- উত্তীর্ণদের যদি একই প্রশ্ন দিয়ে दोबारा পরীক্ষা নেওয়া হয়, তবে তারা ৩০ নম্বরও পাবে না।

নিয়োগ জালিয়াতি ও প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে নিয়োগ কমিটির আহবায়ক মোঃ সাজেদুর রহমান (সদস্য, পরিকল্পনা ও পরিচালন) সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “পরীক্ষা নিয়েছে মেরিডিয়ান ইউনিভার্সিটি এবং খাতাও তারাই দেখছেন। এখানে আমাদের কোনো হাত নেই, তাই প্রশ্ন ফাঁসের সুযোগও নেই।” চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী নিয়োগে লিখিত পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়ে তিনি দাবি করেন, কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ীই এই পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে এবং কমিটিতে তিনি ছাড়াও আরও ৪ জন সদস্য রয়েছেন।ইতিমধ্যেই অনিয়মের কারণে বিআইডব্লিউটিসি’র নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত করা হলেও বিআইডব্লিউটিএ’র ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ নির্বিকার। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ সুশাসন ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে এই জালিয়াতির তদন্ত হওয়া জরুরি।

ভুক্তভোগী পরীক্ষার্থী ও সচেতন মহল দাবি জানিয়েছেন- বর্তমান পরীক্ষাটি অবিলম্বে বাতিল করে নতুন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে হবে। একই সাথে উত্তরপত্রের হাতের লেখা খতিয়ে দেখা, টপশিটের সাথে হাজিরা শিটের স্বাক্ষর মেলানো, এবং পতিত সরকারের আমলে হওয়া পূর্ববর্তী সকল নিয়োগের সঠিক অনুসন্ধান করে দোষীদের মুখোশ উন্মোচন করতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও সরকারের উচ্চ মহলের দ্রুত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।

সংবাদটি শেয়ার করে অন্য জানার সুযোগ দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *