বেতন ৮০ হাজার, থাকেন ১২ কোটি টাকার ফ্ল্যাটে কাস্টমস কর্মকর্তা মারুফ

নিজস্ব প্রতিবেদক :জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আয়কর বিভাগের অতিরিক্ত কর কমিশনার (এসিটি-চলতি দায়িত্ব) শাহ মোহাম্মদ মারুফ ২০১০ সালে ২৮তম বিসিএসের মাধ্যমে চাকরিতে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি ৫ম গ্রেডের কর্মকর্তা, যার মোট বৈধ আয় প্রায় ৮০ লাখ টাকা (যুগ্ম কর কমিশনার হিসেবে)। তবে তার আয়কর নথিতে সম্পদের পরিমাণ চার কোটি টাকার বেশি। তিনি পরিবারসহ বারিধারা কূটনৈতিক জোনের ১২ কোটি টাকার ফ্ল্যাটে বসবাস করছেন, যা স্ত্রীর নামে কিনলেও এখনো নিবন্ধন করেননি। এছাড়া, নিজ ও স্ত্রীর জন্য বিলাসবহুল গাড়ি রয়েছে এবং নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। আয়কর গোয়েন্দারা তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে, যেখানে প্রাথমিক অনুসন্ধানে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে।

কর গোয়েন্দা ইউনিটের কমিশনার আব্দুর রকিবের কাছে জানতে চাইলে শাহ মোহাম্মদ মারুফের বিরুদ্ধে তদন্তের কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, সপ্তাহখানেকের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে। এর বাইরে আর কিছু বলতে অপারগতা জানান। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ-গোপালগঞ্জ বাড়ি হওয়ার দাপটে পতিত ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর পরিচয়ে মাত্র ৭-৮ বছরের ব্যবধানে অবৈধ পথে বিপুল অর্থ উপার্জন করেছেন তিনি। অভিযোগের সত্যতার পরও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। বর্তমানে বগুড়া কর অঞ্চলের সিরাজগঞ্জ সার্কেলে বহাল তবিয়তে চাকরি করছেন তিনি। এ নিয়ে খোদ এনবিআরের ভেতরে-বাইরে চলছে গুঞ্জন। একাধিক সূত্রে উল্লিখিত তথ্য পাওয়া গেছে।

টান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘দুর্নীতিবাজ কর কর্মকর্তারা বড় ব্যবসায়ীদের যেমন কর ফাঁকিতে সহায়তা করেন, তেমন নিজেরা অবৈধ আয়কে বৈধ করতে আয়কর ফাইলে জালিয়াতি করেন। আয়কর গোয়েন্দারা তার অবৈধ সম্পদের তথ্য পেলে তাকে অবশ্যই বিভাগীয় শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে। একই সঙ্গে এটা যেহেতু দুর্নীতি, তাই তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন. ‘যারা ন্যায় ও সততার সঙ্গে কর দিতে চান তাদের জন্য আয়কর অফিসের দরজা পার হওয়া কঠিন, আর যারা অসৎভাবে কর ফাঁকি দিতে চায় তাদের জন্য স্বর্গ। এটা তারই একটা বড় দৃষ্টান্ত।’

অনুসন্ধানে অতিরিক্ত কর কমিশনার শাহ মোহাম্মদ মারুফের নামে-বেনামে সম্পদ কেনার সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্ত পাওয়া গেছে। ব্যাংকেও তার জমা আছে কোটি টাকা। ৮০ হাজার টাকা বেতনের সরকারি কর্মচারীর রাজধানীর বারিধারার কূটনৈতিক জোনে ১২ কোটি টাকার ফ্ল্যাট কেনার খবর নিয়ে এনবিআর কর্মকর্তাদের মধ্যেও চলছে নানা আলোচনা। এই কর্মকর্তা ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সম্পদ কিনেছেন। তার সম্পদের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করছে কর গোয়েন্দারা। এখন পর্যন্ত তারা শাহ মারুফের নামে-বেনামে (নিজ, স্ত্রী, ভাই-বোনের নামে) প্রায় ৩০ কোটি টাকার সম্পদের তথ্য পেয়েছেন। তবে মারুফের আয়কর নথিতে সম্পদের পরিমাণ ৪ কোটি ১ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। তার চাকরি ছাড়া আয়ের অন্য কোনো উৎস নেই।

অ্যাপার্টমেন্টটি সাজানো হয়েছে দামি আসবাব ও বিদেশি বাথরুম ফিটিংসে, যার অভ্যন্তরীণ নকশায় ব্যয় হয়েছে কয়েক কোটি টাকা। ভবন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বর্গফুট জায়গার মূল্য ৪০ হাজার টাকা, ফলে ফ্ল্যাটটির মূল্য দাঁড়ায় ১২ কোটি টাকার বেশি। আড়াই বছর আগে স্ত্রীর নামে ফ্ল্যাটটি কিনে তিনি পরিবারসহ সেখানে বসবাস শুরু করেন। তবে এক সময় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা তার স্ত্রী (বর্তমানে গৃহিণী) আয়কর নথির জটিলতার কারণে এখনো ফ্ল্যাটটির নিবন্ধন সম্পন্ন করতে পারেননি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মারুফের স্ত্রী সাদিয়া আফরিন চাকরিজীবী হিসাবে আয়কর ফাইল খোলেন। আয়কর নথি বলছে, সাদিয়া ইউনিয়ন ডেভেলপমেন্ট নামে একটি বেসরকারি আবাসন কোম্পানিতে চাকরি করেন। রাজধানীর পান্থপথে অবস্থিত ওই আবাসন কোম্পানির অফিসে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এক সময় সাদিয়া এই কোম্পানিতে চাকরি করলেও এখন নেই। প্রতিষ্ঠানটির এক কর্মকর্তা জানান, বছরখানেক আগে চাকরি ছেড়েছেন সাদিয়া। সবশেষ তিনি বিক্রয় বিভাগের সহকারী ম্যানেজার পদে কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে কর্মহীন সাদিয়ার আয়কর নথিতে সম্পদ এক কোটি ৭৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ তার বৈধ আয়ের সঙ্গে ব্যয় ও ১২ কোটি টাকায় ফ্ল্যাট কেনার তথ্য সঙ্গতিপূর্ণ নয়। আবার পৈতৃক সূত্রে তার এই ফ্ল্যাট প্রাপ্তির কোনো তথ্য-প্রমাণও নেই।

সাবেক আয়কর কমিশনার ড. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, তদন্তে যে কোনো সরকারি কর্মকর্তার অবৈধ সম্পদ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। একজন সরকারি কর্মকর্তা চাকরি করে বৈধ পথে এত সম্পদের মালিক হওয়া সম্ভব নয়। এত সম্পদ করে থাকলে নিশ্চয়ই তিনি অবৈধ পথ অবলম্বন করেছেন।

এনবিআরের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গোপালগঞ্জের পরিচিতি কাজে লাগিয়ে শাহ মোহাম্মদ মারুফ প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। তিনি কর অঞ্চল-৪, কর অঞ্চল-৫, কর অঞ্চল-১২ ও নারায়ণগঞ্জ সার্কেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পোস্টিং নেন। অভিযোগ রয়েছে, করদাতাদের কর ফাঁকিতে সহায়তা করে তিনি বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ সংগ্রহ করেন।অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থ বৈধ করতে তিনি বিভিন্ন কৌশলে নামে-বেনামে সম্পদ কেনেন। এনবিআরের এক কর্মকর্তা জানান, কর অঞ্চল-৫-এ দায়িত্ব পালনকালে তিনি অসাধু উপায়ে বিপুল সম্পদের মালিক হন।

এ ব্যাপারে বক্তব্য জানতে শাহ মোহাম্মদ মারুফের মোবাইল ফোনে শনিবার একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। বারিধারায় বাসায় গিয়ে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও তা সম্ভব হয়নি।

সংবাদটি শেয়ার করে অন্য জানার সুযোগ দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *