নিজস্ব প্রতিবেদক:
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) প্রকৌশল বিভাগে একজন কর্মকর্তার শিক্ষাগত যোগ্যতা, নিয়োগ, বিতর্কিত পদোন্নতি, শত শত কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ বণ্টন, ঠিকাদার সিন্ডিকেট, কমিশন বাণিজ্য, নামে-বেনামে সম্পদ অর্জন এবং অর্থ পাচারের অভিযোগ নিয়ে নতুন করে তোলপাড় শুরু হয়েছে।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বিআইডব্লিউটিএর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. নিজাম উদ্দিন পাঠান।
বিভিন্ন সূত্র ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে তাঁকে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠ ও সুবিধাভোগী কর্মকর্তা এবং তৎকালীন স্বৈরাচারী সরকারের প্রভাবশালী দোসর হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক ক্ষমতা এবং ঠিকাদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে তিনি বিআইডব্লিউটিএর প্রকৌশল বিভাগে দীর্ঘদিন ধরে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেন।
তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে—নিয়োগের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন, প্রকৌশল বিভাগের উচ্চপদে ওঠার শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক, নিয়মবহির্ভূত পদোন্নতি, সরকারি প্রকল্পে ঠিকাদারদের সুবিধা দেওয়া, শত কোটি টাকার কমিশন বাণিজ্য, নিম্নমানের কাজের বিপরীতে বিল অনুমোদন, নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ গড়ে তোলা, ব্যাংকে সন্দেহজনক অর্থ রাখা এবং বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছাড়া কোনো অভিযোগকে প্রমাণিত হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।
স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ক্ষমতার উত্থান
বিআইডব্লিউটিএর বিভিন্ন সূত্রের অভিযোগ, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মো. নিজাম উদ্দিন পাঠানের ক্ষমতা ও প্রভাব দ্রুত বাড়তে থাকে।
অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি সংস্থাটির প্রকৌশল বিভাগে নিজের একটি শক্তিশালী বলয় তৈরি করেন। প্রভাবশালী ঠিকাদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন বড় প্রকল্প, টেন্ডার, বিল এবং প্রকল্প পরিচালনার ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সমালোচকদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রশাসনের একটি প্রভাবশালী অংশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এবং রাজনৈতিক সুবিধা গ্রহণের কারণেই তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগ দীর্ঘদিন কার্যকর তদন্তের মুখোমুখি হয়নি।
বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে তাঁকে বিআইডব্লিউটিএর একজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, যার সিদ্ধান্ত ও প্রভাবের বাইরে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প, টেন্ডার কিংবা বিলের কার্যক্রম পরিচালনা কঠিন ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।এ কারণেই অনেকেই তাঁকে বিআইডব্লিউটিএর ‘অঘোষিত চেয়ারম্যান’ বা ‘গডফাদার’ বলেও অভিহিত করেছেন।
প্রকৌশলী হওয়ার যোগ্যতা নিয়েই বড় প্রশ্ন
মো. নিজাম উদ্দিন পাঠানের শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং প্রকৌশল বিভাগের উচ্চপদে তাঁর পদোন্নতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি ডিপ্লোমা প্রকৌশলী হিসেবে বিআইডব্লিউটিএতে উপসহকারী প্রকৌশলী বা নিম্নতর প্রকৌশল পদে চাকরি শুরু করেন। এরপর ধারাবাহিকভাবে সহকারী প্রকৌশলী, নির্বাহী প্রকৌশলী এবং সর্বশেষ তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে উন্নীত হন।
কিন্তু বিআইডব্লিউটিএর প্রকৌশল বিভাগের প্রবিধান অনুযায়ী, ডিপ্লোমাধারী কর্মকর্তার পদোন্নতির সর্বোচ্চ সীমা কোন পদ পর্যন্ত—সে প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের অভিযোগ, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর মতো উচ্চতর প্রকৌশল পদে যাওয়ার জন্য স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাসঙ্গিক বিষয়ে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি এবং নির্ধারিত সময়ের অভিজ্ঞতার প্রয়োজন থাকার কথা।
কিন্তু মো. নিজাম উদ্দিন পাঠানের ক্ষেত্রে এসব শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
সনদ যাচাইয়ের দাবি, নিয়োগের বৈধতা নিয়েও অভিযোগ
তাঁর চাকরির শুরুতে জমা দেওয়া ডিপ্লোমা বা শিক্ষাগত সনদ যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছিল কি না—তা নিয়েও বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
দুর্নীতি দমন কমিশন এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরে দেওয়া কিছু অভিযোগে তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা ও সনদের বৈধতা পুনরায় যাচাইয়ের দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি যে শিক্ষাগত যোগ্যতার ভিত্তিতে চাকরিতে নিয়োগ পেয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে উচ্চতর প্রকৌশল পদে উন্নীত হয়েছেন, সেই যোগ্যতা ও সনদগুলো যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
এ কারণে তাঁর প্রাথমিক নিয়োগ থেকে শুরু করে পরবর্তী সব পদোন্নতির নথিপত্র ও শিক্ষাগত সনদ তদন্তের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।
ডিপ্লোমা থেকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী—নিয়ম ভাঙার অভিযোগ
বিআইডব্লিউটিএর অভ্যন্তরীণ সূত্রের অভিযোগ, ডিপ্লোমাধারী কর্মকর্তাদের একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সরকারি নিয়ম ও প্রবিধানকে পাশ কাটিয়ে উচ্চতর প্রকৌশল পদে পদোন্নতির সুযোগ তৈরি করে নেয়।
অভিযোগ রয়েছে, মো. নিজাম উদ্দিন পাঠান এবং তাঁর সঙ্গে যুক্ত আরও কয়েকজন কর্মকর্তা নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি পান এমন একটি প্রক্রিয়ায়, যার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
সমালোচকদের দাবি, প্রবিধানে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি ছাড়া তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হওয়ার সুযোগ না থাকলেও নতুনভাবে অর্জিত সান্ধ্যকালীন বা চাকরির পর অর্জিত বিএসসি ডিগ্রির ভিত্তিতে পদোন্নতির উদ্যোগ নেওয়া হয়।
অভিযোগ রয়েছে, কর্তৃপক্ষের কিছু নির্দেশনায় নতুনভাবে অর্জিত শিক্ষাগত যোগ্যতা পদোন্নতির ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য না হওয়ার কথা থাকলেও তা উপেক্ষা করা হয়েছে।সাত বছরের জায়গায় পাঁচ বছরে পদোন্নতির অভিযোগ
আরও অভিযোগ রয়েছে, বিআইডব্লিউটিএর প্রবিধানে সহকারী প্রকৌশলী থেকে নির্বাহী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতির জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা সাত বছর থাকার কথা।
কিন্তু ডিপ্লোমাধারী কর্মকর্তাদের একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট একটি দপ্তর আদেশের মাধ্যমে সেই সময়সীমা সাত বছর থেকে পাঁচ বছরে নামিয়ে আনে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সমালোচকদের প্রশ্ন—প্রবিধান পরিবর্তন ছাড়া শুধুমাত্র একটি দপ্তর আদেশের মাধ্যমে পদোন্নতির মূল শর্ত পরিবর্তন করা আইন ও সরকারি বিধিবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল কি না।
অভিযোগ রয়েছে, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিজাম উদ্দিন পাঠানসহ একাধিক ডিপ্লোমাধারী কর্মকর্তা দ্রুত পদোন্নতির সুবিধা পান।
এতে সরকারের আর্থিক ক্ষতিও হয়েছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
‘ডিপ্লোমা সিন্ডিকেট’ এখনো সক্রিয় থাকার অভিযোগ
বিআইডব্লিউটিএর প্রকৌশল বিভাগে একটি শক্তিশালী ‘ডিপ্লোমা সিন্ডিকেট’ দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এই সিন্ডিকেট রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহার করে নিয়োগ, পদোন্নতি এবং বড় প্রকল্পের দায়িত্ব নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখে।
নিজাম উদ্দিন পাঠান ও সুলতান পাঠানসহ এই সিন্ডিকেটের কয়েকজন কর্মকর্তার নাম বিভিন্ন অভিযোগে উঠে এসেছে।
হাসান, জামাল, শাহাবুল, নুরুলসহ আরও কয়েকজন ডিপ্লোমাধারী কর্মকর্তাকে একই ধরনের প্রক্রিয়ায় তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি দেওয়ার জন্য বর্তমানে তৎপরতা চলছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সমালোচকদের দাবি, ক্ষমতার পালাবদল হলেও বিগত সরকারের সময় গড়ে ওঠা এই প্রভাবশালী বলয়ের অনেক সদস্য এখনো সংস্থাটির গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল রয়েছেন।
মন্ত্রীও প্রশ্ন তুলেছেন প্রকল্প পরিচালকের দক্ষতা নিয়ে—এমন দাবি
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সম্প্রতি বিআইডব্লিউটিএর সদরঘাট এলাকায় একটি প্রকল্পের কাজ পরিদর্শনের সময় প্রকল্পের কাজের গাফিলতি ও পরিচালনায় অদক্ষতা দেখে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল ব্যক্তি প্রকল্প পরিচালকের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্প পরিচালককে উদ্দেশ করে প্রশ্ন করা হয়—তিনি কাজটি আদৌ বোঝেন কি না এবং তাঁকে কীভাবে প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
পরে অনুসন্ধানে ওই প্রকল্প পরিচালকের নাম মো. নিজাম উদ্দিন পাঠান বলে জানা যায় বলে দাবি করা হয়েছে।
এই ঘটনার পর তাঁর প্রকৌশলগত দক্ষতা, শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং বড় প্রকল্প পরিচালনার সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী বা দায়িত্বশীল ব্যক্তির আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ও প্রকল্প পরিদর্শনসংক্রান্ত সরকারি নথি পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হওয়া সম্ভব।
বাঘাবাড়ী প্রকল্পে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার কাজ নিয়ে অভিযোগ
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি উঠেছে বাঘাবাড়ী নদীবন্দর আধুনিকায়ন প্রকল্পকে কেন্দ্র করে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় মো. নিজাম উদ্দিন পাঠান প্রকল্পের বড় অঙ্কের কাজ নিয়ন্ত্রণ করেন।
বিভিন্ন অনুসন্ধান ও সূত্রের দাবি অনুযায়ী, মোহাম্মদ জাফর নামে এক ঠিকাদারকে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়।অভিযোগকারীদের দাবি, ওই কাজ পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে আনুমানিক ১০০ কোটি টাকা কমিশন নেওয়া বা আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে।
এছাড়া নগরবাড়ী-বাঘাবাড়ী প্রকল্পে মাঠপর্যায়ে যথাযথ কাজ না করেই ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশ করে বিল উত্তোলনের অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগগুলো সত্য হলে তা সরকারি অর্থের বড় ধরনের অপব্যবহার এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে ভয়াবহ অনিয়মের ঘটনা হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এস এস রহমান কোম্পানিকে ২৪০ কোটি টাকার কাজ দেওয়ার অভিযোগ
মো. নিজাম উদ্দিন পাঠানের বিরুদ্ধে ‘এস এস রহমান কোম্পানি’র মালিক মোহাম্মদ দিপুকে প্রায় ২৪০ কোটি টাকার কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, ক্ষমতার প্রভাব ব্যবহার করে নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বড় প্রকল্পের কাজ দেওয়া হয়েছে।
কাজের গুণগত মান যথাযথভাবে নিশ্চিত না করেই বিপুল অঙ্কের বিল অনুমোদনের অভিযোগও উঠেছে।
নারায়ণগঞ্জের খানপুর নদীবন্দর প্রকল্পসহ বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়মের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নথিপত্র ও অভিযোগ প্রস্তুত করে সচিবালয়ে পাঠিয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্র দাবি করেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এসব অভিযোগের পর তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফল সম্পর্কে কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি।
দুর্নীতির অর্থে ডেভেলপার ব্যবসার অভিযোগ
প্রকল্প থেকে অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ আবাসন ও ডেভেলপার ব্যবসায় বিনিয়োগ করা হয়েছে—এমন অভিযোগও উঠেছে মো. নিজাম উদ্দিন পাঠানের বিরুদ্ধে।
বিভিন্ন সূত্রের দাবি, বাঘাবাড়ী প্রকল্পের ঠিকাদার মোহাম্মদ জাফরের সঙ্গে তিনি যৌথভাবে ডেভেলপার ব্যবসায় যুক্ত হয়েছেন।
অভিযোগকারীদের দাবি, সরকারি প্রকল্প থেকে কমিশন ও অনিয়মের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগ করা হয়েছে।
এই অভিযোগের আর্থিক উৎস ও ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব তদন্তের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।
নামে-বেনামে সম্পদের পাহাড়ের অভিযোগ
মো. নিজাম উদ্দিন পাঠানের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিপুল সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে।
বিভিন্ন অনুসন্ধানী সূত্রের দাবি, রাজধানীর বনশ্রী ও রামপুরা এলাকায় তাঁর নামে ও বেনামে একাধিক অ্যাপার্টমেন্ট, প্লট এবং বাড়ি রয়েছে।
বনশ্রীর জে ব্লকে দুটি, এস ব্লকে একটি এবং সি ব্লকে তিনটি অ্যাপার্টমেন্ট থাকার অভিযোগও বিভিন্ন অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
এছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এবং তাঁর নিজ এলাকায় বাণিজ্যিক জমি ও অন্যান্য সম্পদ থাকার অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব সম্পদের প্রকৃত মালিকানা, মূল্য এবং অর্থের উৎস নির্ধারণে সরকারি তদন্ত প্রয়োজন।
আত্মীয়তার সূত্রে চাকরির অভিযোগ
বিভিন্ন সূত্রের দাবি, বিআইডব্লিউটিএতে চাকরি করতেন মো. নিজাম উদ্দিন পাঠানের এক আত্মীয়।
অভিযোগ রয়েছে, সেই আত্মীয়তার সূত্র এবং অভ্যন্তরীণ প্রভাব ব্যবহার করেই তিনি সংস্থাটিতে প্রকৌশল পদে চাকরির সুযোগ পান।
চাকরির শুরু থেকেই কয়েকজন বড় ও প্রভাবশালী ঠিকাদারের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরে সেই সম্পর্ক ও প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি দ্রুত উচ্চপদে উন্নীত হন বলেও সমালোচকদের দাবি।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া প্রয়োজন।বিআইডব্লিউটিএতে ‘পারিবারিক কোটা’ ও প্রভাবের রাজত্বের অভিযোগ
বিআইডব্লিউটিএর নিয়োগ ও পদোন্নতি প্রক্রিয়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে মেধা, অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতার চেয়ে আত্মীয়তার সম্পর্ক, রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত প্রভাব এবং আর্থিক যোগসাজশ বেশি কার্যকর ভূমিকা রেখেছে।
সমালোচকদের দাবি, কোনো কর্মকর্তা অবসর নিলে বা মারা গেলে তাঁর আত্মীয়স্বজন বিভিন্ন কৌশলে একই প্রতিষ্ঠানে সুযোগ পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
ফলে সংস্থাটির প্রকৌশল বিভাগে একটি প্রভাবশালী পারিবারিক ও গোষ্ঠীগত বলয় তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
টেন্ডার সিন্ডিকেট ও নিম্নমানের কাজের অভিযোগ
নগরবাড়ী নদীবন্দর আধুনিকায়ন, বাঘাবাড়ী টার্মিনাল উন্নয়ন, খানপুর পোর্ট ডেভেলপমেন্টসহ একাধিক বড় প্রকল্পে বাজেট ব্যয় ও মাঠপর্যায়ের বাস্তব কাজের মধ্যে অসামঞ্জস্য থাকার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী—
কাজের প্রকৃত অগ্রগতি যাচাই না করেই বিল অনুমোদন করা হয়েছে;
একই ধরনের কাজের বিপরীতে একাধিকবার বিল নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে;
কোথাও কাগজে কাজ সম্পন্ন দেখানো হলেও মাঠে বাস্তব অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে;
নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের সুবিধা দিতে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে;
নিম্নমানের কাজের বিপরীতেও বিল পরিশোধ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
একজন অভিজ্ঞ ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, বিআইডব্লিউটিএতে অনেক ক্ষেত্রে নিয়ম মেনে কাজ করতে গেলে বাধার মুখে পড়তে হয় এবং প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলেই বেশি সুবিধা পাওয়া যায়।
কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগে শত কোটি টাকা
বাঘাবাড়ী প্রকল্পে মোহাম্মদ জাফরকে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার কাজ পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে আনুমানিক ১০০ কোটি টাকা কমিশন নেওয়ার অভিযোগ মো. নিজাম উদ্দিন পাঠানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি।
এছাড়া এস এস রহমান কোম্পানির মালিক মোহাম্মদ দিপুকে প্রায় ২৪০ কোটি টাকার কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এসব কাজ বণ্টনের ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না এবং কাজের বিপরীতে বিল যথাযথভাবে দেওয়া হয়েছে কি না—তা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
হুন্ডিতে অর্থ পাচারের অভিযোগ
মো. নিজাম উদ্দিন পাঠানের বিরুদ্ধে অর্জিত অবৈধ অর্থের একটি অংশ হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচারের অভিযোগও রয়েছে।
বিভিন্ন অভিযোগে বলা হয়েছে, তাঁর ও তাঁর ঘনিষ্ঠদের ব্যাংক হিসাব, সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেন এবং আত্মীয়স্বজনের নামে রাখা এফডিআর তদন্ত করা প্রয়োজন।
তাঁর বিরুদ্ধে দেশে-বিদেশে সম্পদ অর্জন এবং অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগের তথ্য দুর্নীতি দমন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে দেওয়া হয়েছে বলেও সূত্র দাবি করেছে।
তবে ব্যাংক হিসাব জব্দ বা অর্থ পাচারের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো চূড়ান্ত আদালতের আদেশ হয়েছে কি না—সে বিষয়ে প্রকাশ্য নির্ভরযোগ্য সরকারি তথ্য পাওয়া যায়নি।
দুদকে অভিযোগ, প্রাথমিক যাচাইয়ের দাবি
বাঘাবাড়ী নদীবন্দর আধুনিকায়ন প্রকল্পসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, টেন্ডার কারসাজি, কমিশন বাণিজ্য এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরে অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে—
১. চাকরির সময় শিক্ষাগত সনদের যথাযথতা ও বৈধতা;
২. প্রকৌশল পদের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা;
৩. বিতর্কিত ও নিয়মবহির্ভূত পদোন্নতি;
৪. সাত বছরের পরিবর্তে পাঁচ বছরে পদোন্নতির অভিযোগ;
৫. বিআইডব্লিউটিএর প্রবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগ;
৬. বড় প্রকল্প নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের পাইয়ে দেওয়া;
৭. কমিশন বাণিজ্য ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ;
৮. কাজের মান যাচাই ছাড়া বিল অনুমোদন;
৯. নামে-বেনামে সম্পদ অর্জন;
১০. আত্মীয়স্বজনের নামে ব্যাংক হিসাব ও এফডিআর;
১১. সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেন;
১২. হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাচারের অভিযোগ;
১৩. বিআইডব্লিউটিএতে কথিত ঠিকাদার-কর্মকর্তা সিন্ডিকেট পরিচালনা।
ব্যাংক হিসাব ফ্রিজের বিষয়ে এখনো প্রশ্ন
মো. নিজাম উদ্দিন পাঠানের ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ বা ফ্রিজ করার বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো প্রকাশ্য চূড়ান্ত সরকারি আদেশ পাওয়া যায়নি।
তবে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর ভিত্তিতে আর্থিক লেনদেন, ব্যাংক হিসাব এবং সম্পদের উৎস তদন্তের দাবি রয়েছে।
আইনি প্রক্রিয়ায় সাধারণত অভিযোগ যাচাই, নথি সংগ্রহ, অনুসন্ধান, আর্থিক তথ্য বিশ্লেষণ এবং প্রয়োজন হলে আদালতের অনুমোদনের মাধ্যমে সম্পদ বা ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
এ কারণে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে দুদক, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলো কী ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে বা নেবে—সেদিকেই এখন নজর সংশ্লিষ্টদের।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও বহাল থাকার প্রশ্ন
বিভিন্ন অভিযোগকারীর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে যারা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছিলেন, তারা ক্ষমতার পরিবর্তনের পরও কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল রয়েছেন।
মো. নিজাম উদ্দিন পাঠানের বিরুদ্ধেও একই প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, তিনি বিগত স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক প্রভাব ও সুবিধা গ্রহণ করে নিজের অবস্থান সুসংহত করেন এবং ঠিকাদার সিন্ডিকেটের সঙ্গে সম্পর্কের মাধ্যমে প্রকল্প ও প্রকৌশল বিভাগে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেন।
এ কারণে তাঁর নিয়োগ, শিক্ষাগত যোগ্যতা, পদোন্নতি, প্রকল্প পরিচালনা, সম্পদ এবং আর্থিক লেনদেন—সবকিছু একসঙ্গে তদন্তের দাবি উঠেছে।
প্রশ্ন এখন জবাবদিহির
বাংলাদেশের নদীপথ, নৌবন্দর ও নৌ-অবকাঠামো উন্নয়নের দায়িত্বে থাকা বিআইডব্লিউটিএর মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে একজন কর্মকর্তাকে ঘিরে এতগুলো অভিযোগ ওঠার পরও সেগুলোর পূর্ণাঙ্গ জবাবদিহি হয়েছে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
একজন ডিপ্লোমাধারী কর্মকর্তা কীভাবে ধারাবাহিকভাবে উচ্চতর প্রকৌশল পদে উন্নীত হলেন?
তাঁর শিক্ষাগত সনদ ও চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়া যথাযথ ছিল কি না?
বিআইডব্লিউটিএর প্রবিধান অনুসরণ করেই কি তাঁকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে?
সাত বছরের অভিজ্ঞতার শর্ত কীভাবে পাঁচ বছরে নামিয়ে আনা হলো?
বাঘাবাড়ীসহ শত শত কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ কীভাবে নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের হাতে গেল?
কাজের বাস্তব অগ্রগতি যাচাই ছাড়া বিল দেওয়া হয়েছিল কি না?
নামে-বেনামে থাকা অভিযোগকৃত সম্পদের প্রকৃত উৎস কী?
অভিযোগকৃত অর্থ পাচার ও সন্দেহজনক ব্যাংক লেনদেনের কোনো সত্যতা রয়েছে কি না?
এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে প্রয়োজন স্বাধীন, নিরপেক্ষ এবং পূর্ণাঙ্গ তদন্ত।
তদন্ত হলেই বেরিয়ে আসবে প্রকৃত চিত্র
বিআইডব্লিউটিএর প্রকৌশল বিভাগে কথিত ডিপ্লোমা সিন্ডিকেট, বিতর্কিত পদোন্নতি, রাজনৈতিক প্রভাব, ঠিকাদার সিন্ডিকেট এবং প্রকল্পভিত্তিক দুর্নীতির অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হলে আরও অনেক তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে নিজাম উদ্দিন পাঠানের বক্তব্য জানার জন্য তাঁর মুঠোফোন নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। একই সঙ্গে WhatsApp-এর মাধ্যমে একাধিকবার বার্তা পাঠিয়ে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাঁর বক্তব্য ও অবস্থান জানতে চাওয়া হয়। তবে প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত তাঁর কাছ থেকে কোনো বক্তব্য বা প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। ফলে তাঁর বক্তব্য ছাড়াই অভিযোগ-সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো প্রতিবেদনে উপস্থাপন করা হয়েছে। পরবর্তীতে তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথভাবে সংযোজন বা সংশোধনের মাধ্যমে প্রকাশ করা হবে।