সেতু-সড়কে অনিয়ম, কমিশন, ভয়ভীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ- সর্বশেষ পৈতৃক জমি ও পারিবারিক কবরস্থান উচ্ছেদের অভিযোগ; প্রশ্ন, কার ছত্রছায়ায় এই প্রকৌশলী?
নিজস্ব প্রতিবেদক:
বরিশালের উজিরপুর উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) উপ-সহকারী প্রকৌশলী সুব্রত রায়কে ঘিরে একের পর এক অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা, ক্ষমতার অপব্যবহার ও ভয়ভীতির অভিযোগ উঠলেও এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে নানা অভিযোগ, বিতর্ক ও জনভোগান্তির পরও দৃশ্যমান কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ক্রমেই বাড়ছে।
সবশেষ পৈতৃক জমি ও পারিবারিক কবরস্থান উচ্ছেদের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে সুব্রত রায়ের বিরুদ্ধে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী ও বরিশাল জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত অভিযোগ করেছেন স্থানীয় ভুক্তভোগী মো. মাসুম হাওলাদার। অভিযোগটি ঘিরে নতুন করে এলাকায় উত্তেজনা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
অভিযোগকারীর দাবি, উন্নয়নকাজ বাস্তবায়নের অজুহাতে স্থানীয় কয়েকটি পরিবারকে তাদের ভিটেমাটি ও পৈতৃক কবরস্থান সরিয়ে নেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে। এর প্রতিবাদ করলে মামলার ভয় দেখানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।
৭৫ লক্ষ টাকার ফুটব্রিজ দুই মাসেই ধস!
সুব্রত রায়কে ঘিরে ওঠা অভিযোগের মধ্যে অন্যতম হলো উন্নয়ন প্রকল্পের কাজের মান ও তদারকি নিয়ে প্রশ্ন। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় ৭৫ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত ‘হারতা নয়াকান্দি ফুটব্রিজ–দক্ষিণ সাতলা সড়ক’ হস্তান্তরের মাত্র দুই মাসের মাথায় ধসে পড়ে।
এ ঘটনায় প্রকল্পের নির্মাণমান, ব্যবহৃত সামগ্রী, কাজের পরিমাপ এবং সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীর তদারকি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সরকারি অর্থে নির্মিত একটি অবকাঠামো এত অল্প সময়ের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণ নির্ধারণে কার্যকর তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
সেতু আছে, সংযোগ সড়ক নেই!
সর্বশেষ ধামুড়া–শোলক সড়কের শাখা নদীর ওপর নির্মিত সেতু নিয়েও দেখা দিয়েছে নতুন সংকট। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে প্রায় পৌনে সাত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেতুটির নির্মাণকাজ প্রায় দেড় বছর আগে শেষ হলেও এখনো সংযোগ সড়ক না থাকায় সেটি কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে আছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
স্থানীয়দের দাবি, সেতুতে ওঠার জন্য অনেককে মই ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে।
প্রশ্ন উঠেছে—বিপুল অর্থ ব্যয়ে সেতু নির্মাণের আগে প্রয়োজনীয় সংযোগ সড়কের বিষয়টি কি প্রকল্প পরিকল্পনায় যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়েছিল? যদি করা হয়ে থাকে, তাহলে নির্মাণ শেষ হওয়ার এতদিন পরও কেন সংযোগ সড়ক তৈরি হলো না?
ভিটেমাটি ও কবরস্থান সরানোর অভিযোগ
সংযোগ সড়ক নির্মাণকে কেন্দ্র করে স্থানীয় কয়েকটি পরিবারের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, তাদের বসতভিটা ও পারিবারিক কবরস্থান সরিয়ে নেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে।
মো. মাসুম হাওলাদারের অভিযোগ, পৈতৃক জমি ও পারিবারিক কবরস্থান রক্ষার বিষয়ে আপত্তি জানানো হলেও তা আমলে নেওয়া হয়নি। বরং তাদের বিরুদ্ধে মামলা করার ভয় দেখানো হয়েছে।
এ ধরনের অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রশ্নই নয়, বরং নাগরিকের সম্পত্তি ও পারিবারিক কবরস্থানের অধিকার নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে।
বেহাল সড়ক নিয়ে আন্দোলন, ভয়ভীতির অভিযোগ
এর আগেও ‘সানুহার–ধামুরা সড়ক’-এর বেহাল দশা নিয়ে স্থানীয় শিক্ষার্থীরা দ্রুত সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনে নামেন। ওই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সুব্রত রায়ের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ ওঠে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সড়কটির দুরবস্থার কারণে সাধারণ মানুষ, শিক্ষার্থী ও যানবাহন চালকদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। অথচ সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ইতিবাচক সমাধানের পরিবর্তে ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে।
সাংবাদিকদের হুমকির অভিযোগও আলোচনায়
সুব্রত রায়ের বিরুদ্ধে অনিয়মের সংবাদ প্রকাশের জেরে সাংবাদিকদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও অতীতে আলোচনায় আসে। অভিযোগ রয়েছে, সংবাদ প্রকাশের কারণে সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি ‘প্রয়োজনে লাশ পড়বে, চেয়ার ছাড়ব না’—এ ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন।
তবে এই বক্তব্যের সত্যতা ও প্রেক্ষাপট নির্ধারণে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য এবং প্রমাণ যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগটি সত্য হলে একজন সরকারি কর্মকর্তার এমন আচরণ স্বাধীন সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমের নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে।
কমিশন আদায়ের অভিযোগ
উজিরপুরে যোগদানের পর থেকেই বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার, তদারকিতে গাফিলতি এবং ঠিকাদারদের কাছ থেকে অনৈতিকভাবে কমিশন আদায়ের অভিযোগও স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনায় রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের নথি, কার্যাদেশ, বিল-ভাউচার, কাজের পরিমাপ এবং গুণগতমান পরীক্ষার প্রতিবেদনসহ সংশ্লিষ্ট সব নথি যাচাই করে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
এত অভিযোগের পরও ব্যবস্থা নেই কেন?
একজন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ উঠলে অভিযোগগুলো সত্য না মিথ্যা—তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রশাসনের দায়িত্ব। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যেমন জরুরি, তেমনি অভিযোগ মিথ্যা হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে দায়মুক্ত করার বিষয়টিও পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, সুব্রত রায়কে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ ও বিতর্ক থাকলেও তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন এলাকাবাসী।
স্থানীয়দের একটি অংশের দাবি, প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের একজন প্রভাবশালী কর্মকর্তার আশ্রয়-প্রশ্রয়েই তিনি বারবার অভিযোগের পরও নিজের পদে বহাল থাকছেন। তবে এই অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ যাচাই প্রয়োজন।
তদন্ত ও অপসারণের দাবি
ভুক্তভোগী পরিবার ও এলাকাবাসীর দাবি, সুব্রত রায়ের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগের বিষয়ে দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। তদন্তের স্বার্থে তাকে উজিরপুর থেকে প্রত্যাহার বা অন্যত্র সংযুক্ত করার দাবিও জানিয়েছেন তারা।
তাদের দাবি, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি অর্থে নির্মিত সড়ক, সেতু ও অন্যান্য অবকাঠামোর কাজের মান নিয়ে ওঠা অভিযোগও যাচাই করতে হবে।
অন্যথায় সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের হস্তক্ষেপ না হলে বিষয়টি নিয়ে আরও উচ্চপর্যায়ে অভিযোগ করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
প্রশ্ন থেকেই যায়
একদিকে উন্নয়ন প্রকল্পের কাজের মান নিয়ে অভিযোগ, অন্যদিকে কমিশন আদায়, ভয়ভীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সর্বশেষ পৈতৃক জমি ও পারিবারিক কবরস্থান উচ্ছেদের অভিযোগ—সব মিলিয়ে সুব্রত রায়কে ঘিরে স্থানীয় পর্যায়ে প্রশ্নের পর প্রশ্ন উঠছে।
তবে অভিযোগগুলো সত্য কি না, তা নির্ধারণের একমাত্র গ্রহণযোগ্য পথ হলো নিরপেক্ষ তদন্ত। অভিযোগ সত্য হলে দ্রুত ব্যবস্থা এবং অভিযোগ মিথ্যা হলে স্পষ্ট ব্যাখ্যা—দুটিই জরুরি।
কারণ সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ জনগণের অর্থ। সেই অর্থে নির্মিত সেতু, সড়ক ও অবকাঠামোর মান নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তার জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রশাসনের দায়িত্ব।
তাহলে প্রশ্ন একটাই—একের পর এক অভিযোগ ওঠার পরও উজিরপুরের উপ-সহকারী প্রকৌশলী সুব্রত রায় কেন বহাল তবিয়তে? সত্যিই কি কোনো প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়া রয়েছে তার পেছনে, নাকি অভিযোগগুলোর যথাযথ তদন্তই হয়নি?
উত্তর এখন সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও এলজিইডি কর্তৃপক্ষের কাছেই।