গণপূর্ত লুটপাটে অঢেল সম্পদের মালিক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী তৈমুর আলম

নিজস্ব প্রতিবেদক:

দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো উন্নয়ন খাত হিসেবে পরিচিত গণপূর্ত অধিদপ্তর—কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানের ভেতরেই দীর্ঘদিন ধরে গড়ে উঠেছে দুর্নীতির শক্তিশালী এক সিন্ডিকেট। অভিযোগ রয়েছে, এই সিন্ডিকেটের অন্যতম প্রভাবশালী সদস্য মোঃ তৈমুর আলম, যিনি বর্তমানে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ই/এম সার্কেল-৪) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, গত এক দশকে দেশের অর্ধশতাধিক প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন তৈমুর আলমসহ একটি প্রভাবশালী চক্র। সরকারি হিসাব ও অভ্যন্তরীণ সূত্রে এসব অনিয়মের ইঙ্গিত মিললেও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভেতরে গড়ে ওঠা এই সিন্ডিকেট শুধু টেন্ডার কারচুপি বা প্রকল্প বরাদ্দেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং কর্মী নিয়োগ, বদলি এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তেও তাদের প্রভাব বিস্তার রয়েছে বলে অভিযোগ। অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, এই চক্র এতটাই শক্তিশালী যে তাদের বিরুদ্ধে কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পায় না।

স্বৈরাচারী আমলে পদোন্নতি পাওয়া কিছু কর্মকর্তা রাজনীতিবিদদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলে নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করেছেন। সেই ধারাবাহিকতায় তৈমুর আলমও দপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

তদন্তে উঠে এসেছে, নির্বাচিত ঠিকাদারদের সুবিধা দিতে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় কারচুপি করা হয়। পরে প্রকল্পের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেখিয়ে বিপুল অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ করা হয়।
এর ফলে প্রকল্পের গুণগত মানও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

তৈমুর আলমের বিরুদ্ধে ঢাকার বিজ্ঞ সিএমএম আদালতে সিআর মামলা নং-১১৮/২০২৫ দায়ের করা হয়েছে। মামলায় ১৪৭/১৪৮/৩২৬/৩০৭/৫০৬/৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হলেও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে এসব মামলা ঝুলে আছে।

সরকারি চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী, কোন কর্মকর্তা ফৌজদারি মামলায় আসামি হলে কতৃপক্ষ আমলে নিয়ে, সরকার চাইলে তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত বা বিভাগীয় কার্যক্রম শুরু করতে পারে।

সরকারি বেতন কাঠামো অনুযায়ী প্রকল্প পরিচালকদের আয় নির্ধারিত থাকলেও অভিযোগ উঠেছে—এই আয়ের সঙ্গে তৈমুর আলমের সম্পদের কোনো সামঞ্জস্য নেই।
বর্তমানে তিনি ঢাকার জিগাতলায় সরকারি কোয়ার্টারে বসবাস করলেও, তার নামে ও পরিবারের সদস্যদের নামে বিপুল সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো।

তার পরিবারের সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন স্ত্রী সালমা রহমান, কন্যা জান্নাতুল নাওয়ার এবং পুত্র আহমাদ আব্দুল্লাহ। স্থায়ী ঠিকানা নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার সাধারচরে হলেও রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভেতরে সংস্কার কার্যক্রম চালু করার চেষ্টা হলেও এই সিন্ডিকেটের কারণে তা বারবার ব্যাহত হচ্ছে। কর্মকর্তারা বলছেন, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকতা থাকায় এদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

দেশের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো যেখানে জনগণের করের টাকায় পরিচালিত, সেখানে এই ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই নয়, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ওপর আস্থা সংকটও তৈরি করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গণপূর্ত অধিদপ্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করা গেলে এই সিন্ডিকেট আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে—যার মূল্য দিতে হবে পুরো দেশকে।

এ বিষয়ে প্রধান প্রকৌশলী মোঃ খালেকুজ্জামান চৌধুরী-এর মন্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে, অফিসে পাওয়া যায়নি।

সংবাদটি শেয়ার করে অন্য জানার সুযোগ দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *