নিজস্ব প্রতিবেদন :
ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের পতনের প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রশাসনে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও দুর্নীতি দমনে নানা সংস্কারমূলক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। সরকারি ও আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম-দুর্নীতি রোধে নজরদারি জোরদারের কথাও বলা হয়। পরবর্তীতে বিএনপি সরকার গঠন করলেও বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে অনিয়ম, দুর্নীতি ও প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের নিয়ে অভিযোগ পুরোপুরি থামেনি—এমন দাবি সংশ্লিষ্ট মহলের।
এরই মধ্যে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ঢাকা নগর গণপূর্ত বিভাগ-৪-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাসুদ রানাকে ঘিরে একাধিক গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। টেন্ডার প্রক্রিয়া, সরকারি অর্থ ব্যয়, বিল-ভাউচার, সম্পদ অর্জন এবং প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ নিয়ে মন্ত্রণালয় ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট মহলে চলছে নানা আলোচনা।
অভিযোগকারীদের কেউ কেউ তাকে কথিতভাবে ‘মিস্টার ১৫%’ নামে অভিহিত করলেও, এ ধরনের উপাধি বা কমিশন গ্রহণের অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টি এখনো অভিযোগের পর্যায়েই রয়েছে।
‘চার খলিফার’ একজন—এমন দাবিও
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, ছাত্র আন্দোলনের সময় গণপূর্ত অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তাকে আন্দোলন মোকাবিলায় সক্রিয় ভূমিকা পালনের জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে মাসুদ রানার নামও তারা উল্লেখ করেছেন।
এ ছাড়া অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য ওবায়দুল মোক্তাদির চৌধুরীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই মাসুদ রানা গণপূর্তের ঢাকা নগর বিভাগ-৪-এ দায়িত্ব পান।
৫ আগস্ট সরকার পতনের পরও ওই রাজনৈতিক ব্যক্তির সঙ্গে তার যোগাযোগ অব্যাহত ছিল এবং পরবর্তীতে ওই নেতার গ্রেপ্তারের পরও যোগাযোগ রাখা হয়েছিল—এমন অভিযোগও রয়েছে।
টেন্ডার ঘিরে বড় অঙ্কের অনিয়মের অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, ঢাকা শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ-৩-এ দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের বড় অঙ্কের দরপত্রে অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রাক্কলন তৈরি, টেন্ডারসংক্রান্ত তথ্য ফাঁস, নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে সুবিধা দেওয়া এবং কমিশন গ্রহণের মাধ্যমে অনৈতিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সরকারি প্রকল্পের অর্থের ওপর চাপ তৈরি করা হয় এবং বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ গড়ে তোলার সুযোগ সৃষ্টি হয়।
আরও অভিযোগ রয়েছে, টেন্ডার অনুমোদনের আগেই ঠিকাদারদের কাছ থেকে অগ্রিম অর্থ গ্রহণ, কাজ সম্পন্ন না করেও ভুয়া ভাউচার ও বিলের মাধ্যমে সরকারি অর্থ উত্তোলনের মতো অনিয়ম ঘটেছে।
তবে এসব অভিযোগের কোনোটি আদালত বা সংশ্লিষ্ট তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে—এমন তথ্য প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। অভিযুক্ত কর্মকর্তার বক্তব্যও এ বিষয়ে পাওয়া সম্ভব হয়নি।
সাবেক সচিব ও প্রধান প্রকৌশলীর ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ
সূত্রের দাবি, শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ-৩-এ দায়িত্ব পালনকালে তৎকালীন এক সাবেক সচিবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে মাসুদ রানা প্রশাসনিকভাবে প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন।
একইভাবে সাবেক এক প্রধান প্রকৌশলীর ঘনিষ্ঠ হিসেবেও তিনি পরিচিত ছিলেন—এমন অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, কথিত এই প্রভাব কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনকালে নির্ধারিত বরাদ্দের বাইরে বিভিন্ন ব্যয় দেখিয়ে অর্থ উত্তোলন করার সুযোগ তৈরি করা হয়েছিল।
এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অতীতে তাকে একাধিকবার বদলি করা হলেও কার্যকর তদন্ত কিংবা দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না—এ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজধানীতে বিপুল সম্পদের অভিযোগ
মাসুদ রানার বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো তার কথিত বিপুল স্থাবর সম্পদ অর্জন।
অভিযোগকারীদের দাবি, নিজের নামে, স্ত্রীর নামে এবং আত্মীয়-স্বজনের নামে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিপুল পরিমাণ জমি, বাড়ি ও ফ্ল্যাট রয়েছে।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে—
* গুলশানে একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট।
* রামপুরা-বনশ্রীর ডি ব্লকে পাঁচতলা বাড়ি।
* বনশ্রীর এফ ব্লকে স্ত্রীর নামে দুটি ফ্ল্যাট।
* বসুন্ধরা সিটির পঞ্চম তলায় দুটি বাণিজ্যিক দোকান।
* মোহাম্মদপুরের বাবর রোডে ১০ কাঠার একটি প্লট।
* রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় আরও জমি, বাড়ি ও ফ্ল্যাট।
অভিযোগকারীদের দাবি, এসব সম্পদের বাজারমূল্য কয়েক দশ কোটি টাকারও বেশি।
তবে সম্পদগুলোর মালিকানা, প্রকৃত বাজারমূল্য ও অর্থের উৎস স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে সম্পদের তালিকা ও মূল্যসংক্রান্ত দাবিগুলোও তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
‘বহাল তবিয়তে’ থাকায় প্রশ্ন
এতসব অভিযোগ সামনে আসার পরও মাসুদ রানা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বহাল থাকায় সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো কি কখনো পূর্ণাঙ্গভাবে তদন্ত করা হয়েছে?
যদি তদন্ত হয়ে থাকে, তদন্ত প্রতিবেদনে কী উঠে এসেছিল? অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল? আর অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে কেন আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে দায়মুক্ত ঘোষণা করা হয়নি?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে হলে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক নথি, তদন্ত প্রতিবেদন, বদলি-পদায়নের আদেশ এবং তার সম্পদসংক্রান্ত তথ্য পর্যালোচনা করা জরুরি।
জনস্বার্থে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—উত্থাপিত অভিযোগগুলো সত্য, নাকি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত?
অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন হলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে মাসুদ রানাকে দায়মুক্ত করা হোক। আর অভিযোগের কোনো অংশ প্রমাণিত হলে সরকারি অর্থের অপব্যবহার, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা অবৈধ সম্পদ অর্জনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক—এমন দাবি উঠেছে সংশ্লিষ্ট মহলে।
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি অভিযোগকারীদের দাবি, নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাসুদ রানার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখতে একটি স্বাধীন ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হোক।