নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
দুর্নীতি, ঘুষ বাণিজ্য, ক্ষমতার অপব্যবহার ও স্বজনপ্রীতির একের পর এক গুরুতর অভিযোগে আলোচিত জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তা মুহাম্মদ জাকির হোসেনকে ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে প্রশাসনিক অঙ্গনে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্ত চলমান থাকা অবস্থাতেই তাকে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর, ঢাকা’র মহাপরিচালক (ডিজি) পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি প্রশাসনে বিস্ময় ও জনমনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এনবিআরের শীর্ষ মহলের আজ্ঞাবহ হিসেবে পরিচিত ছিলেন জাকির হোসেন। সেই প্রভাব খাটিয়ে তিনি প্রায় ২ হাজার৬০০ কোটি টাকার “ভ্যাট অনলাইন প্রকল্প”-এ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বাগিয়ে নেন। এরপর ওই প্রকল্পকে কেন্দ্র করে ব্যাপক অনিয়ম, কমিশন বাণিজ্য এবং কার্যাদেশ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে শতকোটি টাকার অবৈধ সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। সংশ্লিষ্ট মহলে তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন “ভ্যাট জাকির” নামে।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, প্রায় দেড় বছর আগে জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু হলেও এখনো তদন্ত শেষ হয়নি। তদন্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, অভিযোগের নথি, আর্থিক লেনদেন ও প্রকল্পসংক্রান্ত কাগজপত্র যাচাইয়ে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হচ্ছে তদন্ত কর্মকর্তাদের। এমনকি তদন্তে সহযোগিতা না করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
দুদকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “অভিযোগের গুরুত্ব অনেক বেশি। কিন্তু প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহে নানা বাধা তৈরি হচ্ছে। তদন্ত এখনো চলমান।”
প্রশ্ন উঠেছে-যার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় অর্থ লোপাট, টেন্ডার কারসাজি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মতো গুরুতর অভিযোগ তদন্তাধীন, তাকে কীভাবে আরও গুরুত্বপূর্ণ পদে পদোন্নতি দেওয়া হলো? প্রশাসনিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু প্রশাসনিক নৈতিকতার প্রশ্নই নয়; বরং দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের বিশ্বাসযোগ্যতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ভ্যাট অনলাইন প্রকল্পে নিজের প্রভাব খাটিয়ে নামে-বেনামে প্রতিষ্ঠান খুলে বিভিন্ন কার্যাদেশ নিয়ন্ত্রণ করতেন জাকির হোসেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ক্রয়ে অস্বাভাবিক মূল্য দেখিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
দুদকে জমা দেওয়া এক লিখিত অভিযোগে বিসমিল্লাহ প্যাকেজিংয়ের স্বত্বাধিকারী এ আর সানি দাবি করেন, জাকির তার শ্যালকের নামে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) সরবরাহের কার্যাদেশ দিয়ে বিপুল অর্থ লুটপাট করেন। অভিযোগে বলা হয়, বাজারমূল্য প্রায় ৪০ হাজার টাকার একটি এসি ১ লাখ ৩০ হাজার টাকায় ক্রয় দেখানো হয়।
এ ছাড়া জাকিরের স্ত্রী নাজরিন আকতারের সম্পৃক্ত “ধ্রুপদী টেকনো কনস্ট্রাকশন লিমিটেড” নামের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রকল্প সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্বজনদের মাধ্যমে প্রকল্প নিয়ন্ত্রণ ও অর্থ স্থানান্তরের বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
মুহাম্মদ জাকির হোসেনের স্ত্রী নাজরিন আকতারের নামে একাধিক বন্ড লাইসেন্স ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের তথ্য পেয়েছে অনুসন্ধান সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ রয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সুবিধা আদায়, আমদানি-রপ্তানি সুবিধা এবং বন্ড অপব্যবহারের সুযোগ নেওয়া হয়েছে।
যশোর ভ্যাট কমিশনার থাকাকালে তার স্ত্রীকে স্বর্ণবারসহ চোরাচালান সংশ্লিষ্ট ঘটনায় বিমানবন্দরে আটক করা হয়েছিল বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগে আরও বলা হয়, সরকারি প্রকল্পের অর্থ ব্যবহার করে সিনিয়র কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণে নেওয়া হতো। অভিযোগকারীদের দাবি, এটি ছিল মূলত প্রভাব বিস্তার ও সুবিধা আদায়ের অংশ।
অন্যদিকে অবৈধ আয়ের উৎস আড়াল করতে নিজের লেখা “বাংলাদেশের নতুন ভ্যাট” শীর্ষক বইয়ের বিক্রয় আয়ের মাধ্যমে অর্থ সাদা করার চেষ্টার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
অভিযোগ রয়েছে, পারটেক্স গ্রুপের ভ্যাট সংক্রান্ত নথিতে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার বিনিময়ে বনানী ক্লাবের সদস্যপদ নিতে বাধ্য করা হয় সংশ্লিষ্টদের। প্রায় ৩০ লাখ টাকার সদস্যপদ গ্রহণ করলেও তা আয়কর নথিতে যথাযথভাবে প্রদর্শন করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
কর বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়, তাহলে তা কর ফাঁকি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের আওতায় পড়তে পারে।
আইন ও জনপ্রশাসন বিশ্লেষকদের মতে, তদন্তাধীন গুরুতর অভিযোগ থাকা কোনো কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ পদে পদোন্নতি দেওয়া প্রশাসনিক জবাবদিহিতার পরিপন্থী। তাদের ভাষ্য, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত না হলে জনগণের আস্থা আরও কমে যাবে।
সব অভিযোগের বিষয়ে মুহাম্মদ জাকির হোসেনের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
অন্যদিকে দুদকের তদন্ত কর্মকর্তা আবু বকর সিদ্দিকের তত্ত্বাবধানে অনুসন্ধান কার্যক্রম চলমান রয়েছে বলে জানা গেছে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই জাকির হোসেনের পদোন্নতি প্রশাসনের ভেতরে-বাইরে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।