নিজস্ব প্রতিবেদক :
যেখানেই বদলি, সেখানেই দুর্নীতির শক্তিশালী সিন্ডিকেট। চুক্তি করে ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা ধার নেওয়া, শুল্ক ও ভ্যাট ফাঁকিতে সহায়তা এবং বদলি বাণিজ্যের মাধ্যমে শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাস্টমস ও ভ্যাট প্রশাসন শাখার সদস্য মো. মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে।
আওয়ামী লীগ সরকারের একাধিক প্রভাবশালী মন্ত্রী ও কর্মকর্তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা কাজে লাগিয়ে এসব অপকর্ম করলেও বর্তমানে রাজনৈতিক পরিচয় আড়াল করে এনবিআর চেয়ারম্যান হওয়ার দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন তিনি। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রাথমিক গোয়েন্দা অনুসন্ধানে মোয়াজ্জেম হোসেনের এই বিপুল অবৈধ সম্পদ ও দুর্নীতির চাঞ্চল্যকর প্রমাণ মিলেছে।
শিল্পপতিদের সঙ্গে ‘ধারের চুক্তি’: আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কমিশনারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা অবস্থায় এনবিআরের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারা অনুযায়ী সরাসরি অপরাধ। কিন্তু মোয়াজ্জেম হোসেন ক্ষমতার দাপটে সরাসরি স্ট্যাম্পে চুক্তির মাধ্যমে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন।
মেঘনা গ্রুপের সাথে চুক্তি: মেঘনা গ্রুপ অব
ইন্ডাস্ট্রিজ (এমজিআই)-এর চেয়ারম্যান মোস্তফা কামালের কাছ থেকে ১০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে চুক্তির মাধ্যমে ৩০ লাখ টাকা ধার নেন। কমিউনিটি ব্যাংকের একটি চেকের (নং-সি এ-০৩০৬৯) মাধ্যমে এই লেনদেন হয়।
ম্যাক্স গ্রুপের সাথে চুক্তি: ২০২২ সালের ২৮
অক্টোবর ম্যাক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান গুলাম মোহাম্মদ আলমগীরের কাছ থেকে সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংকের চেকের (নং-সিডি এস এন বি- ১৫০৬৩) মাধ্যমে আরও ৩০ লাখ টাকা ধার নেন। উল্লেখ্য, অর্থ প্রদানকারী এই ব্যবসায়ী নিজেও দুদকের মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন।
মোয়াজ্জেম হোসেনের ছেলে রাগীব মোয়াজ্জেম আমেরিকার জন হপকিন্স ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করেন, যার প্রতি সেমিস্টারের খরচ প্রায় ৩৫ হাজার ডলার (বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৪৩ লাখ টাকা)। দুদকের অনুসন্ধান বলছে, এই বিপুল খরচের কোনো বৈধ উৎস নেই এবং এই অর্থ সম্পূর্ণ হুন্ডির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে পাচার
করা হয়েছে। এছাড়া সম্প্রতি আমেরিকার মেরিল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের বাল্টিমোরে ছেলে ও পুত্রবধূ আদিবা গাফফারের নামে একটি বিলাসবহুল বাড়িও কিনেছেন তিনি।
দেশে মোয়াজ্জেমের বাড়ি, প্লট ও ব্যাংক অ্যাকাউন্টের ফিরিস্তি
নোয়াখালী জেলার সোনাইমুড়ীতে একটি ৮ তলা ভবন (নির্মাণকাজ প্রায় সম্পন্ন)।
ঢাকার ধানমন্ডি ও উত্তরায় ২টি ফ্ল্যাট।
পূর্বাচলে ২টি প্লট।
জলসিঁড়ি পূর্বাচল প্রকল্পে ১টি প্লট।
ঢাকা ডিওএইচএস এলাকায় ২টি ফ্ল্যাট।
সাভারের বিরুলিয়ায় গ্রীন ভ্যালি কর্পোরেট
সোসাইটিতে প্রায় ১২ লাখ টাকার বিনিয়োগ।
ক্লাব জিলা স্কুল লিমিটেডে প্রায় ২ লাখ টাকার সদস্যপদ/বিনিয়োগ।
যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের বাল্টিমোরে একটি বাড়ি, যা তার ছেলে রাগীব মোয়াজ্জেম ও পুত্রবধূর নামে কেনা হয়েছে বলে অভিযোগ।
উত্তরা ব্যাংকের একটি হিসাবে প্রায় ৩৮ লাখ টাকা স্থিতি থাকার দাবি।
আইডিএলসির একটি বিও/বিনিয়োগ হিসাবে প্রায় ২৫ লাখ টাকা স্থিতি থাকার দাবি।
সিটি ব্যাংক ও সোনালী ব্যাংকের একাধিক
হিসাবে অস্বাভাবিক বা উচ্চমাত্রার লেনদেনের অভিযোগ, তবে সুনির্দিষ্ট স্থিতির তথ্য উল্লেখ নেই।
বিনিয়োগ ও ব্যাংক স্থিতি: সাভারের বিরুলিয়ার
গ্রীন ভ্যালি কর্পোরেট সোসাইটিতে ১২ লাখ টাকা বিনিয়োগ। এছাড়া উত্তরা ব্যাংক (অ্যাকাউন্ট নং-157811100112০*), সিটি ব্যাংক পিএলসি (অ্যাকাউন্ট নং- ২৩০৩৬৯৭২৩৪০*) এবং সোনালী ব্যাংক পিএলসিতে (অ্যাকাউন্ট নং-৪৪৩২১০১০০৫২) কোটি কোটি টাকার অস্বাভাবিক লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। আইডিএলসিতেও (হিসাব নম্বর: আইডিএ ৩২১৪) ২৫ লাখ টাকার স্থিতি রয়েছে।
মোয়াজ্জেম হোসেন তার দীর্ঘ কর্মজীবনে যেখানেই গেছেন, সেখানেই গড়ে তুলেছেন দুর্নীতির রাজত্ব:
১. ঢাকা কাস্টম হাউস: ঘুষ ও শুল্ক ফাঁকি
সাবেক এনবিআর চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন
ভূঁইয়ার ভাইকে ঘুষ দিয়ে ঢাকা কাস্টম হাউসের কমিশনার পদ বাগিয়ে নেন মোয়াজ্জেম।
নুসাইবা ট্রেডিং কেলেঙ্কারি: ২০২০ সালে কোটি
টাকার শুল্ক ফাঁকির অভিযোগে সিআইসি কর্তৃক আটককৃত ‘নুসাইবা ট্রেডিং’-এর একটি চালান মোয়াজ্জেমের নির্দেশে ছেড়ে দেওয়া হয়।
মেমরি কার্ড তছরুপ: ২০১৬ সালে মামুন
হাওলাদার নামের এক যাত্রীর কাছ থেকে জব্দকৃত ৬ লাখ পিস মেমরি কার্ড মাত্র ৩২ লাখ টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। পরবর্তীতে পণ্য গায়েব করে আমদানিকারককে সরকারি কোষাগার থেকে ৫ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার অপচেষ্টাও চালান তিনি।
২. যশোর ভ্যাট: মাসিক মাসোহারা ও অডিও কেলেঙ্কারি
যশোর ভ্যাটের দায়িত্বে থাকাকালীন কুষ্টিয়ার ‘আলী বিড়ি কোম্পানি’ থেকে মাসে ৪৫ লাখ টাকা ঘুষ নিয়ে রাতে কারখানা চালানোর অবৈধ সুযোগ করে দেন। মাগুরায় ‘ভিশন ড্রাগস লিমিটেড’ থেকে ১ কোটি টাকা ঘুষ দাবি করায় তার দুই অধীনস্থ কর্মকর্তা বরখাস্ত হন, যারা মূলত কমিশনার
মোয়াজ্জেমের হয়ে টাকা তুলতেন। এছাড়া বিআরবি কেবলসসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতি মাসে কোটি টাকা ঘুষ নেওয়ার অডিও রেকর্ড ফাঁস হলে তাকে চট্টগ্রাম ভ্যাট আপীলে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়।
৩. রাজশাহী ভ্যাট: ১১ কোটি টাকা ঘুষ দাবি
২০১৮ সালে রাজশাহী ভ্যাটের কমিশনার থাকাকালীন পাবনার ‘ইউনিভার্সেল গ্রুপ’-এর ২৭৩ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি ধামাচাপা দিতে ১১ কোটি টাকা ঘুষ দাবি করেন মোয়াজ্জেম। এই ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশ পেলে পরবর্তীতে ইউনিভার্সেল ফুড কোম্পানিটি স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
বর্তমানে এনবিআরের শুল্ক ও ভ্যাট প্রশাসন শাখার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থেকে দেশজুড়ে সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছেন মোয়াজ্জেম হোসেন। রাজস্ব কর্মকর্তা (আরও) বদলিতে মকসুদ ভেদে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া হচ্ছে। মাঠ পর্যায়ের কমিশনারদের ভয়ভীতি দেখিয়ে সকল অভ্যন্তরীণ পোস্টিং নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন। অভিযোগ রয়েছে, শুধু ঢাকা কাস্টম হাউস থেকেই প্রতি সপ্তাহে অন্তত ৫০ লাখ টাকা ঘুষের ভাগ পৌঁছায় এই কর্মকর্তার পকেটে।
দকের মন্তব্য: দুর্নীতি দমন কমিশনের
(দুদক) গোয়েন্দারা জানিয়েছেন, প্রাথমিক অনুসন্ধানে মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও বিপুল অবৈধ সম্পদের অকাট্য তথ্য মিলেছে। তার ব্যাংক হিসাবের অস্বাভাবিক লেনদেনের প্রকৃত পরিমাণ এবং বেনামী সম্পত্তির হদিস পেতে শিগগিরই একটি প্রকাশ্য ও বিস্তারিত অনুসন্ধান শুরু করা জরুরি।