নিজস্ব প্রতিবেদক :
দুর্নীতি দমন কমিশনের দুদকের কঁড়া নজরদারিতে থাকা বিপিসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এটিএম সেলিম গুরুত্বপূর্ণ নথি ও ফাইল গায়েব করার পরও দুদকের জালে আটকা পড়েছেন বলে জানা গেছে। আলোচিত এই ব্যক্তি সাম্প্রতিক সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব প্রতিষ্ঠান বিপিসিতে একছত্র অধিপত্যে ও অনিয়ম দুর্নীতির মাধ্যমে অঢেল সম্পদের অধিকারী হয়েছেন এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
বিপিসি সংশ্লিষ্টরা জানান—সেলিম নিজেকে ও তার সম্পদ বাঁচাতে দেশের বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার কাছে ধরনা দিচ্ছেন। এবং দুদক ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জাল ছিন্ন করে এই অভিযুক্ত নিজেকে মাসুম (নিষ্পাপ) সাজার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তিনি ইতিমধ্যে গোপনে দুর্নীতির টাকায় গড়া অঢেল সম্পদ বিক্রি করে স্বপরিবারে বিদেশে পালানোর চেষ্টায় আছেন। এবং তার ও পরিবারের পাসপোর্ট জব্দের দাবি জানিয়েছেন তারা।
তখন—বিপিসির কোম্পানি সচিব ছিলেন কামাল উদ্দিন। যিনি এটিএম সেলিমের চাচা, তার মদদে সেলিম ওই শূন্য পদে নিয়োগ পান। তার চাচা কোনো নিয়মকানুন বা আইন অনুসরণ না করে গোপনীয়তার সাথে এবং প্যানেল ছাড়াই অত্যন্ত অসংবেদনশীলভাবে সেলিমকে বিপিসিতে নিয়োগ দেন। নিয়োগ পাওয়ার পর থেকে সেলিম আলাদীনের চেরাগ পেয়ে যান, এরপর সেলিমকে আর পিছনে ফিরে থাকাতে হয়নি অনিয়ম-দুর্নীতি জাল-জালিয়াতি আর নানা অপকর্ম করে কয়েক বছরের ব্যবধানে হয়ে যান, জায়গা-জমি, বহুতল ভবন, ফ্ল্যাট-দোকানের মালিকসহ অঢেল সম্পদের মালিক।অনুসন্ধানে দেখা যায়, এটিএম সেলিম চট্টগ্রামের ফয়েস লেক আবাসিক এলাকার হাজী আবদুল হামিদ রোডে ৬ তলা বিলাসবহুল বাড়িতে পরিবারসহ বসবাস করতেন। বাড়িটির নাম ‘জ্যোৎস্না’ হলেও, এটিএম সেলিম দাবি করেন এটি তার শ্বশুরের বাড়ি।
তবে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এই বাড়িটি তিনি দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থে নির্মাণ করেছেন, আর সেই বাড়ির নাম শাশুড়ির নামে রেখেছেন। এটিএম সেলিমের বিরুদ্ধে এই অভিযোগের পরেও দুদক তার বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়নি, যা দুর্নীতিবাজদের কাছে আরও বড় একটি বার্তা হয়ে উঠেছে।
এদিকে চান্দগাঁও থানার খালাসী লেকের বিপরীতে ৪ ইউনিটের ৬ তলা বিশিষ্ট বিশাল একটি ভবনের মালিকও এটিএম সেলিম। শুধু চট্টগ্রামের চান্দগাও এলাকায় নয়, তার নামে বেনামে রয়েছে একাধিক দোকান এবং নানা স্থানে সম্পত্তি। চট্টগ্রামের বাইরেও দুর্নীতির টাকায় সে নিজের সম্পদের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন, যার অন্যতম স্থান রাজধানী ঢাকা। ঢাকার অভিজাত এলাকা বনানীতেও তার নামে একাধিক ফ্ল্যাট রয়েছে, যা সে বিভিন্ন কৌশলে অর্জন করেছে।
এটিএম সেলিম তার দুর্নীতির চক্র শুধু দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি, তিনি বিদেশেও তার কালো টাকার মাধ্যমে ব্যবসা ও সম্পত্তি গড়েছেন। অস্ট্রেলিয়াতে তার বন্ধু আবদুল করিমের মাধ্যমে টাকা পাচার করে সেখানে বাড়ি কিনেছেন এবং একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন।
তৎকালীন সময়ে মংলা অয়েল ইনস্টলেশন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির ঘটনা ঘটেছে, যেখানে প্রকল্পটির সার্বিক তত্ত্বাবধান ছিলেন এটিএম সেলিম। প্রকল্পটির সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (আরডিপিপি) অনুযায়ী অনুমোদিত ব্যয় ছিল ২০৫ কোটি ৪৬ লাখ ৮৪ হাজার টাকা, কিন্তু প্রকল্পের বাস্তবায়নে খরচ দেখিয়েছিল ২০৯ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। এই অতিরিক্ত খরচের বিষয়ে ২০২০ সালের ১০ ফেব্রুয়ারী অডিট প্রতিষ্ঠান খান ওয়াহাব শফিক রহমান এন্ড কোম্পানি সেলিমের অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে আপত্তি জানায়। তখন ম্যাক্সওয়েল ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস এবং পাইপলাইন লিমিটেডকে বিল প্রদানের নামে কোটি কোটি টাকা লুটপাট করেন তিনি।
তাছাড়া প্রকল্পটির বেশ কিছু ভাউচারের হদিসও পাওয়া যায়নি। ভাউচার বিষয়ে অডিট প্রতিষ্ঠানের আপত্তির পর প্রকল্প পরিচালক মোছাদ্দেক হোসেন জানিয়েছেন, বিপিসির হিসাব বিভাগ থেকে বিল প্রদান করা হয়েছে এবং সেখানে ভাউচার সংরক্ষিত রয়েছে। কিন্তু পরবর্তীতে বিপিসির হিসাব বিভাগেও সেই ভাউচার খুঁজে পাওয়া যায়নি বলে জানা গেছে।
দুদকে দেওয়া অভিযোগে আরো একাধিক দুর্নীতির ঘটনা উঠে এসেছে, বিশেষ করে বিপিসির অধীনস্থ প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারী লিমিটেডের এসপিএম (সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং) প্রকল্পে। এই প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তর দুর্নীতির প্রমাণ পেয়েছে দুদক।
অভিযোগ অনুযায়ী, ধান ক্ষেতের একর প্রতি মূল্য ৩ লাখ এবং পানের বরজের মূল্য ৬৩ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল কিন্তু প্রকল্পের বাস্তবায়নকালে, যারা এটিএম সেলিমকে ঘুষ দিয়েছে তাদের ধান ক্ষেতকে পানের বরজ হিসেবে দেখানো হয়েছে এবং যারা ঘুষ দেয়নি তাদের পানের বরজকে ধান ক্ষেত দেখানো হয়েছে। এই জালিয়াতির ফলে প্রায় ৯৬ লাখ ৬০ হাজার ১৫০ টাকার দুর্নীতি হয়েছে, যা খোদ দুদকের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে বলে জানা গেছে।আর এদিকে, ২০২০ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি বিপিসিতে র্যাবের একটি অভিযানে ঘুষের টাকা ভাগাভাগির সময় ৬৬ লাখ ৭৫ হাজার টাকাসহ এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে। তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে ও দুদকের অনুসন্ধানে সেলিমের আরও বহু দুর্নীতির ঘটনা তখন উন্মোচিত হয়। তারপরও মূল হোতা এটিএম সেলিম মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে বার বার ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছেন।এদিকে—চট্টগ্রামের চকবাজারের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত একটি কাপড়ের দোকান ‘ইডিইএস’ (দ্বিতীয় তলায় দোকান নম্বর–২২) এর মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এই দোকানটি পরিচালনা করেন এটিএম সেলিমের স্ত্রী ও ছোট ভাই। দোকানটির বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় কোটি টাকার বেশি বলে জানা গেছে। সেলিমের অফিসের গাড়িটি শুধু অফিস কাজের জন্য নির্ধারিত। তবে তিনি পারিবারিক কাজেও গাড়িটি ব্যবহার করছেন। প্রতিদিন সকালবেলা সেলিমকে অফিসে নামিয়ে দিয়ে চলে যায় তার ছেলে-মেয়ে সেবা দিতে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত সচিব) মো: মনজুর আলমেরও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
উল্লেখ্য—এটিএম সেলিমের বিরুদ্ধে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, দুর্নীতি, সম্পদ অর্জন ও বিভিন্ন প্রকল্পে আর্থিক অনিয়মের একাধিক অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এসব অভিযোগের বিষয়ে ২০২২ সালের আগস্টে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ জমা দেওয়া হলেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া সে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে বলে জানা গেছে। ১৯৯০-এর দশকে বিপিসিতে সহকারী ব্যবস্থাপক পদে নিয়োগের সময় এটিএম সেলিমের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নানা জাল-জালিয়াতির অভিযোগ আছে।