নিজস্ব প্রতিবেদক :
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) জোন-৪-এর পরিচালক সালেহ আহমেদ জাকারিয়ার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে ইমারত পরিদর্শক সোহাগ মিয়াকে ঘিরে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে ওঠার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, কয়েকজন রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি, কিছু দালাল এবং নিজস্ব অর্থায়নে নিয়োগকৃত একাধিক সহকারীকে নিয়ে সোহাগ মিয়া এই সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। সিন্ডিকেটের সদস্যরা শুধু ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো নির্মাণে সহযোগিতাই করছেন না, বরং নকশা, ছাড়পত্র, নোটিশ এমনকি মোবাইল কোর্টকেও অর্থ আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, পরিচালক সালেহ আহমেদ জাকারিয়ার আশীর্বাদে সোহাগ মিয়া ও তার সিন্ডিকেটের অপতৎপরতায় গুলশান এভিনিউ রোডের পূর্ব পাশ, প্রগতি সরণির পূর্ব পাশ, বাড্ডা আনন্দনগর, ডিআইটি প্রজেক্ট, আদর্শ নগরসহ আরও বেশ কিছু এলাকা অধিক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সিন্ডিকেটের চাহিদামতো অর্থ দেওয়া হলে নির্মাণাধীন ভবনের মালিকেরা নকশার তোয়াক্কা না করে প্রতি তলায় অতিরিক্ত বর্গফুট বাড়িয়ে ভবন নির্মাণের সুযোগ পান বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে ভবনগুলোর ভারসাম্য নষ্ট হয়ে সেগুলো ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে পরিণত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা।
অন্যদিকে চাহিদামতো অর্থ না দিলে টাকা আদায়ের কৌশল হিসেবে একাধিক নোটিশ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। কখনো কখনো মোবাইল কোর্ট পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, অর্থের সমঝোতা হয়ে গেলে নোটিশগুলো গায়েব হয়ে যায়। নোটিশ দিয়ে কাজ না হলে পরিচালক জাকারিয়ার সহযোগিতায় মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ভবনের অনিয়মিত অংশ আংশিক ভেঙে দেওয়া হয় এবং বিদ্যুতের মিটার খুলে আনা হয়। পাশাপাশি নিয়ম অনুযায়ী ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে ভবন মালিক বা ডেভেলপারের কাছ থেকে স্বাক্ষর নেওয়া হয়—যেখানে উল্লেখ থাকে, ভবনের অনিয়মিত অংশ মালিক বা ডেভেলপার নিজ খরচে ভেঙে ফেলবেন।
কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, টাকা আদায় হয়ে যাওয়ার পর সরকারি ব্যয়ে পরিচালিত মোবাইল কোর্টের পুরো আয়োজনই কার্যত ভেস্তে যায়। আশপাশের ভবন থেকে বিদ্যুতের লাইন অথবা জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ে ভেঙে ফেলা অংশ জোড়াতালি দিয়ে আবারও নির্মাণকাজ শেষ করার সুযোগ দেওয়া হয় ভবন মালিক বা ডেভেলপার কোম্পানিগুলোকে। ফলে সরকারি লাখ লাখ টাকা ব্যয়ে পরিচালিত মোবাইল কোর্টের কার্যক্রম এবং ভবন মালিকের কাছ থেকে নেওয়া ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পও কার্যত মূল্যহীন হয়ে পড়ে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এভাবে সোহাগ মিয়া ও তার কথিত সিন্ডিকেটের অপতৎপরতায় রাজধানীর বেশ কিছু এলাকায় অসংখ্য ঝুঁকিপূর্ণ ভবন গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ প্রবল ভূমিকম্পের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় রাজউকসহ সরকারি বিভিন্ন সংস্থা ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো চিহ্নিত করতে নিরলসভাবে কাজ করছে এবং বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। এমন পরিস্থিতিতে অর্থের বিনিময়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও নকশাবহির্ভূত ভবন নির্মাণের সুযোগ দেওয়ার অভিযোগ জননিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
অপরদিকে অভিযোগ রয়েছে, জাকারিয়ার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে সোহাগ মিয়া অর্থের বিনিময়ে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন নির্মাণে সহযোগিতা করে যাচ্ছেন। তার দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভিন্ন এলাকায় অনুসন্ধান চালালে এসব অপকর্মের ভয়াবহ চিত্র উঠে আসে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
সম্প্রতি উত্তর বাড্ডার সাঈদ নগর সি ব্লকের একটি ভবনকে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে আংশিক ভেঙে ফেলা হয় এবং ভবনটির বিদ্যুতের মিটার খুলে আনা হয়। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, কিছুদিনের মধ্যেই তিন লাখ টাকায় রফাদফা করে সোহাগ মিয়া পাশের ভবন থেকে বিদ্যুতের সংযোগ এনে ওই ভবনে আবারও নির্মাণকাজ চালানোর সুযোগ করে দিয়েছেন।
সোহাগ মিয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাকার বিভিন্ন ভবন মালিক ও ডেভেলপার কোম্পানির মালিকদের অভিযোগ, সোহাগ মিয়ার ক্ষমতার দাপট এতটাই বেশি যে তিনি ইচ্ছা করলেই তার দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাকায় যেকোনো ভবনের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে উচ্ছেদ করতে পারেন। ফলে তার বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস কারও নেই বলেও তারা দাবি করেন।নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি ডেভেলপার কোম্পানির একজন ম্যানেজার অভিযোগ করেন, তাদের কোম্পানি একটি নকশার জন্য রাজউকে আবেদন করলে সোহাগ মিয়া বিভিন্নভাবে তাদের হয়রানি করতে থাকেন। কখনো আজ একটি সমস্যা, আবার কাল অন্য একটি সমস্যা দেখিয়ে মাসের পর মাস হয়রানি করা হয়। একপর্যায়ে তাদের জায়গায় বিভিন্ন ঝামেলা রয়েছে বলে ফাইল স্থগিত করে রাখা হয়। শেষ পর্যন্ত সেই ঝামেলা মেটাতে সোহাগ মিয়াকে ১৫ লাখ টাকা ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছেন বলে দাবি করেন ওই ম্যানেজার।
সাঈদ নগর সি ব্লকের ভবনটির বিষয়ে সোহাগ মিয়াকে জানানো হয়, মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ভবনটি আংশিক ভেঙে বিদ্যুতের মিটার খুলে নিয়ে আসার পরও পাশের ভবন থেকে বিদ্যুৎ সংযোগ এনে নির্মাণকাজ চালানো হচ্ছে। এ বিষয়ে সোহাগ মিয়া প্রথমে বলেন, পরদিন বিষয়টি দেখবেন। একদিন পর আবারও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘লাইন কেটে দিয়েছি, আপনি খোঁজ নিয়ে দেখেন।’
কিন্তু পরে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, ভবনটিতে বিদ্যুতের লাইন এবং নির্মাণকাজ দুটোই চলমান রয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। ফলে সোহাগ মিয়ার দেওয়া তথ্যের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার অসঙ্গতি পাওয়া যায় এবং এতে প্রতিবেদককে বিভ্রান্ত করার অভিযোগও ওঠে।
এ বিষয়ে ভবনটির একাংশের মালিক শামিমের সঙ্গে কথা বলা হলে তিনি দাবি করেন, সোহাগ মিয়ার সঙ্গে তিন লাখ টাকায় রফাদফা করে তারা নির্মাণকাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। পরবর্তীতে অধিকতর অনুসন্ধানের স্বার্থে সাঈদ নগরে ভবনটিতে নির্মাণকাজ করার সুযোগ দিতে তিন লাখ টাকা এবং নকশা দিতে ১৫ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগের কথা সোহাগ মিয়াকে জানানো হলে তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করেন।
সাঈদ নগরে পাশের ভবন থেকে বিদ্যুতের লাইন এনে নির্মাণকাজ করার বিষয়ে তিনি তার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানিয়েছেন কি না—এমন প্রশ্ন করা হলে সোহাগ মিয়া বলেন, তিনি মৌখিকভাবে জানিয়েছেন। নিয়ম অনুযায়ী এ ধরনের বিষয় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানোর কথা উল্লেখ করা হলে তিনি কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলেন, ‘আমার মৌখিকই লিখিত।’
রাজউক জোন-৪-এর একাধিক সূত্রের দাবি, যেসব ইমারত পরিদর্শক সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন, তাদের খুবই সামান্য এলাকার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বিপরীতে সোহাগ মিয়ার মতো কিছু পরিদর্শক অবৈধভাবে লাখ লাখ টাকা বাণিজ্য করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনেকের মধ্যে তা বণ্টন করে দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ কারণেই তাকে বিশাল এলাকার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে সূত্রগুলো দাবি করছে।
সূত্রগুলো আরও দাবি করছে, পরিচালক সালেহ আহমেদ জাকারিয়ার অধীনে সোহাগ মিয়ার মতো আরও বেশ কয়েকজন পরিদর্শক রয়েছেন, যারা পুরো জোন-৪-কে বাণিজ্যের এলাকায় পরিণত করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে আংশিক ভেঙে ফেলা ভবনগুলোর বেশিরভাগই পরবর্তীতে অর্থের বিনিময়ে জোড়াতালি দিয়ে পুনরায় নির্মাণের সুযোগ পাচ্ছে বলেও সূত্রগুলো দাবি করছে। এর ফলে রাজউকের মোবাইল কোর্টের কার্যকারিতা ও গ্রহণযোগ্যতাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগের আরও একটি গুরুতর দিক হলো, জোন-৪-এর বেশ কিছু ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তথ্য চাওয়া হলেও তা সরবরাহ করা হয়নি। যেসব ভবনে নোটিশ দেওয়ার পর অর্থের বিনিময়ে নোটিশ গায়েব করা হয়েছে এবং যেসব ভবনে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে আংশিক ভেঙে ফেলার পর অর্থের বিনিময়ে জোড়াতালি দিয়ে নির্মাণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে—এমন বেশ কিছু ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তথ্য চেয়ে আবেদন করা হলেও পরিচালক সালেহ আহমেদ জাকারিয়া তথ্য অধিকার আইনের ভুল ব্যাখ্যা ও অযৌক্তিক কারণ দেখিয়ে তথ্য দেননি বলে অভিযোগ রয়েছে।ঝুঁকিপূর্ণ ও নকশাবহির্ভূত ভবনের তথ্য গোপন রাখার বিষয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ আরিফুর রহমানের সঙ্গে কথা বলা হলে তিনি বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ বা নকশাবহির্ভূত ভবনের তথ্য গোপন করলে তা জননিরাপত্তা ও পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনার জন্য একটি মারাত্মক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড হিসেবে গণ্য হয়। তিনি আরও বলেন, কোন ভবনটি ত্রুটিপূর্ণ তা না জানলে সাধারণ মানুষ না বুঝেই সেখানে বসবাস বা ব্যবসা করবে, যা সরাসরি জীবননাশের কারণ হতে পারে।
ঝুঁকিপূর্ণ ভবন নির্মাণে সহযোগিতা এবং মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ভবন আংশিক ভেঙে ফেলার পর আবার জোড়াতালি দিয়ে নির্মাণের সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে দায়ভার সংশ্লিষ্টরা এড়াতে পারেন কি না—এমন প্রশ্ন করা হলে পরিচালক সালেহ আহমেদ জাকারিয়া বিষয়টি সুনির্দিষ্টভাবে জানতে চান। পরবর্তীতে জোড়াতালি দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ থাকা একাধিক ভবনের ঠিকানা তার মোবাইলে পাঠিয়ে আবারও ফোন করা হলে তিনি মিটিংয়ে থাকার কথা জানিয়ে ফোন রেখে দেন। পরবর্তীতে আবারও যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। ফলে এসব অভিযোগের বিষয়ে সালেহ আহমেদ জাকারিয়ার বক্তব্য পুরোপুরি প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে সালেহ আহমেদ জাকারিয়া, সোহাগ মিয়াসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে অসদাচরণ ও দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে বিভাগীয় কার্যধারা রুজুর দাবি জানিয়ে আপিল আবেদন করা হয়েছে বলেও জানা গেছে।
ইতোমধ্যে কয়েক মাসের মোবাইল কোর্টের তথ্য চেয়ে তথ্য অধিকার আইনের আওতায় আবেদন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট এসব তথ্য হাতে পাওয়া গেলে সালেহ আহমেদ জাকারিয়া, সোহাগ মিয়াসহ সংশ্লিষ্ট অনেকের দায়িত্বে অবহেলা, নকশাবহির্ভূত ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন নির্মাণে সহযোগিতা এবং মোবাইল কোর্টের কার্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অভিযোগের প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
তবে সোহাগ মিয়ার বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, ভবন নির্মাণে অনিয়মের সুযোগ দেওয়া এবং নোটিশ বা মোবাইল কোর্টকে অর্থ আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগগুলোর বিষয়ে তার বক্তব্যে তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। একইভাবে পরিচালক সালেহ আহমেদ জাকারিয়ার পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে অভিযোগগুলোর চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, মোবাইল কোর্টের রেকর্ড, নকশা ও অনুমোদনপত্র, তথ্য অধিকার আইনে চাওয়া তথ্য এবং বিভাগীয় কার্যধারার নথি যাচাই করা প্রয়োজন।
রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ভবন নির্মাণের সঙ্গে সরাসরি মানুষের জীবন ও নিরাপত্তা জড়িত। তাই নকশাবহির্ভূত কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ ভবন নির্মাণের সুযোগ দেওয়ার অভিযোগ, মোবাইল কোর্টের পর পুনরায় নির্মাণের সুযোগ, নোটিশ প্রত্যাহারের অভিযোগ এবং তথ্য গোপনের অভিযোগগুলো যথাযথভাবে তদন্তের দাবি রাখে।