ইরান-কানাডায় কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ট্রাম্পের ক্ষমতা

আন্তর্জাতিক ডেক্স:

ডোনাল্ড ট্রাম্প মনে করেন, তিনি ও যুক্তরাষ্ট্র এতটাই শক্তিশালী যে, শত্রু-মিত্র উভয়ই তাঁর ইচ্ছার কাছে নতি স্বীকার করবে। প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর তাঁর নেওয়া পদক্ষেপগুলো এ আকাঙ্ক্ষাকে স্পষ্ট করেছে। কিন্তু ইরান ও কানাডার সামনে ক্ষমতার দর্শনটি এক কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে ছয় মাস আগে শুরু হওয়া যুদ্ধে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করা হয়েছে। তবু ট্রাম্প সে যুদ্ধ শেষ করতে পারেননি। এখন তিনি ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক যুদ্ধ শুরু করেছেন। একই ধরনের যুদ্ধে জড়াতে বাধ্য করেছেন ঘনিষ্ঠ মিত্র কানাডাকে। ওয়াশিংটনের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা বন্ধ করে দেশটির প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি অভিযোগ তুলেছেন, ট্রাম্প অর্থনৈতিক একীভূতকরণকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছেন।

ট্রাম্প প্রশাসনও রাখঢাক করে তাদের লক্ষ্য জানান দিয়েছে। সোমবার সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ইরানের অর্থনীতির বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের ওপর ‘প্রবল আক্রমণের’ ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি এটিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া ‘ডি-ডে অভিযানের’ সঙ্গে তুলনা করেছেন।

অপরদিকে ট্রাম্পও সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে কানাডার চেয়ে ধনী ও শক্তিশালী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। একইসঙ্গে দেশটির নেতাদেরকে ‘লাইনে আসতে’ বলেছেন।

ট্রাম্প কি নিজের দর্শনে অটল থাকবেন?
সোমবার প্রশাসনের বক্তব্য থেকে মনে হচ্ছে, ট্রাম্প এবার যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকেই যুদ্ধে নামাচ্ছেন। তিনি কানাডার সঙ্গে অসম বাণিজ্যচুক্তি করতে চান। একইসঙ্গে ইরানের শাসনব্যবস্থার পতন ঘটাতে চাইছেন। দুই ক্ষেত্রেই ভবিষ্যতে কী ঘটবে তা অনিশ্চিত। কারণ, নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় এর আগে যখনই অর্থনৈতিক পরিণতি স্পষ্ট হয়েছে, ট্রাম্প তখনই পিছু হটেছেন।

এখন ইরানের বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপে তৃতীয় কোনো দেশও ভুক্তভোগী হতে পারে। সেক্ষেত্রে ওই দেশ পাল্টা পদক্ষেপ নিলে মার্কিন ভোক্তাদের জন্য জ্বালানি ও খাদ্য পণ্যের দাম বেড়ে যাবে। একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। বাজারে এই অস্থিরতা এমন সময়ে ঘটতে যাচ্ছে, যখন মার্কিন বন্ডবাজারে সংকটের আশঙ্কা ঘিরে ধরেছে।

সোমবারের হুমকিগুলো থেকে ট্রাম্প যদি শেষ মুহূর্তে পিছিয়ে যান, তাহলে তাঁর নিজের ক্ষমতা ও দেশের শক্তি আরও দুর্বল হবে। একইসঙ্গে তিনি নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ‘ক্ষমতাহীন প্রেসিডেন্ট’ হওয়ার পথে এক ধাপ এগিয়ে যাবেন।

ইরানকে চাপে ফেলে ট্রাম্প কী পাবেন?
অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাকে ইরান যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার নতুন প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ‘ডি-ডে’র সঙ্গে এর তুলনা কিছুটা বেমানান। কারণ, ইউরোপকে মুক্ত করতে গিয়ে সেনারা যে ত্যাগ স্বীকার করেছিল, তার সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা করা যায় না।

ইরানের অর্থনীতি এমনিতেই বিপর্যস্ত। এটিকে আরও ভয়াবহ করতে পারে সমন্বিত বৈশ্বিক উদ্যোগ। মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ম্যাক্স মেইজলিশ বলছেন, ‘আমরা যদি অংশীদারদের সমর্থন আদায় করতে পারি, তাহলে এটি কাজ করতে পারে।’

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ কেনেথ রোগফও একই কথা বলেছেন। তিনি মনে করেন, বিশ্বের অধিকাংশ দেশ এই উদ্যোগে পাশে না থাকলে লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে যাবে।

কিন্তু নতুন কৌশল সফল হওয়ার পথে ট্রাম্প নিজেই বিপত্তি বাধিয়ে রেখেছেন। ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক যুদ্ধের কারণে অনেক মিত্র এখন ক্ষুব্ধ। তারা এই যুদ্ধকে অবৈধ বলে অ্যাখ্যা দিয়েছে।

ইরানের আর্থিক নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার যে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, সেখানে তৃতীয় দেশও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। যেমন- চীনের বেশ কয়েকটি ব্যাংক ইরানের কম দামের তেল বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত। এসব ব্যাংকের বিরুদ্ধে এখনও পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। চীন আগেই ঘোষণা দিয়ে রেখেছে যে, তারা নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করবে। অর্থ্যাৎ, ব্যাংকগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলে চীনও পাল্টা পদক্ষেপ নিতে পারে।

বেইজিং পাল্টা পদক্ষেপ নেওয়া মানে মার্কিন বাজারে পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়া। সেটি হলে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়বে। এছাড়া, আগামী মাসে ওয়াশিংটনে শি জিনপিংয়ের সফরের কথা আছে। এর আগে ট্রাম্পের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার সম্ভাবনা বেশ কম।

সামগ্রিক বিষয়গুলো ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্তে অটল থাকার অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে দিয়েছে। অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের এক মন্তব্যে এর ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ইরানের সঙ্গে লেনদেনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কেন তাৎক্ষণিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছেন না। জবাবে বেসেন্ট বলেন, ‘আমরা সবাইকে সংশোধনের সুযোগ দিচ্ছি। আমি কেন বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থা ধ্বংস করতে যাব?’

কানাডার কাছে এটি আরও বড় সংঘাত
চীনের ব্যাংকগুলোর তুলনায় কানাডার হকি স্টিক প্রস্তুতকারকদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিতে ট্রাম্প প্রশাসন খুব বেশি সতর্কতার আশ্রয় নেয়নি। তবে দুই দেশের এই উত্তেজনা বাণিজ্যকে ছাড়িয়ে ভিন্ন দিকে মোড় নিয়েছে। সেটি হলো- প্রতিবেশী দেশটিকে বারবার অঙ্গরাজ্য হিসেবে উল্লেখ করা।

অন্টারিও প্রদেশের উইন্ডসর শহরের মেয়র ড্রু ডিলকিন্স বলছেন, ট্রাম্প কানাডাকে ৫১তম অঙ্গরাজ্য বানাতে চেয়েছেন। এ ধরনের কথা একবার বললে হেসে উড়িয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু বারবার বললে, তা সমস্যায় পরিণত হয়।

সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত বৈচিত্র্যকে স্বীকৃতি দিতে কানাডায় বিক্রি হওয়া পণ্যের মোড়কে ইংরেজির পাশাপাশি ফরাসি ভাষাও ব্যবহার হয়। যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর জন্য এটি মেনে চলা কিছুটা ঝামেলার। অটোয়া জানিয়েছে, তাদের সংবিধান দ্বৈতভাষার নিশ্চয়তা রক্ষা করে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এটিকে দুর্বলের চেষ্টা করেছিল। এ কারণে প্রধানমন্ত্রী কার্নি বাণিজ্য আলোচনা বন্ধ করে দেন।

সংবাদটি শেয়ার করে অন্য জানার সুযোগ দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *