অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়েছেন রাজউকের পলাশ,কর্ত্বপক্ষের নেই কোন ব্যবস্থা

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) অথরাইজড অফিসার ও উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ-১ শাখার উপ-পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ার) পলাশ সিকদারের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগের অনুসন্ধান জোরদার করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অভিযোগের বিষয়ে সম্প্রতি দুদকের সেগুনবাগিচা প্রধান কার্যালয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন অনুসন্ধান কর্মকর্তা ও সহকারী পরিচালক মানসী বিশ্বাস।

দুদকের প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, ২০১৫ সালে চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত বেতন ও ভাতা বাবদ পলাশ সিকদারের মোট আয় প্রায় ৩৪ লাখ ৩১ হাজার ৪৮১ টাকা। তবে দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, একই সময়ে তার নামে ও বেনামে প্রায় ৫ কোটি টাকার সম্পদ অর্জিত হয়েছে। এছাড়া তার বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেনের বিষয়ও অনুসন্ধানে যাচাই করা হচ্ছে।

গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগে বলা হয়েছে, পিরোজপুরের নেছারাবাদে প্রায় ২ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি ডুপ্লেক্স বাড়ি নির্মাণ, মেজো বোনের নামে প্রায় ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি দোতলা বাড়ি নির্মাণ, বাবার নামে ৩৫ লাখ টাকায় ১ একর ২৫ শতাংশ জমি কেনা এবং রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় শ্যালকের নামে ৫ কাঠার একটি প্লটে ভবন নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, তিনি প্রায় ৭৫ লাখ টাকা মূল্যের একটি টয়োটা হ্যারিয়ার গাড়ি ব্যবহার করলেও বিআরটিএর নথি অনুযায়ী সেটি আফসানা মরিয়ম নামে এক ব্যক্তির নামে নিবন্ধিত। বিষয়টি দুদক যাচাই করছে। একই সঙ্গে প্রথম শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও নিজেকে ভূমিহীন হিসেবে দেখিয়ে সরকারি এক একর জমি বন্দোবস্ত নেওয়ার অভিযোগও অনুসন্ধানের আওতায় রয়েছে।
২০২৫-২০২৬ করবর্ষের আয়কর রিটার্ন পর্যালোচনায় দেখা যায়, পলাশ সিকদার তার বার্ষিক করযোগ্য চাকরিজনিত আয় ৫ লাখ ৪৮ হাজার ১০০ টাকা উল্লেখ করেছেন। একই রিটার্নে তার নিট সম্পদের পরিমাণ ৯৮ লাখ ৬৬ হাজার ১৬২ টাকা দেখানো হয়েছে। নথি অনুযায়ী, বছর শেষে ব্যাংকে জমা ছিল ১২ হাজার ১৬৪ টাকা, হাতে নগদ ৭২ লাখ ৮৯ হাজার ১০ টাকা, ১০ লাখ টাকার প্রাইজবন্ড এবং পিরোজপুর ও কুমিল্লায় জমির মালিকানার তথ্য উল্লেখ রয়েছে। এছাড়া ৫০ ভরি স্বর্ণের উল্লেখ থাকলেও এর আর্থিক মূল্য শূন্য টাকা দেখানো হয়েছে। তিনি রিটার্নে আরও উল্লেখ করেছেন যে, পিতার মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারসূত্রে প্রায় ২০ লাখ ১২ হাজার ৫০০ টাকা নগদ পেয়েছেন।

তার স্ত্রী ফারজানা আক্তারের আয়কর রিটার্নেও উল্লেখযোগ্য সম্পদের তথ্য রয়েছে। রিটার্ন অনুযায়ী, তার বার্ষিক ব্যবসায়িক আয় ৫ লাখ টাকা এবং নিট সম্পদের পরিমাণ ৪৭ লাখ ২৫ হাজার টাকা। ব্যবসায়িক সম্পদের মধ্যে নগদ ও ব্যাংক ব্যালেন্স প্রায় ৩৪ লাখ ৫৫ হাজার টাকা, হাতে নগদ ৮ লাখ টাকা এবং ২ লাখ টাকার প্রাইজবন্ডের তথ্য রয়েছে। তার রিটার্নেও ৫০ ভরি স্বর্ণের উল্লেখ থাকলেও এর মূল্য শূন্য টাকা দেখানো হয়েছে।

এদিকে, স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, নির্বাচনে বিপুল অর্থ ব্যয় এবং রাজউকের দায়িত্ব পালনে অনিয়মের অভিযোগও বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া গেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, নকশা অনুমোদন ও ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র সংক্রান্ত কাজে অনিয়মের মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জন করা হয়েছে। এছাড়া একটি বহুতল ভবনের নকশা জালিয়াতির অভিযোগেও পৃথক অনুসন্ধান চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

রাজউকের একাধিক সূত্রের দাবি, দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও তার বিরুদ্ধে নিয়মিত অফিসে অনুপস্থিত থাকা এবং প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ রয়েছে। তবে এ বিষয়ে রাজউকের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো আরও দাবি করেছে, সম্প্রতি নিজের প্রশাসনিক অবস্থান পুনর্বহালের লক্ষ্যে তিনি গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করেছেন। এ সময় তিনি নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে বিভিন্ন মন্তব্য করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এ দাবির স্বাধীন সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি।

এ ছাড়া, তৎকালীন সরকারের সাবেক মুখ্য সচিব তোফাজ্জল হোসেন মিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় রাখার উদ্দেশ্যে কুমিল্লার মেঘনা উপজেলার একটি আবাসন প্রকল্পে জমি কেনা এবং অন্য কর্মকর্তাদেরও সেখানে জমি কিনতে উৎসাহিত করার অভিযোগও বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া গেছে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কোনো সরকারি তদন্তের ফলাফলও প্রকাশিত হয়নি।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে পলাশ সিকদার গণমাধ্যমকে বলেন, “আমি সাধু নই, আপনি নিউজ করেন।” তবে তিনি অভিযোগগুলোর বিষয়ে আর কোনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি।

দুদকের একটি সূত্র জানিয়েছে, জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য, ব্যাংক লেনদেন, আয়কর নথি এবং অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাই শেষে আইন অনুযায়ী পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

সংবাদটি শেয়ার করে অন্য জানার সুযোগ দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *