জুনিয়রদের পদোন্নতি, সিনিয়রদের বঞ্চনা—ডিপিডিসিতে বাড়ছে ক্ষোভ

নিজস্ব প্রতিবেদক:

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি)-তে পদোন্নতি ও নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি এবং সার্ভিস রুলস লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, বার্ষিক কর্মমূল্যায়নে (এসিআর) ভালো ফল থাকা সত্ত্বেও পরিচালনা পর্ষদের হাতে থাকা ১০ নম্বরের মূল্যায়নকে কেন্দ্র করে পদোন্নতিতে বৈষম্য সৃষ্টি হচ্ছে। এতে জ্যেষ্ঠতা উপেক্ষা করে জুনিয়র কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেওয়া এবং যোগ্য কর্মকর্তারা বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রভাব ও তদবিরের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ ও পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে অসন্তোষ বাড়ছে এবং অনেক অভিজ্ঞ কর্মকর্তা চাকরি ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। একই সঙ্গে ২৫০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানটির কর্মপরিবেশ ও কার্যকারিতাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।

ডিপিডিসির বিদ্যমান মূল্যায়ন ব্যবস্থায় এসিআরে ৭৫ নম্বর থাকলেও পদোন্নতির ক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদের মূল্যায়নের জন্য অতিরিক্ত ১০ নম্বর বরাদ্দ রয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এই ১০ নম্বর প্রদানের ক্ষেত্রে নীতিমালা অনুসরণ না করে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। অথচ চাকরিজীবনে শাস্তি না থাকলে একজন কর্মকর্তা পূর্ণ ১০ নম্বর পাওয়ার কথা। লঘু বা গুরুতর শাস্তির ক্ষেত্রে নম্বর কর্তনেরও নির্দিষ্ট বিধান রয়েছে।

ডিপিডিসির পরিচালনা পর্ষদ ১৩ সদস্যবিশিষ্ট। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়োগ ও পদোন্নতির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় এই পর্ষদ। এ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে ডিপিডিসির ইএসপিএসএন (জি টু জি) প্রকল্প দপ্তরের ডেপুটি ম্যানেজার (এইচআর) শাহ মোহাম্মদ আবদুল ওয়াহাব চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত আবেদন করেছেন।

আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ডিপিডিসির সার্ভিস রুলস-২০১৭ লঙ্ঘন করে ২০১৮ সাল থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন পদোন্নতিতে মনগড়া জ্যেষ্ঠতা তালিকা তৈরি করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সিনিয়র কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে জুনিয়রদের পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে, যার আইনগত ভিত্তি নেই বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

অভিযোগে কয়েকটি নির্দিষ্ট ঘটনারও উল্লেখ রয়েছে। ২০২০ সালে আটটি অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার (আইসিটি) পদের বিপরীতে ২১ জনের সাক্ষাৎকার নেওয়া হলেও জ্যেষ্ঠতার প্রথম ও দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে তালিকার ১৮ ও ২০ নম্বরে থাকা কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেওয়া হয়।

এ ছাড়া ২০২১ সালের ডিসেম্বরে নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রেও জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। আবার ২০২২ সালের মার্চে ডিপিডিসির নিয়োগ ও পদোন্নতি নীতিমালা-২০১৩ অনুসরণ করে কয়েকজন জুনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার (আইসিটি)-কে ডেপুটি ম্যানেজার পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়, যা আবেদনকারীর মতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও বৈষম্যমূলক।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির পদোন্নতিতেও উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পদে জ্যেষ্ঠতার ক্রম পরিবর্তন করে কনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের সিনিয়রদের ওপরে স্থান দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ধরনের ঘটনার কারণে কয়েকজন উপবিভাগীয় প্রকৌশলী চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

ফিন্যান্স বিভাগেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। সাধারণত একটি শূন্যপদের বিপরীতে দুই থেকে তিনজন কর্মকর্তার সাক্ষাৎকার নেওয়া হলেও ২০২০ সালে দুটি শূন্যপদের জন্য ১০ জনের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, তালিকার ১০ নম্বরে থাকা এক কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও পদোন্নতি দেওয়া হয়। যদিও ডেপুটি ম্যানেজার (ফিন্যান্স) পদে পদোন্নতির জন্য ডিপিডিসির সার্ভিস রুলস-২০১৭ অনুযায়ী ন্যূনতম যোগ্যতা মাস্টার্স (কমার্স)।

অন্যদিকে, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে ডেপুটেশনে আসা প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের নানা ধরনের অসহযোগিতার মুখে পড়তে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে ডিপিডিসির নির্বাহী পরিচালক (প্রশাসন ও মানবসম্পদ) এবং কোম্পানি সেক্রেটারির পদ শূন্য রয়েছে।

ডিপিডিসির ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত পদ ৫ হাজার ৭১৮টি। এর মধ্যে কর্মরত আছেন ৫ হাজার ৮৮ জন। নিজস্ব কর্মকর্তা-কর্মচারী ৩ হাজার ১৩৭ জন, আউটসোর্সিং জনবল ১ হাজার ৯৫১ জন। বর্তমানে ৫৭৫টি পদ শূন্য, যার মধ্যে ৫২০টি পদ পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণের কথা। এসব পদ দীর্ঘদিন খালি থাকায় অনেক কর্মকর্তা একাধিক দায়িত্ব পালন করছেন।

সংশ্লিষ্টরা বিদ্যুৎ বিভাগের অন্যান্য বিতরণ সংস্থার মতো ফিডার পদের জ্যেষ্ঠতা অনুসারে পদোন্নতি ও গ্রেডেশন তালিকা প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে ডিপিডিসির পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান ও সিনিয়র সচিব (পিআরএল) মো. হামিদুর রহমান খান-এর বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। লিখিত প্রশ্ন পাঠানো হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। তার কার্যালয়ে গিয়েও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

সংবাদটি শেয়ার করে অন্য জানার সুযোগ দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *